তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের হাওরের বোরা ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মান কাজের ১৪ দিন সময় অতিবাহিত হলেও এখনো বাঁধ নির্মান কাজ শেষ করতে পারেনি পানি উন্নয়ন (পাউবো) বোর্ড। সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটে নিচ্ছে দুর্নীতিবাজ চক্র। সেই সাথে পিআইসি প্রথাকে বিতর্কিত করে ঠিকাদারি প্রথা পুনরায় চালু করতে তারা তৎপর রয়েছে। এ কারনে কৃষকদের মনে শংকার পিছু ছাড়ছেনা। নীতিমালা অনুযায়ী গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারী হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের সকল কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারির পর আরো ৭ দিন সময় বর্র্ধিত হলেও হাওর রক্ষা বাঁধে কাজ শেষ করতে পারেনি পানিউন্নয়ন বোর্ড।

গতকাল দুপুরে সুনামগঞ্জ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে হাওর বাঁচাও আন্দোল কমিটি। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় পাউবো তাদের ৪ মার্চের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ছাতকে ৯৭ শতাংশ, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৯১ শতাংশ, ধর্মপাশায় ৯০ শতাংশ, জগন্নাথপুরে ৮৯ শতাংশ, জামালগঞ্জে ৮৮ শতাংশ, দিরাইয়ে ৮৬ শতাংশ, বিশ্বম্ভরপুরে ৮৫ শতাংশ, তাহিরপুরে ৮০ শতাংশ, শাল্লায় ৭৮ শতাংশ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ৬৩ শতাংশ, দোয়ারাবাজারে ৫৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এই মনগড়া তথ্যের সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। তারা ‘হাওরের মাটি কলমে কাটা’র এই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেন।

হাওর বাাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় লিখিত বক্তব্যে উলেখ করেন, সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা-২০১৭ অনুযায়ী ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে সুনামগঞ্জ জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর ডুবন্ত বাঁধের ভাঙন বন্ধকরণ/মেরামতকল্পে গৃহীত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সুনামগঞ্জ জেলায় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ ১৫ ডিসেম্বর শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্ধিত সময় ৭ মার্চের মধ্যে একটি বাঁধেরও শতভাগ কাজ শেষ হয়নি। পাউবো পিআইসি পদ্ধতিকে বিতর্কিত করতে এসব কাজ করছে। পাউবো সঠিক সময়ে কোন পিআইসিকে কার্যাদেশ দেয়নি। এবার অপ্রয়োজনীয় বাঁধের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে অনেক উপজেলায় এক ব্যক্তি একাধিক বাঁধের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। গণশুনানির মাধ্যমে এলাকার মানুষদের উপস্থিতিতে পিআইসি গঠন না করায় বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম হচ্ছে। এবার হাওর ডুবি হলে পাউবো ও জেলা প্রশাসনকে দায় নিতে হবে।

সম্মেলনে জানানো হয় হাওর রক্ষা বাঁধে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দিরাই, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরে। জামালগঞ্জ মিনি পাকনার হাওরের ১, ২, ৩ ও ১৪নং পিআইসিতে প্রয়োজনীয় অর্থের চেয়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ হয়েছে। যা মোট ৪টি পিআইসিতে ৪০ লক্ষাধিক টাকা। মিনি পাকনার হাওরের ১ নং পিআইসিতে গত বছর বরাদ্দ ছিল ১২ লক্ষ ৮৬ হাজার এ বছর ২০ লক্ষ ৮ হাজার, ২নং পিআইসিতে গত বছর ৫ লক্ষ ২৭ হাজার, এ বছর ১৭ লক্ষ ৫৮ হাজার, ৩নং পিআইসিতে গত বছর ৮ লক্ষ ৪২ হাজার, এ বছর ১৮ লক্ষ ২৮ হাজার; ১৪ নং পিআইসিতে গত বছর ১২ লক্ষ ১৫ হাজার, এ বছর ২৩ লক্ষ ৭০ হাজার, হালির হাওরে ৩৭নং পিআইসিতে গত বছর ১০ লক্ষ, এ বছর ১৬ লক্ষ ২৭ হাজার। তবে গত বছরে তৈরি করা এসব বাঁধগুলো অক্ষত ছিলো।

তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওর ও মাটিয়ান হাওরের অধিকাংশ বাঁধে শেষ হয়নি মাটি ভরাটের কাজ। যার মধ্যে অন্যতম মাটিয়ান হাওরের দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের পিআইসি নং ৭৩। ০.৩৫৭ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ লক্ষ ২৭ হাজার ১১৩ টাকা। এ বাঁধ নির্মাণের কাজ গেল বছরের ১৫ ডিসেম্বর শুরু করার কথা থাকলেও তিনি এখনো মাটি ভরাট করার কাজে ব্যস্ত। পিআইসি সদস্যরা জানান, তাদের কাজ শুরু করার কার্যাদেশ ১৫ জানুয়ারি কাগজে লিখে দিলেও তারা তা পেয়েছেন ২৮ জানুয়ারি।

শনির হাওরে ৪, ৫, ৭, ৮, ৯ ও ২০নং পিআইসি ও মাটিয়ান হাওরের ৭২, ৭৪, ৭৫ নং পিআইসির কাজ পরিদর্শন করলে দেখাযায় মাটি ভরাট কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও শেষ হয়নি দুর্মুজ, ঘাস লাগানো ও বাঁশের আঁড় দেওয়ার কাজ। এমন দুর্বল ও ধীর গতিতে বাঁধ তৈরি করলে আগাম বন্যায় এসকল বাঁধ টিকবে না।

