সরিষাবাড়ী (জামালপুর) প্রতিনিধি : সরিষাবাড়ীতে হামলার শিকার ভিক্ষুক পরিবারকে হাসপাতাল থেকে টেনে-হেঁচড়ে হাজতে প্রেরণ করার অপরাধে অভিযুক্ত ৪ দারোগাকে বরখাস্ত ও ২ পুলিশ সদস্যকে জেলা পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে।

অপরদিকে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি পুরো জেলায় টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে।

বুধবার সকালে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেন জোয়ারদ্দার সরিষাবাড়ী থানা ও হাসপাতালে সরেজমিনে তদন্ত কাজ শুরু করেছেন। বিষয়টি ওসি তদন্ত আব্দুল মজিদ নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, সরিষাবাড়ীর বাউসী বাজার সংলগ্ন হত-দরিদ্র বিক্ষুক আব্দুল জলিলের বসতভিটায় হামলা চালায় প্রতিপক্ষ প্রভাবশালী মজিবর রহমান। হামলায় ভিক্ষুক মৃত মহর আলীর পুত্র আব্দুল জলিল গুরুতর আহত হয়ে সরিষাবাড়ী হাসপাতালে ভর্তি হয়।

প্রভাবশালী মজিবরের অর্থের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে সরিরষাবাড়ী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশে ৪ জন দারোগা এস আই আলতাফ, এস আই মমতাজ, এস আই ছাইফুল ও এস আই ওয়াজেদ আলীসহ ২ জন পুলিশ সদস্য মহিলা পুলিশ সাথি ও মোজাম্মেল হক হাসপাতালে গিয়ে ভিক্ষুক জলিলকে টানা-হেচড়া করে শারিরীকভাবে নির্যাতন চালায় এবং তাকে থানায় নিয়ে আসে।

এ ঘটনা মুহুর্তের মধ্যে জানাজানি হলে জেলা পুলিশ সুপার নাছির উদ্দিন তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার সত্যতার প্রমাণ পাওয়ায় মঙ্গলবার রাতেই ৪ জন দারোগাকে সাময়িকী বরখাস্ত ও ২ জন পুলিশ সদস্যকে জেলা পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে।

জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে হামলায় আহত ও ক্ষতিগ্রস্থ ভিক্ষুক পরিবারকে উল্টো মামলায় জড়ানোর অভিযোগে গুরুতর আহত ভিক্ষুক আব্দুল জলিল সহ তার পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও আসামী করায় পুলিশ তাদের পিটিয়ে ও টেনেহিঁচড়ে হাসপাতাল থেকে হাজতে পাঠিয়েছে।

মঙ্গলবার (১০ মে) দুপুরে সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্র জানায়, সরিষাবাড়ী পৌরসভার বাউসি বাজার এলাকার মৃত মহির উদ্দিনের ছেলে ভিক্ষুক আব্দুল জলিল (৬৪) ২০ শতক জমিতে বসতভিটা বানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন। প্রতিপক্ষ মুজিবুর রহমান সম্প্রতি ওই জমি তাদের দাবি করায় দুইপক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

এ নিয়ে মামলা হলে আদালত আব্দুল জলিলের পক্ষে ডিক্রি দেয়। আদালতের আদেশ অমান্য করে সোমবার সকালে প্রতিপক্ষ মুজিবুর রহমান দলবল নিয়ে আব্দুল জলিলের পরিবারের ওপর হামলা চালায়।

এ সময় রামদা, লোহার রড় ও লাঠিসোঁটার আঘাতে আব্দুল জলিলসহ পরিবারের সবাই আহত হন।

গুরুতর আহত আহত আব্দুল জলিল (৬৪), তার স্ত্রী লাইলী বেগম (৫০), বড়ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিক (৩০), মেজোছেলে ওয়ায়েজ করোনি (২৫), ছোটছেলে হামদাদুল হককে (১৬) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরিবারের অন্য সদস্য জসিম মিয়াকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে ঘটনার পর উল্টো মুজিবুর রহমান বাদী হয়ে চিকিৎসাধীন ৪ জনসহ ১৫ জনকে আসামী করে থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার পর মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ হাসপাতালে ঢুকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এজাহারভূক্ত ৪ আসামীদের আটক করে।

হাসপাতালের শয্যা থেকে পুলিশ তাদের চ্যাংদোলা করে নামিয়ে হাত-মুখ চেপে ধরে পাটায় এবং টেনেহিঁচড়ে দ্বিতীয়তলা থেকে নিচতলায় নেওয়া হয়। এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ঘণ্টাখানেক তাদের থানাহাজতে রাখার পর বিকেলে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

আব্দুল জলিলের জামাতা চান মিয়া, মেয়ে জুলেখা বেগম ও ভাতিজা রানা মিয়া অভিযোগ করেন, তারা মামলা করতে গেলেও পুলিশ তাদের মামলা নেয়নি। উল্টো আব্দুল জলিলকে থানায় আটকে রাখা হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থা অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি হন। রাতে উল্টো অভিযুক্তদের মামলা নিয়ে হাসপাতাল থেকে আটক করা হয়।

সরিষাবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর রকিবুল হক বলেন, মুজিবুর রহমান বাদী হয়ে সোমবার রাতে আব্দুল জলিলসহ অন্যদের আসামী করে মামলা দায়ের করেছেন। এরপর হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে আসামীদের আটক করা হয়।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় টেনেহিঁচড়ে আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ায় তাদের আটক করা হয়েছে৷ নইলে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসা দেওয়া হতো।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. দেবাশীষ রাজবংশী জানান, আহতদের চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে পুলিশ হাসপাতাল থেকে রোগীদের ছাড়পত্র নিয়েছে। চিকিৎসাধীন আসামীদের যেভাবে আটক করা হয়েছে, তা অমানবিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।