মিজানুর রহমান মিজান, রংপুর অফিস : ‘আমার মেয়ে যখন ক্লাস ফোরে পড়ে তখন স্কুল থাকি বাড়ি আসি বলে আমি ফুটবল খেলব। তখন রাগ হইসি পরে। তখন আমার ভাই আব্দুল লতিফ এসে তাকে নিয়ে যায়। সেই থেকে খেলে। মেয়েকে খুব কষ্ট করি মানুষ করছি। আজ গর্ববোধ করতেছি।’

গ্রামের মেয়ে ফুটবল খেলবে, কেমন দেখায় ভেবে রাজি ছিলেন না বাবা, বাধা দিয়েছিলেন মা, স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীও।

কিন্তু তিনি যে স্বপ্না, এসেছেন দেশবাসীর স্বপ্নকে সার্থক করতে। এসব বাধা কি তাকে ঠেকাতে পারে? ফুটবলে বাংলাদেশের সেরা সাফল্যের একটি এসেছে যাদের ঘামে, তাদের মধ্যে ১০ নম্বর জার্সিধারী স্বপ্নাকে নিয়ে এখন ঝরছে প্রশংসার ফুলঝুরি।

নেপাল থেকে শিরোপা নিয়ে ফিরবেন, সেই শিরোপা দুই হাতে তুলে ধরতে দেখে দেশবাসী উদ্বেল হবেন, এই বিষয়টি ভেবেই এখন আনন্দে আত্মহারা এক সময়ে তাকে খেলতে দেয়ার বিরোধীরাই।

নেপালের সঙ্গে ইতিহাস গড়ে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতা দলে রংপুরের সদ্যপুস্কুরুনী পালিচড়ার মেয়ে সিরাত জাহান স্বপ্নার জন্য এখন হাসছে গোটা এলাকা।

স্বপ্নাকে খেলতে দেয়ার বিরোধীরাও আনন্দে আত্মহারা গত সোমবার নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সাফের শিরোপা জয়ে বাংলাদেশের মেয়েদের আনন্দ।

সব ‘মন্দ কথা’ উড়িয়ে দিয়ে কিশোরীদের পায়ে এগিয়ে চলা ফুটবলে নতুন দিন এনে দিয়েছেন স্বপ্না। তাই, সারা দেশের উৎসবের রঙের সঙ্গে রঙিন হয়েছে রংপুরের নিভৃত এই পল্লীগ্রাম পালিচড়াও।

স্বপ্নার জন্য এখন গর্বিত রংপুরের মানুষ। তার পরিবার সিক্ত হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছায়।

পালিচড়ার জয়রাম গ্রামে স্বপ্নার বাড়িতে মঙ্গলবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, উৎসুক মানুষের ভিড়। অনেকে মিষ্টি এনে বিলাচ্ছেন, হৈ-হুল্লোড় করে মেতেছেন গ্রামের মানুষজন। এ ছাড়া বাজার, দোকান, পাড়া-মহল্লা সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বিশ্ব জয় করা স্বপ্না। স্থানীয়দের গর্বের অন্ত নেই তাকে নিয়ে।

এই উৎসব সেখানে শুরু হয় আগের রাতেই। চলে মিষ্টি খাওয়া খাওয়ি।

স্থানীয় যুবক গোলজার হোসেন বলেন, ‘আমরা তার জন্য খুশি। ২০১০ সালে এই গ্রামের মেয়েরা অনেক বাধা উপেক্ষা করে ফুটবল খেলা শুরু করে। আমরা স্বপ্ন দেখছিলাম বিশ্বজয়ের। সেটি পূরণ হয়েছে।’

‘এই গ্রামের মেয়েদের জন্যই পালিচড়া এখন নতুন নাম পেয়েছে; সেটি হলো- নারী ফুটবলারদের গ্রাম। শিরোপা জয়ে আমরা এতটা খুশি, যা বলে প্রকাশ করা যাবে না।’

স্বপ্নার বাবা মোকছার আলী একজন কৃষক। মেয়ের এই সাফল্যে আনন্দের সীমা নেই তারও। বলেন, ‘খুব আনন্দ লাগছে। আজকে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল জয়ী হয়েছে। এতে আমার মেয়ে খেলেছে। আমরা সবাই খুব খুশি। আমার মেয়ের জন্য সকলে দোয়া করবেন। সে যাতে দেশের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারে।

