মিজানুর রহমান মিজান, রংপুর অফিস : রংপুর নগরীর প্রাণকেন্দ্র নিশবেতগঞ্জ ঘাঘট নদীতে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহাউৎসব। স্থানীয় স্বার্থান্বেষী প্রভাবশালী একটি মহল নিজ স্বার্থ চরিতার্থে অদৃশ্য ক্ষমতার দাম্ভিকতায় প্রকাশ্য দিবালোকে স্থানীয় প্রশাসনের অসাধু দু-একজন কর্মকর্তার সহায়তায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হেভিওয়েট ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার মেশিন দ্বারা প্রায় অর্ধশত স্থানে ঘাঘট নদীর তলদেশ থেকে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

এতে ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বিলীনের পথে নদী উপকূলীয় দুই তীরে অবস্থিত শতশত একর কৃষকের শেষ সম্বল ফসলি জমি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ-মন্দির ও মুসল্লিদের পবিত্র ঈদগা মাঠ সহ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে আদি পুরুষদের স্মৃতি বিজড়িত কবরস্থানসহ ভূমিহীন পরিবারের মাঝে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেয়া গুচ্ছগ্রামটি ও হুমকির মুখে।

একাধিক এলাকাবাসীর অভিযোগ স্থানীয় প্রশাসনসহ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে একাধিক অভিযোগ করা হলেও মিলছে না কোন প্রতিকার। উল্টো যারা অভিযোগ দিয়েছে তাদের খুঁজে বের করে বেধড়ক মারপিট ও শারীরিক লাঞ্চনাসহ প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে প্রভাবশালী অবৈধ বালু উত্তোলন কারিরা।

শনিবার (৮ অক্টোবর) সরেজমিনে নিশবেতগঞ্জের ঘাঘট নদীতে গিয়ে দেখা যায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হেভিওয়েট ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার মেশিন দ্বারা অবৈধ বালু উত্তোলেনের মহা উৎসব। যেন দেখার কেউ নেই, লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকার বালু।

রংপুর সিটি নগরীর প্রাণকেন্দ্র সেনাবাহিনির তিন নং চেকপোস্ট সেনাকুঞ্জ নিশবেতগঞ্জ ঘাঘট সেনা বিনোদন পার্ক ব্রিজ থেকে শুরু করে নগরীর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ১২ নং ওয়ার্ড গুচ্ছগ্রামের ঘাঘট নদীর পাশাপাশি একই স্থানে ১৬টি অবৈধ ড্রেজার মেশিন দ্বারা বালু উত্তোলন করাসহ গোলাগঞ্জ বাজার ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত স্থানে গড়ে ওঠা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ড্রেজার মেশিন দ্বারা অবৈধ ভাবে প্রকাশ্যে দিবালোকে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। কাউকে তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের নাকের ডগায়, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহাউৎসব চলছে হরিলুট লঙ্কাকাণ্ড যেন দেখার কেউ নেই। দিন দিন বেড়েই চলছে বালু উত্তোলন সিন্ডিকেটদের তান্ডব। এ যেন মহোৎসবে মেতেছে তারা। স্থানীয় প্রভাবশালী অবৈধ বালু উত্তোলনের হোতাদের দৌরাত্ম্যে এলাকাবাসী যেন অসহায়। এ যেন বালু উত্তোলনের প্রতিযোগিতায় মেতেছে অবৈধ বালুখেকো প্রভাবশালীরা।

রংপুর সিটি কর্পোরেশন নগরীর আওতাধীন ১২ নং ওয়ার্ডে ঘাঘট নদীর তীর ঘেষে অবস্থিত হতদরিদ্র পল্লী গুচ্ছগ্রাম। যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ব্যক্তিগত অর্থায়নে শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কয়েক শত ভূমিহীন হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে বসত ঘর করে নাম দেয়া হয় গুচ্ছগ্রাম। এর পাশেই অবস্থিত ১৯৬৯ সালে নির্মিত প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেটিও এখন ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে ঘাঘট নদী থেকে হেভিওয়েট ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার মেশিন দ্বারা অবৈধ বালু উত্তোলেনের ফলে আর মাত্র ১০০, গজ দূরে হতদরিদ্র পল্লী গুচ্ছগ্রাম ও সরকারি এই প্রাচীন প্রাথমিক বিদ্যালয়টির অবস্থান।

