রবিউল হাসান রবি, চট্টগ্রাম : বান্দরবানের লামায় ভুল চিকিৎসা ও নার্সদের দায়িত্ব অবহেলায় কারণে মাত্র ১১মাস বয়সী হাফছা আক্তার নামে এক শিশুকন্যার একটি হাত কেটে ফেলতে হচ্ছে। ওই ভুল ইনজেকশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অপর হাতটিও হারিয়ে ফেলেছে কার্যক্ষমতা।

হাফছার বাবা হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, ঠা-াজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য একমাত্র শিশুকন্যাকে নিয়ে গেছেন লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে তার দুধেরশিশু এখন মৃত্যু শয্যায়।

হাবিবুর রহমান জানান, তার শিশুকন্যার হাতে ভুলভাবে কেনোলা লাগিয়ে সেখানেই ভুল ইনজেকশন পুঁশ করে হাসপাতালের কর্তব্যরত নার্স। এরপরই তার হাতটি লালচে বর্ণ ধারণ করে ঠান্ডা হয়ে যায় এবং নাড়াচাড়ার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এররেশ ধরে এখন অপর হাতটিও আর নাড়তে পারছে না তার কন্যা।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ঘটনা চাপা দিতে তড়িগরি ছাত্রপত্র দিয়ে জেলার বাহিরের হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল ও চট্টগ্রামের বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতাল ঘুরে এখন ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

তবে এটিকে নিছক দূর্ঘটনা বলে দায় এড়ালেন লামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মহিউদ্দিন মাজেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ইতিপূর্বে এমন কোনো ঘটনা চোখে পড়েনি। এটিই প্রথম। ডাক্তার মহিউদ্দিন মাজেদের ভাষ্য, কেনোলা ইনফেকশনের কারণে এমনটা হয়েছে। সময় নিয়ে চিকিৎসা করলে এটি ঠিক হয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞ চিসিৎসকরা জানান, শিশুটিকে বাঁচাতে হলে একটি হাত কেটে ফেলার পাশাপাশি দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। না হলে তার জীবন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিবে। তবে নিষ্পাপ এই দুধের শিশুর চিকিৎসা ব্যয় কোত্থেকে যোগাবেন তা নিয়ে এখন চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ওই শিশুর বাবা-মা।

হাবিবুর রহমান জানান, গত ৭ অক্টোবর তার কন্যাকে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করানো হয়। ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ভালোই ছিলো সে।

১৩ অক্টোবর সকালে তার হাতের কবজির রক্ত নালীতে ফের কেনোলা লাগানো পর থেকেই হাত লালচে বর্ণ ধারণ করে এবং ঠান্ডা হয়ে যায়। ওই অবস্থাতেই এদিন বিকেলে কর্তব্যরত নার্স তার হাতে ইনজেকশন পুঁশ করে। বাচ্চার অসহ্য কান্নার মধ্যে হাতের বিষয়টি জানানোর পরও হাসপাতালের কর্তব্যরত কোনো চিকিৎসক ও নার্স কাছে গিয়ে দেখেননি। ২৪ ঘন্টার মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে দূর থেকে এমনটা বলেই দায়িত্ব শেষ করেছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শিশুটির হাতের অবস্থা অবনতি হওয়ার পর ঘটনা আড়াল করতে ১৪ অক্টোবর দুপুরের পর দ্রুত ছাড়পত্র দিয়ে জেলার বাহিরে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন সেখানকার জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শাহবাজ। সেখান থেকে ওই রাতেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করানো হয়।

এবার চমেকের কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ জানান, শিশুটিকে বাঁচাতে হলে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। তারা পরামর্শ দেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যেতে। পরের দিন ১৫ অক্টোবর সকালে সেই হাসপাতালে নিতেই সেখানকার কর্তৃপক্ষ ভর্তি না নিয়ে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন। এরপর চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় দুইদিন পর ১৮ অক্টোবর ঢাকা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়েছে।

তবে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স পারভীন আক্তার জানান, চিকিৎসা সেবায় কোনো ত্রুটি ছিল না। ১৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে দশটায় তাকে নতুন কেনোলা পরিয়েই একটি ইনজেকশন পুঁশ করি। পরে রাতের ডিউটিতে থাকা অপর নার্স মোকাররমা জান্নাত সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ওই কেনোলার মধ্যেই ইনজেকশন পুঁশ করেন। এর ৩০-৪০ মিটির পরই নাকি শিশুটির হাতে এই সমস্যা দেখা দেয়।

বিষয়টি জানার পর ডিউটি নার্স মোকাররমা জান্নাত সঙ্গে সঙ্গে তার হাত থেকে খুলে নেয়। এরপরই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই কর্তব্যরত চিকিৎসক কক্সবাজার অথবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ দেন। তবে শিশুটির অভিভাবকগণ গরিমসি করে পরেরদিন দুপুরে চমেকের উদ্যেশ্যে বের হন। হাসপাতালের নার্সদের ডিউটি ইনচার্জ জান্নাতুল ফেলদৌস নিগার একই কথা বলেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডাক্তার অং শৈ প্রু মারমা বলেন, বিষয়টি শুনেছি। একটি বিশেষজ্ঞ টিম দিয়ে এই ঘটনা আমরা তদন্ত করে দেখবো, নার্সদের যদি কোনো গাফলতি থাকে অবশ্যই বিহিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।