শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি : করোনা মহামারীর সময় ও রমজানের কারণে দীর্ঘ ৫ বছর পর আবারও জমজমাটভাবে শুরু হয়েছে বগুড়ার শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোশী মেলা। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ি প্রতি বছর জৈষ্ঠ্যের দ্বিতীয় রোববার থেকে উপজেলা সদরের অদূরে কেল্লাপোশী নামকস্থানে প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এ মেলার আয়োজন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ২৯ মে রোববার থেকে এ মেলা শুরু হলো। তবে স্থানীয়দের ভাষায়, এই মেলাকে ‘জামাইবরণ’ মেলাও বলা হয়।

এই মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো বিভিন্ন ধরনের কাঠের আসবাবপত্র, মিষ্টি-ফলমূল, নানা জাতের বড় বড় মাছ, কুঠির শিল্প সামগ্রী, মহিষ ও খাসির মাংস, রকমারি মসলা।

কেল্লাপোশী বাজার এলাকার মকবুল হোসেন, বাদশা, ওমর ফারুক জানান, তিথী অনুয়ায়ি গত ৩ বছর ধরে রমজান মাসে মেলায় হওয়া এবং করোনাকালীন সময়ে পার হয়েছে ২ বছর। এবার জাকজমকভাবে মেলাটি লাগছে। মেলার পুরাতন ঐতিহ্য ফিরে আসছে। এই মেলাটিকে ঘিরে গ্রামে গ্রামে চলে রকমারি আয়োজন। মেলার অন্তত সপ্তাহখানেক আগ থেকেই গ্রামের লোকজন নানা ধরনের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। নতুন পুরনো বলে কথা নেই। মেলা উপলক্ষ্যে সবাই নিজ নিজ আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত করে বাড়িতে আনেন।

বিশেষ করে নতুন জামাই-মেয়েকে নিয়ে সবাই ভিন্ন আনন্দে মেতে ওঠেন। শ্বশুর বাড়ির পক্ষ থেকে জামাই বাবুকে মোটা অঙ্কের সেলামীও দেওয়া হয়। সেই সেলামী আর নিজের গচ্ছিত টাকা দিয়ে জামাই বাবুরা মেলা থেকে খাঁসি কিনে শ্বশুর বাড়িতে আনেন। এমনকি বড় বড় মাটির পাতিল ভর্তি করে মিষ্টান্ন সামগ্রী, সবচেয়ে বড় মাছ, মহিষের মাংস, রকমারি খেলনা কেনেন।

এ ছাড়া শ্যালক-শ্যালিকাদের নিয়ে মেলা ঘুরে ফিরে দেখেন। তাদের সার্কাস, নাগোরদেলা, হুন্ডা, যাদু, পতুল নাচ খেলা দেখিয়ে দিনব্যাপি আনন্দ শেষে ছাতা, ছোটদের কাঠের ও ঝিনুকের তৈরী খেলনা সামগ্রী নিয়ে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফেরেন। আর গ্রাম্য মানুষরা সেই মেলা থেকে রকমারি মসলা, তুলা, কাঠের সামগ্রী, বড় বড় ঝুড়ি, চুন সারা বছরের জন্য কিনে রাখেন। এবার কৃষকের ধান নষ্ট হওয়ায় একটু বিপদে আছে। তবে দীর্ঘদিনপর মেলার আনন্দ নিতে কমতি থাকবেনা তারা জানান।

এদিকে, প্রতিটি মেলার পিছনেই কিছু না কিছু লোকগাঁথা থাকে। কেল্লাপোষী মেলা সম্পর্কে তেমনি একটি লোকগাঁথার কথা জানা যায়। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এ মেলা হয়ে আসছে বলে কথিত আছে।

যেভাবে কেল্লাপোষী মেলার শুরু :