কাল্লায় বাঁধের কাজে সাগর চুরি হচ্ছে। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মোটরসাইকেল চালক ও বিলের প্রহরী পেয়েছেন কোটি টাকার বাঁধের কাজ। এই দুই ব্যক্তি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের জন্য গঠিত ১৯, ৬৪, ৬৫, ১০০, ১০১, ১০৩, ১০৪ ও ১০৫ নম্বর প্রকল্পের দেখভাল করছেন। বাবার নাম বদল করে একই ব্যক্তির নামে এসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পে বরাদ্দের প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির টাকাও উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি হয়নি। এখনো মুক্তারপুর বড় ক্লোজারটি মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়নি।

একই উপজেলার হাওয়ার ক্লোজার, শুভচনাইরকাড়া, ভ্রোমরা খেয়াঘাট সংলগ্ন ক্লোজার গুলোর কাজ এখনও শেষ হয়নি। কালিয়াকোটা হাওর-উপ প্রকল্পের ৭০নং পিআইসি অক্ষত বাঁধে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১৫৪নং পিআইসিতে অক্ষত বাঁধে ১৫ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

দিরাই উপজেলার বরাম হাওর উপপ্রকল্পের ১৯৯নং পিআইসির ৩নং সদস্য নুরুল আমিন ও ৪নং সদস্য রুবেল মিয়া নিজেই বলেন, আমাদেরকে পিআইসির সদস্য করা হয়েছে অথচ আমরা জানিনা, মানুষের মুখে শুনে গিয়ে দেখি সাইনবোর্ডে আমাদের নাম আছে, আমাদের পিআইসিতে কত টাকা বরাদ্দ এবং কোথায় থেকে কোথায় পর্যন্ত মাটি কাটা হবে আমরা কিছুই জানিনা। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার সাংহাই হাওরে ছয়টি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে ৮২ লাখ ৪১ হাজার ১৩৩ টাকা অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে।

পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের ১৯ ও ১৮ নম্বর পিআইসির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ লাখ ৭১ হাজার টাকা। এই দুই প্রকল্পের পশ্চিম দিকে ১০০-১৫০ মিটার দ‚রে শান্তিগঞ্জ-রজনিগঞ্জে এলজিইডির পাকা রাস্তা রয়েছে। এই প্রকল্পগুলোতে অপ্রয়োজনীয় ও সরকারের টাকা লোপাটের প্রকল্প। ১৭, ১৬, ১৫ ও ১৪ নম্বর প্রকল্পে ৫১ লাখ ৭০ হাজার ১৩৩ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১৪ নম্বর প্রকল্পের শেষ প্রান্তে খাসিপুর গ্রামের আলমগীরের বাড়ির সামনে থেকে পশ্চিম দিক হয়ে আসামমোড়া ¯øুইস গেট পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার জায়গা খালি রয়েছে।

একই সড়কে একদিকে মাটি ভরাট করলেও অন্যদিকে মাটি পড়েনি। তাই কেন এমন আজগুবি প্রকল্প নেওয়া হলো জানেন না এলাকাবাসী

জগন্নাথপুর উপজেলার প্রকল্প নং ৫ এখনো কাজ শেষ হয়নি। ক্লোজারটি ও অরক্ষিত। প্রকল্প নং ৮ এ দায়সারভাবে মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। কমপেকশন বা ঘাস লাগানোর কোন আলামত নেই। এমনকি পিআইসর লোকজন বাঁধেও নেই। পিআইসি নং ১২ তে ৫০ মিটার বাঁধে কোন মাটি ভরাট করা হয়নি। জগন্নাথপুর উপজেলায় নলজুর নদী খনন কাজ চলছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নদী থেকে মাটি উত্তোলন করে নদীতেই ফেলা হয়েছে, যা নীতিমালা বহির্ভ‚ত।

উল্লেখ্য, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থ বছরে হাওরের ফসলরক্ষায় জেলায় ৬১৯ কিলোমিটার বাঁধের কাজ হচ্ছে। যার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ৮১১টি পিআইসি গঠন করে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৩৩টি, বিশম্ভরপুর উপজেলায় ৪১টি, ধর্মপাশা উপজেলায় ১৭০টি, তাহিরপুর উপজেলায় ৮৩টি, জামালগঞ্জ উপজেলায় ৪৪টি, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ৬৩টি, দিরাই উপজেলায় ১২০টি, শাল্লা উপজেলায় ১৫৬টি, জগন্নাথপুর উপজেলায় ৩৬টি, দোয়ারাবাজার উপজেলায় ৪৭টি ও ছাতক উপজেলায় ১৮টি পিআইসি গঠন করা হয়। এ অর্থবছরে সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা-২০১৭ অনুযায়ী সুনামগঞ্জে ডুবন্ত বাঁধের ভাঙন বন্ধকরণ ও মেরামতের জন্য প্রাক্কলিত ব্যায় ধরা হয় ১৩৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে এখন পর্যন্ত সরকার দিয়েছে ৬৬ কোটি দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন, হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ ভাপতি অ্যাডভোকেট স্বপন কুমার দাস রায়, উপদেষ্টা বিকাশ রঞ্জন চৌধুরী বানু, রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু, যুগ্ম সম্পাদক সম্পাদক সালেহীন চৌধুরী, সদর উপজেলা কমিটির সহ সভাপতি চন্দন কুমার রায়, সাধারণ সম্পাদক শহীদন আহমদ প্রমুখ।