জমির মালিকানা নিয়ে মুখোমুখি স্কুল শিক্ষার্থী ও সামিনা খাতুন গং, উত্তেজনা-আইনশৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কা   

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নে অবস্থিত নারী শিক্ষাকেন্দ্র সুলতারপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিরোধপূর্ণ জমি রক্ষায় বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। স্কুলের সীমানা এলাকার ভিতরের একটি অংশে বসবাসরত একটি পক্ষের সাথে বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে দীর্ঘ দিন থেকে দখল পাল্টা দখল এবং জমির মলিকানা দাবি করে একে অপরের বিপক্ষে সালিশ বৈঠক করেও ফলপ্রসুর কোনো সমাধান হচ্ছে না।

দীর্ঘ দিন থেকে জমি নিয়ে জটিলতা থাকলেও উভয় পক্ষ কোনোরূপ সমযোতা এবং ছাড় না দেওয়ায় বিষয়টি বর্তমানে আদালতে গড়িয়েছে। এছাড়া স্কুলের জমি রক্ষায় শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন থেকে অবৈধ দখল মুক্তকরনের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন, বিক্ষোব, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানান ভাবে আন্দোলন অভ্যাহত রেখেছে।

এদিকে ২৩এপ্রিল বিকেলে বিদ্যালয়ের বিরোধপূর্ণ জমিতে প্রতিপক্ষ কর্তৃক বেড়া দেওয়ার চেষ্ঠাকালে সুলতানপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল, মানব বন্ধন করে আপত্তি জানালে এসময় উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

দুপুর এক ঘটিকা হইতে চার ঘটিকা পর্যন্ত তিন ঘন্টা ব্যাপি প্রায় চারশত শিক্ষার্থী প্লেকার্ড, ফ্রেস্টুন নিয়ে বিদ্যালয়ের জমিতে প্রতিপক্ষ কর্তৃক অবৈধভাবে বেড়া দিয়ে বিদ্যালয়ের জমি দখলের অভিযোগের প্রতিবাদে শিক্ষাথীরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। উত্তেজনার খবর পেয়ে কুলাউড়া থানা পুলিশ ঘটনা স্থলে উপস্থিত হয়ে উভয় পক্ষকে শান্ত করে।

জানা যায়, ১৯৯১সালে সুলতানপুর গ্রামের শিক্ষানুরাগী মেহেরুন্নেছা খাতুন চৌধুরী এলাকার নারী শিক্ষা বিস্তারে সুলতানপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য একশত তিন শতক জমি দান করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৪সালে বিদ্যালয়ের নামে ঐ জমি রেকর্ড হয় এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয় এলাকাবাসীর সহযোগীতায়। সর্বশেষ বিদ্যালয়টি ২০২০ সালে এমপিও ভুক্ত হয় এবং প্রায় ৪৬৫ শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষের সংকট নিরসনে একটি একাডেমিক ভবন অনুমোধন হয়।

যে স্থানে নতুন ভবনের কাজ শুরু হওয়ার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করে সেই স্থানেই বিদ্যালয়ের ১০৩ শতক মোট জমির ১টি অংশে প্রায় ১৭শতক জমিতে মৃত রজব আলীর স্ত্রী সামিনা খাতুন গংরা পরিবারের ২০/২৫ জন সদস্যসহ দীর্ঘ দিন থেকে বসবাস করে আসছেন। ঐ ১৭ শতক জমি নিয়ে স্কুল এবং সামিনা খাতুন গং এর বিরোধ দীর্ঘ দিনেও কোনো সমযোতা হয়নি। যানিয়ে একাধিক সমযোতা বৈঠকে স্কুলের সীমানা এলাকা থেকে অন্যত্র সামিনা খাতুন গং কে সমযোতার মাধ্যমে বিনিময় করে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিলে আজও আলোর মুখ দেখেনি উভয় পক্ষের ছাড় না দেওয়ার কারণে।

সরেজমিন ২৩ এপ্রিল বিকেলে ঘটনা স্থলে উপস্থিত হয়ে জানা যায়, বিরোধপূর্ণ এই জমি ( পৃথিমপাশা মৌজার জে এল নং-৮৬, এস এ খতিয়ান-২২২, আর এস খতিয়ান-৩৪৮৪, দাগ-২৪৮৪) নিয়ে দেওয়ানি মামলা চলমান থাকলেও বর্তমানে ২৩ এপ্রিল দুপুরে সামিনা খাতুন গংরা নিজেদের দখলে থাকা জমির চারপাশে বেড়া নির্মাণ কাজ শুরু করলে সুলতানপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা “বিদ্যালয়ের জায়গা বেড়া দিতে দেব না” ও অবৈধ দখল মুক্ত করণের দাবি জানিয়ে প্রেস্টুন, প্লেকার্ড দিয়ে বিক্ষোভ করে প্রতিবাদ জানায়।

