এম. মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সী বাজার ও সদর উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের চর বরাট এলাকায় পদ্মা নদীতে আড়াআড়িভাবে বাঁশের বেড়া দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে। এতে বেধে রাখা ঘন সুতি ও কাঁথাজালে আটকা পড়ছে পোনাসহ সব ধরনের মাছ। ঝুঁকিতে পড়েছে নৌযান চলাচল। মৎস্য আইনে নদীতে আড়াআড়ি এ রকম বাঁধ দেয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রভাবশালীরা সরকারি আইনের কোন তোয়াক্কা না করে নদীতে আড়াআড়ি বেড়া দিয়ে ছোট বড় ডিমওয়ালা মাছ শিকার করছে।

এ ব্যপারে মৎস্য বিভাগের কোন তৎপরতা নেই। তবে মৎস্য বিভাগ অপারগতার কথা বলে জানান, প্রশাসন তাদের পুলিশ না দিলে নদীতে মৎস্য বিভাগ কোন অভিযান চালাতে পারে না। সাংবাদিকরা প্রশাসনকে বলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজবাড়ীর স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে পাবনার জেলেরা দুই সপ্তাহ ধরে ওই বেড়া দিয়ে মাছ শিকার করছেন।

গোয়ালন্দ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফ আহমেদ জানান, নদীর এক পাড় থেকে আরেক পাড় পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে বাঁশের বেড়া দিয়ে আটকে দেয়া অবৈধ কাজ। একে তো বেড়া দিয়ে সব ধরনের মাছ শিকার করা নিষিদ্ধ। তার ওপর আবার নৌকা চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

ছোট ভাকলা ইউনিয়নের অন্তার মোড় ও চর বরাট এলাকায় বুধবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা নদীতে বড় বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে। বাঁশের সঙ্গে কাঁথা ও ঘন সুতিজাল রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে জাল দিয়ে বিশেষ ধরনের ফাঁদ বা ঘোনা তৈরি করা হয়েছে। বেড়ায় বাধা পেয়ে মাছ জালে আটকা পড়ে। বড় আকারের মাছের সঙ্গে ছোট পোনা মাছও আটকা পড়ছে। এ ছাড়া আটকা পড়ছে বিভিন্ন ধরনের জলজ প্রাণীও।

চর বরাট এলাকায় একজন শ্রমিককে জাল পরিষ্কার করতে দেখা যায়। নাম-পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেও তিনি উত্তর দেননি। মাছ ধরা পড়ছে কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাছ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক দিন তো কোনো মাছই পাইনি। তবে কিছুদিন ধরে কিছু মাছ দেখা যাচ্ছে।’

কারা এই বেড়া দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানকার কয়েকজনের সঙ্গে পাবনার জেলেরা রয়েছেন। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত জাল থেকে মাছ ছাড়িয়ে বিক্রির জন্য মানিকগঞ্জের আরিচা ঘাটে নেন। এলাকায় বিক্রি করতে গেলে অনেক ঝামেলা হয়। তাই দূরে মাছ বিক্রি করাটা নিরাপদ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় বাসিন্দা আক্কাছ আলী খাঁ, খায়রুল খাঁ, রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট এলাকার দুলাল কাজী এবং পাবনার নৈদা হালদার, নগরবাড়ি এলাকার দুখু হালদার দুই সপ্তাহ আগে বাঁশের বেড়া দুটি স্থাপন করেন। এই কাজে অন্তত দেড় হাজার বাঁশ লেগেছে। এ ছাড়া লক্ষাধিক টাকার জাল কেনা হয়েছে। আড়াআড়ি করে বাঁধ দেওয়ায় নৌকা চলাচলে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

চর বরাট এলাকার শাহজাহান শেখ বলেন, তিনি ঢাকার বঙ্গবাজার এলাকায় শ্রমিকের কাজ করেন। এক সপ্তাহ আগে বাড়িতে এসেছেন। বাড়িতে এসে অন্তার মোড়ের মাথায় বিশাল একটি আড়াআড়ি বাঁধ দেখতে পান। শখের বসে তিনি খেপলাজাল নিয়ে মাছ শিকারে বের হন। নিজের নৌকা থাকলেও বেড়ার কারণে তিনি নদীর এক পাশ থেকে আরেক পাশে যেতে পারেননি।

শাহজাহান শেখ বলেন, নদীর এক পাড় থেকে আরেক পাড় পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে বাঁশের বেড়া দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। একে তো বেড়া দিয়ে সব ধরনের মাছ শিকার করা নিষিদ্ধ। তার ওপর আবার নৌকা চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি দেখার মতো কেউ নেই।

মুন্সী বাজার এলাকার হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘দিন দিন নদীর মাছ কমে যাচ্ছে। তারপর নদীতে বাঁশের বেড়ার সঙ্গে ঘন সুতিজাল দিয়ে আটকে দেওয়ায় পোনা বা ডিম পর্যন্ত আটকা পড়ছে। এতে আমরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনছি।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলে আক্কাছ আলী খাঁ ও খায়রুল খাঁ বলেন, ‘নদীতে মাছ ধরে আমাদের সংসার চলে। নদীতে বর্তমানে মাছ তেমন একটা পাওয়া যাচ্ছে না। পাবনা ও রাজবাড়ী সদর উপজেলার কয়েকজন জেলে মিলে ১৪-১৫ দিন আগে বাঁধ দিয়েছি। যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তা বিক্রি করে নিজেদের প্রতিদিনের খরচ উঠছে না।’

গোয়ালন্দ উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা টিপু সুলতান বলেন, নদীতে আড়াআড়িভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। কিছুদিন আগে নদীতে দুটি বেড়া থাকার খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে তা অপসারণ করা হয়। নতুন করে বেড়া দেওয়ার বিষয়টি জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।