বৈরাগ নগরের বাদশা সেকেন্দারের একজন ওরশজাত এবং একজন দত্তক পুত্র ছিলেন। ওরশজাত পুত্রের নাম ছিল গাজী মিয়া আর দত্তক পুত্রের নাম কালু গাজী মিয়া। গাজী মিয়া দেখতে খুবই সুদর্শন ছিলেন। তারা রাজ্যের মায়া ত্যাগ করে ফকির সন্যাসীর বেশ ধারণ করে ঘুরতে ঘুরতে ব্রাহ্মন নগরে আসেন। সেখানে ব্রাহ্মন রাজমুকুটের একমাত্র কন্যা চম্পা গাজীকে দেখে মুগ্ধ হন। একপর্যায়ে তারা দু’জন দু’জনকে ভালবেসে ফেলেন।

পালিত ভাই কালু মিয়া বিষয়টি জানতে পেরে গাজীর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে মুকুট রাজার নিকট যান। মুকুট রাজা ফকির বেশী যুবকের এরূপ স্পর্ধা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বন্দি করেন। এতে গাজী মিয়া দারুন আঘাত পান। তিনি মুকুট রাজার নিকট থেকে ভাই কালু মিয়াকে উদ্ধারের জন্য কেল্লাপোষী নামক একটি দূর্গ নির্মাণ করেন।

পরে রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে ভাইকে উদ্ধার এবং তার কন্যাকে বিয়ে করেন। আর তিথি অনুযায়ি ওই দিনটি ছিল জ্যেষ্ঠের দ্বিতীয় রোববার। ওই সময় গাজীর বিয়ে উপলক্ষে কেল্লাপোষী দূর্গে নিশান উড়িয়ে তিন দিনব্যাপি আনন্দ উৎসব চলে এবং সেখানে মাজার গড়ে তোলা হয়। মেলা চলাকালে সেখানে ভক্তরা আসর বসায়। ওই দিনগুলোকে স্মরণ করে রাখতে প্রতি বছর জৈষ্ঠ্যের দ্বিতীয় রোববার থেকে তিন দিনব্যাপি মেলা বসে। আর এই মেলা উপলক্ষে এলাকাবাসি নতুন জামাইকে ঘরে এনে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন। এছাড়া নিকট আত্মীয়স্বজনের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গন।

মেলা শুরুর প্রায় সপ্তাহখানেক আগ থেকে গ্রামে গ্রামে চলে মাদার খেলা। একটি বড় বাঁশকে লাল কাপড়ে মুড়িয়ে ও নানা রংয়ে সাজিয়ে সেটির বিভিন্ন স্থানে চুল লাগিয়ে ১৫-২০ জনের একটি দল বেরিয়ে পড়ে। ঢাক-ঢোল, গান-বাজনার নানান সরঞ্জামাদি আর লাঠি নিয়ে তারা গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে শহরে খেলা দেখায়। মেলা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত চলে ওই মাদার খেলা।

জৈষ্ঠ্যের দ্বিতীয় রোববার দলটি মেলা এলাকায় অবস্থিত মাজার প্রাঙ্গণে গিয়ে তা শেষ করে। মেলায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে কেনা কাটার ধূম। দূর-দূরান্ত থেকে আগত বিক্রেতারা এখানে দোকান সাজিয়ে জাঁকিয়ে বসেন। এ মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো বিভিন্ন ধরনের কাঠের আসবাবপত্র, মিষ্টি-ফলমূল, নানা জাতের বড় বড় মাছ, কুঠির শিল্প সামগ্রী, মহিষ ও খাসির মাংস, রকমারি মসলা।

মেলায় প্রশাসন শৃংখলা রক্ষায় বিশেষ পুলিশি টহলের ব্যবস্থা করে থাকে। যে মেলা সাড়ে প্রায় ৫শ বছরের বাঙালি ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, সেখানে মানুষ প্রশাসনের সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ শহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রামীণ এই মেলার অনুমতি দেয়া হলেও মেলায় কোন সার্কাস, যাত্রা, জুয়া বা বিচিত্রা অনুষ্ঠান চলবে না। যেহেতু মেলাতে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ঘটে। তাই সেখানকার আইনশৃখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।