কক্সবাজার অফিস : চাঞ্চল্যকার মেজর (অব) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার আসামীরা কোন রকম ভয়ভীতি ছাড়া সুস্থদেহে, সুস্থ মস্তিস্কে এবং দীর্ঘক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করে দোষস্বীকার করেছেন এবং তা যথাযথ আইনী পন্থা অনুসারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট তামান্না ফারাহ।

ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহ আজ বুধবার ২৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এর আদালতে এই মামলার অন্যতম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন।

জবানবন্দী দেয়ার সময় তামান্না আরও বলেন, ‘আমি এই মামলার ৯ জন আসামীকে পৃথক পৃথকভাবে বলেছি, আমি ম্যাজিস্ট্রেট আমি পুলিশ অফিসার নই, অর্থাৎ আমি জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আসামীদের নিকট আমার পরিচয় দিয়েছি প্রকাশ্যে।

আসামীদের প্রত্যেককে সতর্ক করে বলেছি, আসামীরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে বাধ্য নন এবং স্বীকারোক্তি দিলে এই স্বীকারোক্তি সাক্ষ্য হিসেবে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে। প্রত্যেক আসামীকে চিন্তা ভাবনা করার জন্য তিন ঘন্টা করে সময় দিয়েছি। অতপর আসামীরা সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে স্বীকারোক্তি দিলে আমি তা ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ এবং ৩৬৪ ধারার বিধান মতে রেকর্ড করি।’

আসামীরা তাদের স্বীকারোক্তিতে একাধিক স্বাক্ষর প্রদান করেন। তামান্না ফারাহ আরো জানান, প্রতিবার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী নেয়ার সময় কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আরএমও কর্তৃক আসামীদের শারীরিক পরীক্ষার সনদ আমি দেখেছি এবং উক্ত সনদ মামলার নথিতে আছে।

অতপর আসামীপক্ষের আইনজীবীরা ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাকে ব্যাপক জেরা করেন এবং তিনি প্রত্যেক প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব দেন।

ষষ্টদফায় আজ তৃতীয় দিনে সাক্ষী হিসেবে অপর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন শামীমও আদালতে জবানবন্দী দেন এবং তাঁকেও আসামীপক্ষের আইনজীবীদের ব্যাপক জেরার মুখোমুখি হতে হয়। আজ জবানবন্দী দেয়ার জন্য ৬ জন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করা হলেও দীর্ঘ জেরার কারণে দুইজন ছাড়া অন্যদের জবানবন্দী নেয়া সম্ভব হয়নি।

একটানা জবানবন্দী ও জেরা শেষে সন্ধ্যা ৭টায় আদালতে দিনের কার্যক্রম শেষ হয়।

ইতিপূর্বে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহ তাঁর আদালতে এই মামলার ৯ জন আসামী ও ৪ জন সাক্ষীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী গ্রহন করেন এবং প্রত্যেকের জবানবন্দী সঠিক পন্থায়, যথাযথ বিধি ও আইনী প্রক্রিয়া অবলম্বন করে হাইকোর্টের এম-৮৪ ফরমে লিপিবদ্ধ করেছেন বলে তিনি আদালতে জানান।

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আদালতে তিনি জবানবন্দী ও জেরার জবাব দেন। প্রতিবার জেরার জবাবে এ বিষয়ে তিনি অবিচল ও অটল ছিলেন। বিকেল ৫টার পরে ৩ জন আসামী এবং ২ জন সাক্ষীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী গ্রহণ করা অপর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন শামীমও আদালতে সাক্ষ্য দেন। ইতিপূর্বে এই দুই সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সিনহা হত্যা মামলার ১৫ জন আসামীর মধ্যে ১২ জন আসামীর এবং ৮৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬ জন সাক্ষীর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করেছিলেন।

মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন শামীম ও তামান্না ফারাহ কক্সবাজার চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসীতে জ্যৈষ্ঠ বিচারিক হাকিম হিসাবে কর্মরত আছেন। তামান্না ফারাহ এই মামলার ৭৬ এবং দেলোয়ার হোসেন ৭৭ নম্বর সাক্ষী।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটির আইনজীবী এবং পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম জানান, সময় স্বল্পতার কারণে বুধবার আদালতে উপস্থিত হওয়া অপর চারজন সাক্ষী তৎকালীন টেকনাফ থানায় এই মামলা রেকর্ডকারী ওসি এস.দোহা, তৎকালীন ডিবি পুলিশের ওসি মানস বড়ুয়া, জব্দ তালিকার সাক্ষী পুলিশের এসআই কামাল হোসেন ও কনস্টেবল মোশাররফ হোসেন এর জবানবন্দী নেয়া সম্ভব হয়নি।

আদালত পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ১৫ নভেম্বর থেকে পরবর্তী তিনদিন ধার্য করেছেন।

বুধবার জবানবন্দী গ্রহনের সময় অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট মোজাফফর আহমদ হেলালী, এপিপি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জিয়া উদ্দিন আহমদও উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে, আসামীদের পক্ষে আদালতে অ্যাডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত, অ্যাডভোকেট দিলীপ কুমার দাশ,অ্যাডভোকেট শামশুল আলম, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাকারিয়া, অ্যাডভোকেট চন্দন দাশ প্রমুখ আইনজীবী জেরা করেন।

বুধবার সকালে মামলার ১৫ জন আসামীকেও কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের রাত সাড়ে সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। হত্যার পাঁচদিনের মাথায় ৫ আগস্ট সিনহার তাঁর বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা তদন্ত শেষে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাক্ষী সহ আলোচিত মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করেন র‌্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকান্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।