এম এম হারুন আল রশীদ হীরা, নওগাঁ : নওগাঁয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকা এক অজ্ঞাত নবজাতক (কন্যা) চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত মঙ্গলবার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রকাশ্য এই বাচ্চা চুরির ঘটনা ঘটে।

এর আগে রোববার দিবাগত রাত ৮টার দিকে হাসপাতালের চতুর্থ তলার সিঁড়িতে পড়ে থাকা অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল জুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে ঘটনাটির দায় কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক। প্রথমে ঘটনাটি ধামাচাপা থাকলে পরে ফাঁস হয়ে পড়লে এ নিয়ে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়।

জানা যায়, গত রোববার রাত ৮টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের চতুর্থ তলার সিঁড়িতে এক টুকরো কাপড়ে মোড়ানো ছিল নবজাতক। শিশুটির কাঁন্নায় হাসপাতালে সেবা নিতে আসা মানুষ ভীড় করছিল। মানুষের চিৎকার শুনে এগিয়ে যান দায়িত্বরত ওয়ার্ড বয় রাজু হোসেন। এ সময় শিশুটি শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভূগছিল। অজ্ঞাত হওয়ায় রাজু শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে ৫ম তলা শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়। শিশুটি ৪/৫ দিন বয়সী হয়ে থাকতে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছিল।

বাচ্চাটি উদ্ধারের পর বিষয়টি তাৎক্ষণিক সদর মডেল থানা পুলিশকে জানায় কর্তৃপক্ষ। নিরপত্তার জন্য রাতেই এক মহিলা পুলিশ সদস্যকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। শিশুটিকে দেখভালের জন্য হাসপাতালে শিশুটির সঙ্গেই ছিলেন ওই নারী কনস্টেবল। রাতেই অক্সিজেনের ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ দিয়ে শিশুটিকে সুস্থ করে তোলা হয়।

পরে শিশুটিকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের কেএমসি ইউনিটে রাখা হয়েছিল। পরের দিন এবিষয়ে থানায় সাধারন ডায়েরী করা হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জিম্মায় শিশুটিকে রেখে চলে আসেন ওই নারী কনস্টেবল। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত শিশুটিকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের কেএমসি ইউনিটে দেখা গেলেও দুপুর ১টার পর আর দেখা যায়নি।

শিশু ওয়ার্ডে তৎকালীন সময়ে দায়িত্বরত ইন্টার্ন নার্স আকলিমা খাতুন বলেন, দুপুর ১২টার দিকে বাচ্চার অভিভাবক পরিচয়ে দুইজন মহিলা কেএমসি ইউনিটে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করেছিল। পাশের কক্ষে রোগী দেখতে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর কেএমসি ইউনিটের ফিরে এসে কক্ষে প্রবেশ করতে চাইলে দরজা বন্ধ রেখে তারা আমাকে কিছুক্ষণ পর আসতে বলেন। একটু পর এসে দেখি শিশুটি এবং ওই দুইজন মহিলা কোথাও নেই।

শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স মৌসুমী আক্তার বলেন, বাচ্চাটিকে কে বা কারা নিয়ে গেছে এবিষয়ে কোন সাংবাদিকের সাথে কথা বলা নিষেধ আছে। তাই আমরা কিছু বলতে পারবো না।

জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা: রতন কুমার সিংহ বলেন, মঙ্গলবার সকালে রাউন্ডে বাচ্চাটিকে দেখবার পর একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। তারপর বাচ্চাটি কীভাবে চুরি হলো আমার জানা নেই। এবিষয়ে কিছু জানতে হলে তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসকের সাথে কথা বলতে বলেন তিনি।

নওগাঁ সদর মডেল থানার (ওসি তদন্ত) রাজিবুল ইসলাম বলেন, একটি শিশু পাওয়া গেছে মর্মে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থানায় অবগত করলে সেখানে একজন নারী কনস্টেবলকে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবিষয়ে একটি সাধারন ডায়েরী করেন।

ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে অভিভাবক প্রাপ্তি সাপেক্ষে আইনগত ভাবে বাচ্চাটি তারা হস্তান্তর করবে এমন লিখিত দিলে বাচ্চাটি তাদের হেফাজতে বুঝিয়ে দেওয়ার পর নারী কনস্টেবল চলে আসেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসক এবং সদর ইউএনও মহোদয় অবগত আছেন। বাচ্চাটি হারানোর বিষয়টি এখনো আমাদেরকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়নি। বাচ্চা হারানোর ঘটনায় পুলিশের কোন গাফিলতি নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ ২৫০শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক জাহিদ নজরুল চৌধুরী বলেন, নবজাতককে উদ্ধারের পর থানায় জিডি এবং এজাহার করা হয়েছিল। বাচ্চাটিকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ্য করে তোলার পর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বুঝেও দেয়া হয়। আমরা শুধু নিজেদের হেফাজতে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছিলাম। পরে বাচ্চাটিকে ছাড়পত্র ছাড়াই কে কীভাবে নিয়ে গেছে আমার জানা নেই।

তিনি আরো বলেন, আমাদের কোন দায়িত্ব অবহেলা ছিলো না। যথাযথ ভাবে চিকিৎসা দিয়ে বাচ্চাটিকে সুস্থ করে তোলা হয়েছিল। বাচ্চা হস্তান্তরের দায়িত্ব আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। আমরা শুধু নিজেদের হেফাজতে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছিলাম। শুনেছি বাচ্চাটির মা এবং নানী পরিচয়দানকারী দুইজন মহিলা তাকে নিয়ে চলে গেছে।

নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মির্জা ইমাম উদ্দিন বলেন, পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া ওই নবজাতককে শিশু আইন অনুযায়ী জেলা কমিটির সভার মাধ্যমে সমাজসেবার ছোটমনি নিবাসে পাঠানোর জন্য জেলা প্রশাসক মহোদয় পরামর্শ দিয়েছিলেন। সম্প্রতি শিশুটিকে হাসপাতালে গিয়ে সুস্থ অবস্থায় দেখেও এসেছেন সমাজসেবা কর্মকর্তা। পরে জানলাম শিশুটির অভিভাবক হিসেবে একটি পক্ষ দাবী করছে। এক্ষেত্রে তারা আসলেই শিশুটির অভিভাবক কি না? সে বিষয়টি পুলিশ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছিল। এরমধ্যেই হাসপাতাল থেকে বাচ্চাটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানলাম। বাচ্চা হারানোর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।