স্থানীয় এই প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা ড্রেজার মেশিনের প্রচন্ড গতির শব্দের কারণে তাদের পড়ালেখার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফাতেমা বলেন, ক্লাসে স্যারদের কথা প্রচন্ড শব্দের কারণে আমরা শুনতে পাই না আমাদের খুব সমস্যা হয়। আর বালু বহনের কাজে ব্যবহৃত শত শত ট্রাক ও ট্রাংকলরী প্রতিনিয়ত চলাচলে সড়কের বেহাল অবস্থা পায়ে হেঁটে চলাচল করায় অসহনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

স্থানীয় কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, ঘাঘট নদীর তলদেশ থেকে ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বিলীনের পথে নদী উপকূলীয় দুই দুই তীরবর্তী শতশত একর ফসলি জমি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ-মন্দির ও মুসল্লিদের পবিত্র ঈদগা মাঠ সহ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে আদি পুরুষদের স্মৃতি বিজড়িত কবরস্থানসহ ভূমিহীন পরিবারের মাঝে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেয়া গুচ্ছগ্রামটি ও বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে।

একাধিক এলাকাবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্থানীয় হাজির হাট থানায় কর্মরত একাধিক পুলিশের কর্মকর্তা অবৈধ বালু উত্তোলনে সহযোগিতা সরাসরি জড়িত। এমনকি স্থানীয় থানার পুলিশ লাখ টাকা মাসোহারা পান বলে জানান তারা।

এ ছাড়াও স্থানীয় কিছু দৈনিক পত্রিকার অসাধু সাংবাদিকও এই অবৈধ বালু উত্তোলন সিন্ডিকেট এর সাথে জড়িত। তারাও নিয়মিত মাসোহারা পান বলে জানা যায়।

স্থানীয় একাধিক ভুক্তভোগী আরো বলেন, স্থানীয় প্রশাসনসহ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে একাধিক অভিযোগ করা হলেও মিলছে না কোন প্রতিকার। এমনকি উল্টো যারা অভিযোগ দিয়েছে তাদের খুঁজে বের করে বেধড়ক মারপিট ও শারীরিক লাঞ্চনার সহ প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে প্রভাবশালী অবৈধ বালু উত্তোলন কারিরা।

এ সময় উপস্থিত সেলিম আহমেদ সহ একাধিক এলাকাবাসী প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সু-দৃষ্টি কামনা সহ সবধরনের সহযোগিতা চেয়েছেন। তাদের দাবি যত দ্রুত সম্ভব ঘাঘট নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের ড্রেজার মেশিন উদ্ধারসহ জব্দ করা, পাইপ ও স্থাপনাসহ সব ধরনের বালু উত্তোলনের সামগ্রী ধ্বংস করা। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ প্রয়োগের ব্যবস্থা করাসহ প্রভাবশালী বালুখেকো দের হাত থেকে ঘাঘট নদীকে রক্ষা করুণ আমাদের বাচান।

রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদ হাসান মৃধার নিকট অবৈধ বালু উত্তোলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবৈধ ড্রেজার মেশিন দ্বারা বালু উত্তোলন সম্পূর্ণরূপে বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। নদীতে কেউই বেআইনিভাবে বালু উত্তোলন করতে পারবে না। ঘাঘট নদী থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে কয়েকটি অবৈধ বালু উত্তোলনের স্থাপনা ড্রেজার মেশিন জব্দ করেছি এবং কিছু ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

হাজির হাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি (ওসি) রাজিব বসুনিয়া ছুটিতে থাকায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি দায়িত্বে থাকা (ওসি তদন্ত) শাহ আলমের কাছে অবৈধ বালু উত্তোলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার জানা মতে ঘাঘট নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বর্তমান বন্ধ রয়েছে। তার পরেও যদি এখন বালু উত্তোলন চলমান থাকে সেটি আমার জানা নেই। তা-ছাড়া অবৈধ বালু উত্তোলনের ব্যাপারগুলো ইউএনও মহোদয়, এসিল্যান্ড মহোদয় এর আওতায় নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট কোটা এ ছাড়া নদী রক্ষা কমিটিসহ পুলিশ যৌথ ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর বাহিরে আমাদের করার কিছুই নেই। থানা পুলিশের কিছু কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার এটি জানা নেই। যদি সংশ্লিষ্ট থানার কেউ জড়িত থেকে থাকে সেটি অবশ্যই অবৈধ।