মিজানুর রহমান মিজান, রংপুর অফিস : রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ভীমপুর মাঠে এক দিকে আমনের সবুজ ক্ষেত, অন্যদিকে হাওয়ায় দুলছে বিনা-১৬/১৭ জাতের পাকা আমন ধান। চলতি মৌসুমে রংপুরের তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলায় আগাম জাতের ধান চাষ করে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। এবার ধানের ফলনও ভালো হয়েছে। আগাম জাতের ধান চাষ করে কৃষকের আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিয়েছে এই সময়।

রোববার (১০ অক্টোবর) তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি বিভাগের দুই কর্মকর্তা জানান, আগে জমিতে বছরে দুইবার বোরো ও আমন ধানের চাষ হতো। এর মধ্যে ওই ধানি জমিতে অন্য ফসল চাষ করার সুযোগ ছিল না। এতে বেকার হয়ে পড়তেন কৃষিশ্রমিকেরা। এতে চাষি ও কৃষিশ্রমিকেরা অর্থ সংকটে দিন কাটাতেন। এ কারণে আশ্বিন-কার্তিকে উত্তরবঙ্গে অভাব দেখা দিত। সেই অভাব দূর করে দিয়েছে আগাম জাতের হাইব্রিড ধান।

বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বোরো কাটা ও মাড়াই শেষ হয়েছে গত মধ্য জুনে। আর আমন লাগানো শুরু হয় মধ্য জুলাই থেকে। এ কারণে ধানি জমিতে কৃষকেরা আগে আলু ও অন্য শষ্যের চাষ করতে পারতেন না। এখন সেই দিন আর নেই। আগাম জাতের ধান চাষ করে সেই জমিতে অনায়াসে আলু বা অন্য শষ্যের চাষ করার পরও বোরো ধান লাগাতে পারছেন কৃষকেরা। এতে এখন কৃষক-শ্রমিক কারোই তেমন হাতে টান পড়ছে না। তাদের মাঝে এখন খুশির আমেজ, পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের ভালোই দিন কাটছে।

বদরগঞ্জের সুতারপাড়া গ্রামের কৃষক পরেশ চন্দ্র রায় (৫০) বলেন, ‘এই সমায়ে হাতোত টাকা না থাকায় মরার আকাল (মঙ্গা) পড়ত। ভগবানের কৃপায় সেই দিন এ্যালা নাই। মোর জমি তিন একর। তার মধ্যে ৬২ শতোকোত আগুড় (আগাম) ত্যাজ গোল (তেজ গোল্ড) জাতের ধান নাগেয়া গত তিন দিন আগোত কাটছি। ধান পাছি ৪৫ (২৮ কেজি) মণ। ধানের কাঁচা কাড়ি (খড়) বেচাচি ৭ হাজার টাকার। ধান বেচেয়া পাচি ২৭ হাজার ৯০০ টাকা। ধান আবাদোদ খরচ হইচে ১৫-১৬ হাজার টাকা।’

হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আগুড় (আগাম) ধানোত লাভটা ভালোয় হইচে বাপু। এ্যালা টাকাও হাতোত আছে। পূজাত আর সমস্যা নাই। ভগবানের কৃপায় পূজায় এবার ভালোই হইবে হামার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই গ্রামের গোলাম মোস্তফা, অনিল চন্দ্র, রামচন্দ্র ও ধীরেন্দ্রনাথসহ শতাধিক কৃষক এবারে ওই আগাম জাতের ধান জমিতে লাগিয়ে অভাব দূর করেছেন।

তারাগঞ্জের ভীমপুর গ্রামের কৃষক রেজওয়ানুল হক বছরে দুইবার ধানচাষ করতেন। তিনি এক ফসল বিক্রি করে আরেক ফসলের খরচ জোগান। বন্যা, পোকামাকড় ও অনাবৃষ্টির কারণে প্রতিবছর আমনক্ষেত নষ্ট হয়ে উৎপাদন কমত। কোনো কোনো বছর নষ্ট হওয়ায় ফসল তো দূরের কথা আমনক্ষেতের খড়ও আনতে পারতেন না। এতে উঠত না আবাদের খরচ। তবে সেই দিন শেষ হয়েছে তার। বিনা-১৭ জাতের ধান লাগিয়ে ইতিমধ্যে সোনালি ধান ঘরে তুলে সুখেই দিন কাটছে তার। মাত্র ১১৫ দিনের ব্যবধানে এই ধান ঘরে তুলতে পেরে তার চোখেমুখে এখন আনন্দের ঝিলিক।

রেজওয়ানুল বলেন, বহুদিন ধরে ধান চাষ করেন তিনি। আমন ধান কাটার উপযোগী হতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ মাস। ভরা মৌসুমে বাজারে দামও কম পেতেন। এতে লোকসান হতো। এই প্রথম বিনা-১৭ জাতের ধান পাঁচ বিঘায় লাগিয়ে খরচের দ্বিগুণ লাভ হয়েছে। এ ধানে রোগবালাই খুব কম।

তারাগঞ্জের কাজীপাড়া গ্রামের কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, ‘আমি ৩০ শতক জমিত বিনা-১৭ গাড়ছি। এই ধান অন্য ধানের তুলনায় একেবারে আলাদা। অন্য খেতের থাকি সার, পানি, কীটনাশক কম নাগছে। রোগবালাই নাই বললে চলে। ফলনও অনেক বেশি। সউগ জমিত এই ধান নাগবার পাইলে ভাগ্য খুলি যাইবে।

বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় চলতি বছর আমনের চাষ হয়েছে ১৯ হাজার ৬১০ হেক্টরে। এর মধ্যে হাইব্রিড আগাম জাতের বিনা-১৭, বিনা-৭, তেজ গোল্ড ও ধানি গোল্ড ধানের চাষ হয়েছে ৩ হাজার ৩৪০ হেক্টরে।

তারাগঞ্জের ৫ ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ হেক্টরে হয়েছে আগাম জাতের ধান। প্রতি মণ (২৮ কেজি) আগাম জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৬২০ থেকে ৬৪০ টাকায়।

তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঊর্মি তাবাসসুম খোলাবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আগাম জাতের ধান কৃষকেরা ১১০ থেকে ১১৫ দিনের মধ্যে ঘরে তুলতে পারছেন। আমনের জাতগুলোর তুলনায় ৬০ থেকে ৭০ দিন আগে এ ধান পেকে যায়। ফলে বাকি সময়ে কৃষক অন্য ফসল চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। এ জাতের ধানচাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।

বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা জোবাইদুর রহমান খোলাবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এখন ধানি জমিতে কৃষকেরা বছরে তিনবার ফসল ঘরে তুলতে পারছেন। আগাম জাতের ধান চাষ, কাটা ও মাড়াইয়ের পরে বর্তমানে জমিতে আলু ও অন্য শষ্য চাষ করছেন। এ ফসল ৭৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ঘরে তুলে সেখানে এখন বোরো ধানের চাষ করতে পারছেন। এতে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) রংপুরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী খোলাবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, টেকসই কৃষি উন্নয়নে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। আগে কৃষকেরা বছরে দুটির বেশি ফসল ফলাতে পারতেন না। এ সময়ে ঘরে ঘরে অভাব দেখা যেত। যা উত্তরবঙ্গের কৃষকের কাছে মঙ্গা বা মরা কার্তিক নামে পরিচিত। আগাম জাতের ধান সেই অভাব হটিয়ে দিয়ে কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।