কাজী খলিলুর রহমান, ঝালকাঠি প্রতিনিধি : ঝালকাঠির কাঠালিয়ায় ডাক্তার তাপশের ভুল চিকিৎসায় মাহিনুর এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ক্রমাগতই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। মাহিনুরের ২৬ দিনের শিশু সন্তানটিও মায়ের সাথে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন।

অতি সম্প্রতি একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে সিজার করতে গিয়ে মাহিনুর নামে এ রোগীর জরায়ু কেটে ফেলেন ডাক্তার তাপশ কুমার তালুকদার। মাহিনুর বর্তমানে ঢাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের কাঠালিয়া গ্রামের মৃত শাহজাহানের মেয়ে মাহিনুর। মাহিনুরের মা রুনু বেগম ও স্বামী নিজাম উদ্দিন খান সাংবাদিকদের কাছে ভুল চিকিৎসার বর্ণনা দেন এবং ডাক্তার তাপশের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি জানান।

নিজাম উদ্দিন জানান, “আমার স্ত্রী মাহিনুরের প্রসব জনিত ব্যথা দেখা দিলে গত ০৯ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখ কাঠালিয়া উপজেলা হাসপাতাল (আমুয়া) নেয়া হলে সেখানকার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাপশ কুমার তালুকদার রোগীকে হাসপাতাল সংলগ্ন আমুয়া অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার জন্য পরামার্শ দেন। কেননা এ ক্লিনিকে নিয়মিত ডাক্তার তাপশ সিজার ও বিভিন্ন অপারেশনের নামে বানিজ্য করে থাকেন। ক্লিনিকে ডাক্তার সাহেব নিজেই রোগীর পরিক্ষা-নিরীক্ষার পর সিজার করার সিদ্ধান্ত নেন। সিজার করতে গিয়ে মাহিনুরের জরায়ু কেটে ফেলেন। রোগী অতিরিক্ত রক্তক্ষরন দেখা দিলে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখ ডা. তাপশ ক্লিনিক থেকে মাহিনুরের নাম কেটে দিয়ে অন্যত্র চিকিৎসা নেওয়ার পরামার্শ দেন। কিন্তু তাদেরকে কোন ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। উল্টো ডাক্তার তাপশ ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ মাহিনুরের স্বজনদের বিষয়টি সাংবাদিক কিংবা প্রশাসনের লোকদের না জানানোর জন্য শাষিয়ে দেন”।

“অথচ ডাক্তার তাপশ আমাদের কাছে প্রথমে ভুল চিকিৎসার কথা স্বীকার করেছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন আমার ভুল হয়েছে আপনারা আমাকে মামলাও দিতে পারেন বা মারও দিতে পারেন এখন কি করবেন। ক্রমাগত রোগীর অবস্থা অবনতি হতে থাকায় ডাক্তার তাপশের বুলি পাল্টে যায়, তখন তিনি চিকিৎসার সকল কাগজপত্র আটকে দেন এবং জরায়ু কেটে ফেলার কথা অস্বীকার করেন”।

এদিকে মাহিনুরের শাররীক অবস্থার অবনতি দেখা দিলে তার স্বামীর বাড়ী বেতাগী উপজেলা হাসপাতলে ভর্তি করা হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা রোগীর অবস্থা আশাঙ্কাজনক দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে প্রেরণ করেন। গত ০২ জানুয়ারী ২০২২ তারিখ এ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ডাক্তার জানিয়েছেন, রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন, মাহিনুরের সিজার ও কেটে ফেলা জরায়ুর স্থানে পঁচন ধরেছে। আগামীকাল ৫ জানুয়ারী ২০২১ পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিন্ধান্ত নিবেন পূনরায় তার জরুরী ভিত্তিতে অপারেশন প্রয়োজন কিনা? এ মুহুর্তে অপারেশন করা যাবে কিনা? এ সব প্রশ্নের জবাব মিলবে।

মাহিনুরের মা রুনু বেগম জানান, “ডা. তাপশ কুমার তালুকদার সিজার করার জন্য আমাদের কাছে ৩৬ হাজার টাকা নিয়েছে। সিজারের পূর্বে ডাক্তার সাহেব বলেছিলেন ১৬ হাজার টাকা লাগবে। ভুল চিকিৎসা করে জরায়ু কেটে ফেলায় অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের কারনে ৩৬ হাজার টাকা দাবি করেন। আমরা ৩৬ হাজার টাকাই পরিশোধ করেছি। কাঠালিয়া ব্লাড ব্যাংকের পরিচালক তুহিন সিকদারের মাধ্যমে ১১ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করেছি, সবমিলিয়ে ঐদিন আমার মেয়েকে ১৬ ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়েছিলো। আমার মেয়ে এখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রয়েছেন। আমাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, তাই মামলা করতে পারিনী। আমরা গরীব এ জন্য মামলা করতে সাহস পাইনি। আমি ডাক্তার তাপশের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি ও ন্যায় বিচারের দাবি করছি”।

অভিযোগ রয়েছে, নিজ উপজেলায় কর্মস্থল হওয়ায় ডাক্তার তাপশ কাউকে তোয়াক্কা করছেন না। সরকারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের সেবা ফাঁকি দিয়ে সরকারের দেওয়া গাড়ি হাঁকিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখা এবং ব্যক্তিগত কাজে গাড়ী ব্যবহার করছেন। রোগীদের সাথে দুর্ব্যবহার করা, হাসপাতালে বসে রোগী দেখে ভিজিট নেয়া। সাংবাদিকদের সাথে অশোভন আচারণ করা, হাসপাতাল ভবন নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন রাখা। ইনজুরি সার্টিফিকেট দিয়ে মোটা অংকের টাকা নেয়াসহ পাহাড় সমান অভিযোগ রয়েছে ডা. তাপস কুমার তালুকদারের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে ডা. তাপস কুমারের সাথে একাধিকবার ফোন যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি। মতামত নেয়ার জন্য হাসপাতালে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।