এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই : সম্ভাবনাময় মিরসরাইয়ের পর্যটন শিল্প। সঠিক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগে গ্রহণ করা গেলে সরকার এখাত থেকে কোটি কোটি রাজস্ব আদায় করতে পারবে। মানুষদের পর্যটকমুখী করতে চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগ ২০১৭ সালে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি প্রস্তাবিত প্রকল্প হাতে নিলেও এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি । অপরূপ সৌন্দয্যের লীলাভুমি মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন পর্যটন স্পট দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসছে হাজার হাজার ভ্রমণ পিপাসু মানুষ।

জানা গেছে, উপজেলার মহামায়া সেচ প্রকল্পকে আধুনিকায়ন ও খৈয়াছরা ঝর্না এলাকাকে পর্যটকমুখী করতে ২০১৭ সালে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি প্রস্তাবিত প্রকল্প হাতে নেয় চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ। কিন্তু প্রস্তাবিত প্রকল্প দুটি এখনো ঝুলে আছে। ফলে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পর্যটকরা। ২০১০ সালে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মহামায়া সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটির উদ্বোধন করেন। ২০১৪ সালে বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের অধীনে থাকা খৈয়াছরা ঝর্নাটির সন্ধান পান স্থানীয়রা। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আধুনিক সুযোগ সুবিধা না থাকায় পর্যটকদের বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয় নিয়মিত। তাছাড়া খৈয়াছরা ঝর্ণায় যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক।

এ সকল সমস্যার কথা চিন্তা করে ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ দুই পর্যটন এলাকাকে আধুনিকায়ন করতে দুটি প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্প দুটির মধ্যে খৈয়াছরা ঝর্নায় জীববৈচিত্র রক্ষা, পরিবেশ পুনরূদ্ধার ও পর্যটকদের কাছে টানতে ২৫ কোটি টাকা প্রকল্প ও মহামায়া সেচ প্রকল্প এলাকায় ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নের জন্য নেয়া হয় ২৬ কোটি ৭০ টাকার উন্নয়ন প্রকল্প।

২৫ কোটি টাকার প্রস্তাবিত খৈয়াছরা ঝর্না প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে গাড়ি পার্কিং নির্মাণ, ২০০ হেক্টর সাইকাস উদ্ভিদ বনায়ন, ৬০০ হেক্টর দুস্প্রাপ্য বিপদাপন্ন দেশীয় প্রজাতির চারা রোপণ, ফলদ প্রজাতি ও স্থানীয় প্রজাতির চারা রোপণ, যাতায়াতের জন্য ৫টি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ, সড়ক নির্মাণ, পাঁচটি শৌচাগার ও ওয়াশরুম নির্মাণ, দুই কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপন, ১৫ ডেসিমল জমি অধিগ্রহণ, ৩টি গভীর নলকূপ স্থাপন, নিরাপত্তার জন্য আরসিসি বাউন্ডারি নির্মাণ ইত্যাদি।

২৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার প্রস্তাবিত মহামায়া সেচ প্রকল্পকে আধুনিক পর্যটন জোন প্রকল্পে রয়েছে এক পাহাড় থেকে অন্যপাহাড়ে যেতে ২৫০ মিটারের দুটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ, তিনতলা বিশিষ্ট পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ, ৭০০ মিটার দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, ৪টি পিকনিট স্পট নির্মাণ, ২০০ মিটার অভ্যন্তরীণ পাহাড়ি সড়ক নির্মাণ, কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন, লেকের পানিতে ঘুরতে পরিবেশবান্ধব নৌকা কেনা, ৪৫০ হেক্টর ফলদ, ওষুধি ও বিলুপ্তপ্রায় গাছের বনায়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ। কিন্তু প্রকল্প হাতের নেয়ার ৪ বছর পার হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

জানা গেছে, পাহাড় ও সমুদ্র বেষ্টিত এই উপজেলায় রয়েছে আট স্তর বিশিষ্ট খৈয়াছড়া ঝরনা, রূপসী ঝরনা, নাপিত্তাছড়া ঝরনা, মহামায়া ঝরনা, সোনাইছড়া ঝরনা, বোয়ালিয়া ঝরনা ও বাওয়াছড়া হরিনাকুন্ড ঝরনা, মহামায়া লেক, বাওয়াছরা লেক, মুহুরী প্রজেক্ট, সাহেরখালী সীবিচ। অপার সৌন্দর্যমন্ডিত প্রকৃতির সঙ্গে এখানকার মুখরিত জনপদ হয়ে উঠছে আরও মুখর।

মহামায়ার প্রকৃতিতে রঙের ছড়াছড়ি
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলার ঠাকুর দীঘি বাজারের এক কিলোমিটার পূর্বে। ছায়াঘেরা সড়ক। দেশেরে যে কোন স্থান থেকে এসে লেকে যেতে রাস্তায় প্রস্তুত আছে সিএনজি অটোরিক্সা। কিছুদূর পর দেখা মিলবে রেলপথ। রেল লাইন পেরুলেই কাছে টানবে মহামায়া। প্রাণের টানে ছুটে আসা পথ যেন ক্রমশই বন্ধুর হতে চাইবে মনের কোণে জাগা মৃদু উত্তেজনায়। দূর থেকে দেখা যায় প্রায় পাহাড়সম বাঁধ। উভয় পাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বাঁধের ধারে অপেক্ষমান সারি সারি ডিঙি নৌকো আর ইঞ্জিনচালিত বোট। ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের লেক কেবল সুভা ছড়ায়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে স্বচ্ছ পানিতে তাকাতেই দেখা যায় নীলাকাশ। পূর্ব-দিগন্তের সারি পাহাড়ের বুক চিরে যেতে যেতে একসময় হারিয়ে যেতেও মন চাইবে কল্পনায়।