এ সময় আইন শৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্খায় পুলিশ উভয় পক্ষকে সতর্ক করে দেয় এবং কোনোরূপ সংঘাতে না জড়িয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহŸান জানান। পরিস্থিতির জটিল আকার ধারণ করার আশঙ্খায় সামিনা খাতুন গংরা আর বেড়া নির্মাণ করেননি এবং স্কুলের শিক্ষার্থীরাও বিকেলে শিক্ষকদের পরামর্শে বাড়ি ফিরে যায়। এ নিয়ে এলাকায় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্খা রয়েছে।

প্রধান শিক্ষক নাজমা চৌধুরী এবং দাতা পরিবারের সদস্য শিক্ষক আবু জাবেদ পাপ্পু বলেন, এ অঞ্চলের একমাত্র নারী শিক্ষ প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ দিন থেকে এলাকার মানুষের সহযোগিতায় চলছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি এমপিও ভুক্ত হয়েছে এবং একটি নতুন ভবন এর অনুমোদন হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাডেমিক ভবনের জন্য নির্ধারিত এই স্থানটি অবৈধ ভাবে একটি পক্ষ দখল করে রেখেছে।

বিদ্যালয়ের এই ভবনটি নির্মাণ হলে শ্রেণি কক্ষের সংকট কমবে। দাতা ১০৩শতক জমি স্কুলকে দান করেছেন যা আমাদের রেকর্ড রয়েছে। প্রতিপক্ষ বিদ্যালয়ের সুনাম নষ্ট করতে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং শিক্ষার পবিবেশ নষ্ট করছে। আমরা প্রয়োজনে দাতা পরিবারের সাথে কথা বলে অন্যত্র জমি দিয়ে ঐ পক্ষকে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছি। বিদ্যালয়ের জমি রক্ষায় শিক্ষার্থীরা অবৈধ দখলদারদের দ্বারা বেড়া নির্মাণ করণে আপত্তি জানায়।

বিরোধপূর্ণ জমিতে বসবাসকারী পক্ষের সামিনা খাতুন ও তাামিম হোসেন বলেন, আমরা দাতা কর্তৃক মৌখিক ক্রয় বলে প্রায় শত বছরের বেশি সময় থেকে ৩৬শতক জমিতে আমাদের পরিবারের ২০/২৫ জন লোকজন বসবাস করে আসছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের বিদ্যুৎ সংযোগ ও বেড়া নির্মাণ সহ অন্যান্য কাজ করতে বাধা প্রধান করে আসছে । এ নিয়ে আমরা আদালতে সত্ত¡ মামলা দায়ের করেছি (মামলা নং -১৯৩/২১)। আমরা এখান থেকে উচ্ছেদ হলে যাব কোথায় আমাদের আর থাকার জমি নাই। অন্যত্র স্থানান্তরে আমাদেরকে যে জমি দেওয়ার প্রস্থাব দেওয়া হয়েছে তা বর্তমানের তোলনায় কম মানের।

পৃথিমপাশা ইউনিয়নের স্থানীয় ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো: আব্দুল মতিন বলেন, বিদ্যালয়টি এলাকার শিক্ষাবিস্তারে কাজ করছে। একটি মহলের ইন্দনে একটি পক্ষ বিদ্যালয়কে ধ্বংশের পায়তারা করছে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে।

সাবেক ইউপি সদস্য এম এ হামিদ বলেন, আমি ইউপি সদস্য থাকা অবস্থায় উভয় পক্ষকে নিয়ে সমযোতায় পৌছাই। সম্মানজনক ভাবে সামিনা খাতুন গংদের ক্ষতি পূরন দিয়ে ভালো মানের জমিতে স্থানান্তরের প্রস্থাব দেই। বর্তমানে এই গরিব পবিবারকে যথাযত বিনিময়ের মাধ্যমে সম্মানের সহিত সমাধানের আহবান জানাচ্ছি যাতে ঐ পরিবার একবারে ভ’মিহীন না হয়।

সুলতানপুর স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস আলী চৌধুরী (রেকু) জানান বিদ্যালয়িিট এখন সরকারের আমরা অনেক যোগাযোগ করে একটি ভবন পেয়েছি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ভবনের কাজ শুরু হলেও স্কুলের জমিতে অবৈধ দখলদাররা থাকার কারণে ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে। বিদ্যালয়ের জমির জটিলতার করণে একাডেমিক ভবন ফেরত গেলে স্কুলের ক্ষতি অপূরণীয়। বিষয়টি সমাধানে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করি।

পৃথিমপাশা ইউপি চেয়ারম্যান জিমিউর রহমান চৌধুরী জানান উভয় পক্ষকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটিয়ে আলোচনার মাধ্যেমে বিষয়টি সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছি। স্কুলের কথা বিবেচনা করে বসবাসকারী প্রতিপক্ষকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে অন্যত্র স্থানান্তর করলে বিষয়টি সমাধান হবে বলে মনে করি।

এ ব্যাপারে রবিবার দুপুরে কুলাউড়া থানার ওসি বিনয় ভূষণ রায় বলেন, বিষয়টি নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে আদালত যারা যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের বাধার কারণে আদালতের নির্দেশনা পালন করতে পারেনি পুলিশ। আমরা এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দিব। উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহবান জানিয়েছি।