ছোট থাকতে স্বপ্নার ফুটবলে আগ্রহ দেখে রাগ হয়েছিল মা লিপি বেগমের। পরে মামা এসে তাকে নিয়ে যায় খেলায়। সেই থেকে শুরু। এখন তাকে নিয়ে গর্ব করেন মা। চাওয়া মেয়ে আরও বড় হবে, আরও বড় স্বপ্ন ছুঁবে। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে যখন ক্লাস ফোরে পড়ে তখন স্কুল থাকি বাড়ি আসি বলে আমি ফুটবল খেলব। তখন রাগ হইসি পরে। তখন আমার ভাই আব্দুল লতিফ এসে তাকে নিয়ো যায়। সেই থেকে খেলে। মেয়েকে খব কষ্ট করি মানুষ করছি। আজ গর্ববোধ করতেছি।

‘আমি খেলা দেখছি। রাত ১২টায় খুশিতে ঘুমাইছি। সকাল থাকি মেলা মানুষ আসোছে। আমার খুব ভালো লাগছে। আমার মেয়ে তিনটা। দুই মেয়েক বিয়ে দিছি। এই মেয়েকে খেলাধুলা করতেছে। আমার মেয়ে বড় হোক আমি এটা চাই।

পরিবার রাজি না থাকলেও স্বপ্না ফুটবলের মাঠে আসতে পেরেছে মূলত তার মামার কারণে। মামা আব্দুল লতিফ কেমন খুশি আজ?

‘আমার বড় বোন ভাগ্নি স্বপ্নাকে খেলতে দিবেই না। আমি হাত ধরে ধরে তাকে মাঠে নিয়ে যেতাম। আজ আমার চেয়ে বেশি কেউ খুশি হয়নি। আমি চাই সে আরও বড় হোক।

‘তখন ইউএনও মোস্তাকিন বিল্লাহ ছিলেন। তার বড় অবদান আছে। তিনি অনেক কিছু করেছেন। বহু টাকা ব্যয় করেছেন’- এই কথা বলতে থাকা লতিফের মুখে তৃপ্তির আভা যে কেউ বুঝতে পারছিলেন।

স্বপানার বড় আব্বা (বড় চাচা) মকবুল হোসেন বলেন, ‘বঙ্গমাতা খেলা হয়েছে ২০১১ সালে। সেখানে স্বপ্না খেলে আজ এত দূরে। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য দোয়া করি। আজ আমাদের গ্রামে যেন ঈদের আনন্দ।

এই পালিচড়ায় মেয়েদের ফুটবলে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে সাবেক কোচ হারুণকে অবদান অনস্বীকার্য বললেন মামা মিজানুর রহমান পাইলট।

‘সাবেক কোচ হারুণ ভাইয়ের চেষ্টায় আজ আমাদের মেয়েরা সফল। এই পালিচড়ায় এখন জাতীয় টিমে চার জন খেলতেছে। পুরো ২২ জনের একটি টিম ছাড়াও বহু মেয়ে এখন ফুটবল খেলতেছে। আজ কী যে আনন্দ হচ্ছে!

সদ্যপুস্কুরুনী যুব স্পোর্টিং ক্লাবের কোচ মিলন খান বলেন, ‘এই গ্রাম নারী ফুটবলারদের গ্রাম। এর আগে কখনও সাফ চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। এটাই প্রথম। স্বপ্না দশ নস্বর জার্সি পরে খেলেছে। তার এই সফলতায় আমরা খুশি। আনন্দিত। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে, তাকে বড় সংবর্ধনা দেয়ার।

বাজারের বাসিন্দা বলেন আব্দুল মোাতালেব বলেন, ‘আবেদ আলী ক্যাশিয়ার ছিল বাচ্চাদের অভিভাবক। তিনি বাড়িতে মেয়েদের থাকা খাওয়া সবই করেছেন। তার বড় অবদান। তিনি আজ বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন।

রংপুর সদ্যপুষ্কুরনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সোহেল রানা বলেন, ‘আমরা আজ গর্বিত। তার সফলতা আমাদের সফলতা। আরও কীভাবে এই পালিচড়াকে এগিয়ে নেয়া যায় সেটা নিয়ে কাজ করব আমরা।

রংপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, ‘আমরা স্বপ্নাকে সংবর্ধনা দেবো। আমি ইউএনওকে বলেছি তার পরিবারের খোঁজ-খবর নিতে। তা ছাড়া আমরা সেখানে একটি স্টেডিয়াম করতেছি। সেখানকার নারী ফুটবলারদের জন্য যা যা করার আমরা সবই চেষ্টা করব।