নান্দনিক সৌন্দয্যের আরেক নাম খৈয়াছড়া ঝর্ণা
প্রকৃতির নান্দনিক তুলিতে আঁকা সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছে দেশের ভ্রমণ পিয়াসী মানুষ। অনেকে রাতের বেলায় চাঁদের আলোয় ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পাহাড়ের পাদদেশে তাবু টাঙ্গিয়ে অবস্থান করছে। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি সেতুবন্ধন করে, সবুজের চাদরে ঢাকা বনানী রূপের আগুন ঝরায়, যেখানে প্রকৃতি খেলা করে আপন মনে, ঝুম ঝুম শব্দে বয়ে চলা ঝরনাধারায় গা ভিজিয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ থেকে নিজেকে ধুয়ে সজীব করে তুলছে খৈয়াছরা ঝরনায়। গ্রামের সবুজ শ্যামল আঁকা বাঁকা মেঠো পথ পেরিয়ে শরীরটা একটু হলেও ভিজিয়ে নেয়া যায় নিঃসন্দেহে। আট স্তরের ঝরনা দেখতে দেশি বিদেশি পর্যটকের ভিড় পড়েছে। দেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক ঝরনাটি দেখতে প্রতিদিন ছুটে যাচ্ছে হাজার হাজার দেশি বিদেশি পর্যটক।

বাওয়াছড়ার অপরূপ দৃশ্য পর্যটকদের নজর কাড়ে
উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের মধ্যম ওয়াহেদপুর বাওয়াছড়া পাহাড়ীয়া এলাকায় যুগ যুগ ধরে ঝর্ণা প্রবাহিত হচ্ছে। সবুজ শ্যামল পাহাড়ীয়া লেকে পাখিদের কলতানে আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা সকলের প্রান জুড়িয়ে যাবে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এ স্থানে ছুটে আসে শত শত পর্যটক।

মুহুরীর চরে জল আর রোদের খেলা
প্রকৃতির আরেক নাম মুহুরী। যেখানে আছে আলো-আঁধারির খেলা। আছে জীবন-জীবিকার নানা চিত্র। মুহুরীর চর, যেন মিরসরাইয়ের ভেতর আরেক মিরসরাই। অন্তহীন চরে ছোট ছোট প্রকল্প। এপারে মিরসরাই, ওপারে সোনাগাজী। ৪০ দরজার রেগুলেটরের শোঁ শোঁ আওয়াজ শোনা যায় দূর থেকে। পশ্চিমে মৎস্য আহরণের খেলা, আর পূর্বে মন কাড়ানিয়া প্রকৃতি। নুয়ে পড়া মনোবল জেগে উঠবে পূবের জেগে ওঠা চরে। ডিঙি নৌকায় ভর করে কিছুদূর যেতেই দেখা মিলবে সাদা সাদা বক। এখানে ভিড় করে সুদূরের বিদেশী পাখি, অতিথি পাখি বলেই অত্যধিক পরিচিত এরা। চিকচিকে বালিতে জল আর রোদের খেলা চলে সারাক্ষণ। সামনে পেছনে, ডানে-বামে কেবল সৌন্দর্য আর সুন্দরের ছড়াছড়ি। এ অবস্থায় মন আঁধারে ঢেকে যেতে পারে, যদি ক্যামেরা সঙ্গে না থাকে। মুহুরীর প্রকৃতির ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত স্মৃতিরা যেন হারিয়ে যাওয়ার নয়। এসব ক্যামেরার ফিল্মে আটকে রাখার মত হাজার বছর ধরে।

অনিন্দ্য সুন্দর বোয়ালিয়া ঝরনা
চারদিকে সবুজ পাহাড় আর পাহাড়। সবুজের নান্দনিকতা, বিস্তীর্ণ পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিবেষ্টিত মিরসরাই। এখানে রয়েছে বিমোহিত হওয়া প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় সিক্ত এই এখানকার জনজীবন যেমন সৌহার্দপূর্ণ তেমনি প্রকৃতির মমতায় ভরপুর।

প্রকৃতির কাছাকাছি কিছু সময় কাটানোর ইচ্ছে কার না হয়? এজন্য এক উপযুক্ত স্থান বোয়ালিয়া ঝরনা। এতে রয়েছে ছোট-বড় অন্তত ৫টি শাখা ঝরনা এবং অনিন্দ্যসুন্দর উঠান ঢাল নামে একটি পাথুরে ঢাল। দীর্ঘ সময় করোনার বন্দি জীবনে হাঁফিয়ে উঠেছে ভ্রমণ পিপাসু মানুষ। তাই বর্ষা মৌসুমে আর ঘরে বসে না থেকে একটু ঘা ভেজাতে বোয়ালিয়া ঝরনায় ছুটে যাচ্ছেন পর্যটকরা।

এ ট্রেইলের মূল ঝর্ণা হলো বোয়ালিয়া এবং এ ঝর্ণায় যাওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। বোয়ালিয়া ঝর্ণার বিশেষত্ব হলো এ ঝর্ণার আকৃতি অদ্ভুত ধরনের।এর আকৃতি অনেকটা ব্যাঙের ছাতার মতো এবং বোয়াল মাছের মাথার মতো বিধায় হয়তো এই ঝর্ণার নাম হয়েছে বোয়ালিয়া।