সোহরাব হোসেন, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) : দেশের নদ-নদীতে কাঠের নৌকা দিয়ে নৌকা বাইচের প্রচলন অনেক আাগে থেকেই। তবে এবার মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের ছোট কালিয়াকৈর গ্রামের আব্দুস সাত্তার বাঁশ দিয়ে বাইচের নৌকা তৈরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

৬৫ হাত লম্বা বাঁশের নৌকাটি একনজর দেখার জন্য আশপাশের এলাকা থেকে উৎসুক লোকজন ভিড় করছেন আব্দুস সাত্তারের বাড়িতে। সরেজমিন বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এ দৃশ্য চোখে পড়ে।

মানিকগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া একাদিক নদীতে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বহু যুগ আগে থেকে। ছোটবেলা থেকে নৌকাবাইচ দেখার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল সাত্তারের। প্রতিযোগিতায় বড় বড় নৌকা অংশ নেয় এ দৃশ্য দেখে মনে মনে ভাবতেন, তার যদি এমন একটি নৌকা থাকতো তাহলে কতই না ভালো হতো। আর এটাও ভাবতেন নৌকা তৈরির এতো টাকা তিনি কোথায় পাবেন।

গত দুই বছর ধরে এমন ভাবনা যেন মাথা থেকে কিছুতেই নামাতে পারছিলেন না। তবে তিনি ভাবেন কাঠের নৌকা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় টাকা সংগ্রহ করতে না পারলেও স্বল্প খরচে বাঁশ দিয়ে নৌকা তৈরি করা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকে ৩ মাস ধরে নিজেই শুরু করেন বাঁশ দিয়ে নৌকা তৈরির কাজ।

তিনি একাই নৌকা তৈরির কাজ শুরু করেন। এক পর্যায়ে সাত্তারের সাথে কাজের সহযোগিতা করেন স্থানীয় মিলন , বাদশা ও ফারুক। দিনরাত পরিশ্রম করে নৌকাটি এখন নদীতে নামামোর জন্য উপযোগী করে তোলা হয়েছে।

নৌকাটিতে ব্যবহার করা হয়েছে মোট ৯৫টি বাঁশ। নৌকায় যেন পানি প্রবেশ করতে না পারে এজন্য নিচে ব্যবহার করা হয়েছে মোটা একধরনের বিশেষ পলিথিনও সুতা। নৌকাটির নাম দেয়া হয়েছে রকেট।

প্রতিযোগিতার জন্য ৪০টি বৈঠা ও মাঝিদের জন্য গেঞ্জিসেটসহ নৌকাটিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ টাকা। একসঙ্গে ৪০ জন মাঝি ও একজন মাল্লা নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।

মানিকগঞ্জের ছোট কালিয়াকৈর গ্রামের নাজিম উদ্দিনের ছেলে আব্দুস সাত্তার। ২০০৩ সালে জীবিকার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে পাড়ি জমান । সেখানে সুবিধা করতে না পারায় ২০১৫ সালে প্রবাস থেকে দেশে এসে সাইকেল মেরামতের কাজ শুরু করেন। এখনো আব্দুস সাত্তার এই পেশায় থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
সাইকেল মেরামতের আয় থেকে সংসার চালানোর পর প্রতিদিন কিছু কিছু টাকা সাশ্রয় করে নৌকাটি তৈরি করেছেন তিনি। ।

ছোট কালিয়াকৈর গ্রামের আব্দুল বারেক জানান, টাকা পয়সা নেই সাত্তারের। তারপরও যে সাহস করে বাঁশ দিয়ে একটি বাইচের নৌকা তৈরি করেছেন এককথায় প্রশংসার দাবিদার।

নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, আব্দুস সাত্তার নিজের প্রচেষ্টায় যে বাইচের নৌকাটি তৈরি করেছেন তা এক কথায় চমৎকার। সাত্তারের কর্মকে আমরা সাধুবাদ জানাই। যে স্বপ্ন নিয়ে আব্দুস সাত্তার বাঁশের নৌকা তৈরি করেছেন তা যেন প্রতিফলিত হয়।

বলধারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাজী আব্দুল মাজেদ খান জানান, বাঁশের নৌকা তৈরি করে সারাদেশের মানুষের কাছে আমার ইউনিয়নের সুনাম উজ্জল করেছে সাত্তার। আমার পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে তার জন্য।

আব্দুস সাত্তার জানান, ইতিমধ্যেই বাঁশের নৌকাটি পরীক্ষামুলকভাবে নদীতে ভাসানো হয়েছিল। সব ঠিকঠাক আছে। আমার স্বপ্নের নৌকাটি বাইচের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যে কোন দিন নৌকাটি প্রতিযোগিতার যাবো আমরা। এজন্য আমি সবার সহযোগিতা কামনা করছি। প্রথম নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় আমি যেন বিজয়ী হয়ে ঘরে ফিরতে পারি সেজন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করছি।