আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ : মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনী সহিংসতায় সমেলা বেগম (৫০) নামের এক নারী নিহত হন। উপজেলার বাচামারা ইউনিয়নের ২ নং বাচামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই ইউপি সদস্যের সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার মধ্যে পড়ে ওই নারী নিহত হন।

মামলা তুলে নিতে হুমকির অভিযোগ

ঘটনার পরদিন (বৃহস্পতিবার) নিহত সমেলা খাতুনের ছেলে ইলিয়াস হোসেন বাদী হয়ে আইয়ান (৬৫), আব্দুস সালাম (৫০), লিয়াকত আলী শেখ (২৮), আরিফ সাহরিয়ার (৩০) এর নাম উলে­খ করে ও ২০/২৫ জন অজ্ঞাতনামা আসামীর নাম দিয়ে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করে। কিন্তু মামলা দায়েরের আট দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোন আসামীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো মামলা তুলে নিতে তাদের চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের সদস্যদের।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইকবাল আহমেদ খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, আসামিরা পলাতক থাকায় এখন পর্যন্ত তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের গ্রেফতারে প্রযুক্তির সহায়তাসহ বিভিন্ন সোর্স কাজ করছে। আমাদের সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারি ওই কেন্দ্রে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাচামারা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের দুই মেম্বার প্রার্থী তালা প্রতীকের ওয়াজেদ সরকার ও ফুটবল প্রতীকের সরোয়ার হোসেনের কর্মী সমর্থকদের সাথে সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার মধ্যে পড়েন ভোট দিতে আসাা সমেলা বেগম। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যান। বাড়িতে নেওয়ার কিছুক্ষণ পরই তাঁর মৃত্যু হয়। নিহত সমেলা খাতুনের বাড়ি বাচামারা গ্রামে।

কিন্তু মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাচামারা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত সদস্য ওয়াজেদ আলীর কর্মী-সমর্থকেরা বাঁশের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সমেলা বেগমকে হত্যা করেছে। এই মামলায় উল্লেখিত ৪ জনসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জন আসামির সবাই ওয়াজেদ আলীর সমর্থক বলে জানা গেছে।

নিহত সমেলা খাতুনের ভাই আখের আলী বলেন, আমার বোন ভোট দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সময় দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষের মধ্যে মাটিতে পড়ে যায়। পরবর্তীতে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে বাড়িতে আনার পথেই তিনি মারা যান।

এই ওয়ার্ডে পরাজিত মেম্বার প্রার্থী সারোয়ার হোসেনের আপন খালা নিহত সমেলা বেগম। সারোয়ার হোসেন বলেন, ওই দিন সংঘর্ষের সময় তিনি ধাওয়া খেয়ে ওই কেন্দ্র থেকে সড়েগিয়েছিলেন। পরে তিনি জেনেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ওয়াজেদ আলীর সমর্থকেরা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আমার খালাকে হত্যা করেছে।

নির্বাচনের দিন দায়িত্বরত ২ নং বাচামরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকেরা কেন্দ্রের ভিতরে ঢুকে ব্যালট ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। আমি তৎক্ষনাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় তাদেরকে কেন্দ্র থেকে বাইরে বের করে দেই। বাইরে যাওয়ার পর তাদের সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। মারামারির মধ্যে পড়ে বৃদ্ধা নিহত হন।

মামলার বাদী ইলিয়াস হোসেন বলেন, ওয়াজেদ আলীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও অজ্ঞাত কারণে ওয়াজেদ আলীর বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। মামলা করার পর প্রায় এক সপ্তাহ পার হলেও এখন পর্যন্ত একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি। উল্টো আসামিদের আত্মীয়স্বজন ও ওয়াজেদ আলীর সমর্থকেরা মামলা তুলে নিতে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।

অভিযোগের বিষয়ে ওয়াজেদ আলী সরকার বলেন, নির্বাচনের দিন তিনি কেন্দ্রের বাইরে ছিলেন। কে বা কারা হামলা করেছে, সেটা তার জানা নেই। পরে শুনেছেন এক ভোটার ভোট দিতে এসে মারা গেছেন। মামলা তুলে নিতে ভয়ভীতি দেখানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি বা তার সমর্থক কেউ এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তাই মামলা তুলে নেওয়ার ব্যাপারে হুমকি দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।

এ দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ জাকারিয়া হোসেন বলেন, আমরা প্রতিদিনি আসামী গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি আসামি গ্রেপ্তারে। আমরা আশাবাদী অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আসামী ধরতে সক্ষম হবো। মৃত্যুর কারন নিয়ে তিনি বলেন, লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হয়ে বলা যাবে না। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি।