ফাইল ছবি

তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, সুনামগঞ্জ : দেশের বহুল আলোচিত সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা, ভাংচুরের ঘটনায় মামলার পর গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে চার গ্রাম। এতে করে ওই গ্রামগুলোর নারী ও শিশুরা খাদ্যা অভাব ও রাতে নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সমস্যায় শংকিত হয়ে পড়ছেন। দিরাই উপজেলার নাচনী, চন্ডিপুর, ধনপুর ও শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের নারী ও শিশুদের মাঝে বিরাজ করছে এই অনিশ্চয়তা। আর ক’দিন পরেই বৈশাখে নতুন ধানা কাট শুরু হবে। কিন্তু এই গ্রামগুলোর বোরো ফসল ঘরে উঠবে কি-না তানিয়েও চিন্তিত রায়েছেন পুরুষ শূন্য গ্রামের নারীরা।

নারী ও শিশুরা ভুগছেন খাদ্য সংকট ও চরম আতঙ্কে

জানা যায়, ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে গত ১৭মার্চ শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দু বাড়িঘরে ‘দিরাই উপজেলার নাচনী, চন্ডিপুর, ধনপুর ও শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের কিছু লোকজন হামলা করার অভিযোগ উঠে।

এতে নোয়াগাঁও গ্রামের হিন্দু কয়েকটি বাড়ি-ঘর, আসবাবপত্র ভাঙচুর হয়। এ নিয়ে গত ১৮মার্চ রাতে শাল্লা থানায় দু’টি মামলা হলে দিরাই উপজেলার নাচনী, চন্ডিপুর, ধনপুর ও শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের পুরুষেরা গ্রেফতার এড়াতে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। এরই মধ্যে ঘটনার ম‚লহোতা আলোচিত যুবলীগ নেতা শহীদুল ইসলাম স্বাধীন মেম্বারসহ ৩৯ জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ আটক করে জেলে পাঠিয়েছে। ওইসব গ্রামের পুরুষেরা অন্যত্র থাকায় তাদের পরিবারে দেখা দিয়েছে খাদ্যের অভাব, রাতে নিরাপত্তার অভাবসহ নানা সমস্যা।

স্থানীয়রা জানান, গ্রামগুলো রয়েছে পুরুষ শ‚ন্য। বাড়িতে আছেন শুধুমাত্র বয়ষ্ক কয়েকজন, নারী ও ছোট শিশুরা। পুলিশের গ্রেফতার অতঙ্কে কোন আত্মীয় স্বজনও তাদের বাড়িতে আসছেন না। নাচনী গ্রামের রত্না বেগম বলেন, আমার কিছু হাঁস-মুরগী ছিল এগুলো বিক্রি করে কয়দিন ধরে চলছি। পরে কি করব জানি না। আমার স্বামী কই আছেন তাও আমি জানি না। ওই গ্রামের আছিয়া খাতুন বলেন, আমরার কেউই মাইর গেছইননা, তারা বাড়িতেও আছিলনা। এখন খারাপরা খারাপি করছে আমরার লোকজন পুলিশের ডরে বাড়ি ছাইরা গেছইন। আমরা বড় অভাব আর হতাশার মাঝে আছি। কোস রকম দিন কাটলেও রাতে থাকি ভয়ে।

এদিকে ওই সব গ্রামের মহিলারা জানান, আমরা টাকা-পয়সার অভাবে খেতে পারছেন না, বাচ্ছাদের অসুখে ওষধ কিনতে পারছিনা। আমরা অনেক বিপদ ও সমস্যায় আছি, আনেক বিষয়ে কাউরে কইতেও পারিনা। গত ২৫মার্চ নোয়াগাঁও গ্রামের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী এসেছিলেন। আমরা তার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু দেখা করতে পারিনি। আমরার সমস্যার কথাও সরকারকে জানাইতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি।

আমরা অবলা নারী ও আমাদের শিশুরা খাদ্যের অভাবসহ চিকিৎসার অভাবে রয়েছে। রাতের বেলাতে আমরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করি। সত্তর বছর বয়সী আলফুমা বিবি বলেন, আমার ছেলে জামাল উদ্দিন অনেক দিন বাড়ি ছাড়া তার বাচ্চাদের ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খেয়ে না খেয়ে আছি। সে কোন মারামারির ঘটনার সাথে জড়িত না, কিন্ত পুলিশের ভয়ে এলাকা ছাড়া।

কোথায় আছে তাও জানিনা। সে ঘটনার দিন ঘরের কাজে চালে টিন লাগানোর কাজ করছিল। গ্রামের মানুষের দাবী ঘটনার সুষ্ট তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিচার করা হোক। নিরীহ, নিরপরাধ মানুষ কে যেন হয়রানী না করা হয়, সেই ব্যাবস্থা নেয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের নিকট দাবী জানান তারা।

শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, সবাইতো আর অপরাধ করেনি বয়ষ্ক পুরুষজনও বাড়িতে আছেন। তদন্তের আগে কিছুই বলা যাচ্ছেনা। তবে নিরপরাধ মানুষ হয়রানীর শিকার হবেনা ওই সব গ্রামের নারী শিশুদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে। যারা মনে করবে তারা নিরপরাধ, তারা বাড়িতে আসেননা কেন। আমরা কোন নিরপরাধান মানুষকে হয়রানী করবোনা।

জেলা প্রশাসক মো: জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আতঙ্ক হওয়ার কোন কারন নেই। নিরীহ নিরপরাধ কোন মানুষ কে হয়রানী করা হবেনা, তদন্তে যারা অপরাধী প্রমানিত হবে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। যদি কোন পরিবার বৈশাখে তাদের জমির ধান কাটতে না পারে সেই ক্ষেত্রে আমরা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে তাদের ধান কাটানোর ব্যবস্থা করবো। কোন ভাবেই ফসল নষ্ট হতে দেবনা।

উল্লেখ্য, হেফাজত ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে শাল্লার নোয়াগাও গ্রামের ঝুমন দাস আপন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে কটুক্তি ও আপত্তিকর মন্তব্য করে। পরে এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে নানা মন্তব্য এবং এক পর্যায়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ঝুমন দাস আপনের গ্রেফতার দাবীতে বিক্ষোভ মিছিল হয়। ১৬ মার্চ গভীর রাতে ঝুমন দাসকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

পরদিন ১৭ মার্চ সকালে নোয়াগাঁও গ্রামের পার্শ্ববর্ত কয়েকটি গ্রামের কিচু লোকজন স্বাধীন মেম্বার তার সহযোগী পক্কন মিয়ার নেতৃত্বে নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা চালিয়ে কিছু ঘরবাড়ি ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এমন কথা জানিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদেও একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগে ভাইরাল হয়।

আবশ্য জেলা যুবলীগ দাবী করেছে স্বাধীন যুবলীগের কেউনা। এ ঘটনায় পুলিশ ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বাদী হয় ৫০ জনের নাম উল্লেখ করে আরো অজ্ঞাত সহ দেড় হাজার মানুকে বিবাদী করে মামলা করায় গ্রেফতার আতঙ্কে ৪ গ্রামের পুরুষরা গ্রাম ছেড়ে চলে যান। মামলার আলোচিত আসামী যুবরীগের ওয়ার্ড সভাপতি ও বর্তমান মেম্বার শহীদুল ইসলাম স্বাধীনকে গ্রেফতার করায় এলাকায় স্বস্তি ফিরে আসে।