চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি : আফরোজা খাতুন (৪৮)। ১৯৯৯ সালে সিনিয়র নার্স হিসেবে সিরাজগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে যোগদান করেন। সেখানে কয়েক মাস চাকুরি পর যমুনার ভাঙন কবলিত চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি হন। এরপর থেকে চরবাসিকে দিয়ে আসছেন চিকিৎসা সেবা।

চরাঞ্চলের ঘোড়জান, উমারপুর, বাঘুটিয়া, খাষপুখুরিয়া ও খাষকাউলিয়া সহ স্থল এবং সদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় যমুনা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। এসব ইউনিয়নের চরাঞ্চলে বাল্য বিয়ের হার বেশি থাকায় এখানকার মায়েরা অধিক মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সন্তান জন্মদিচ্ছেন। এদের কাছে ভরসার নাম চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাসিং সুপার ভাইজার আফরোজা আপা।

চৌহালী উমারপুর চরের সালমা খাতুন ও জাকিয়া সুলতানা জানান, এখনও চরের মানুষের জন্য তেমন উন্নত কোন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত হয়নি। তবে এখানে আমাদের একজন আফরোজা আপা আছে। তার কাছে চরের প্রসূতি মায়েরা যে স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছেন এটা আমাদের জন্য পরম পাওয়া। তার কাছে অধিকাংশ প্রসূতি মা নরমাল ডেলিভারি হচ্ছে।

বাঘুটিয়া চরের নুরজাহান ও জোলতুনেচ্ছা জানান, নার্স আফরোজা আপা চরবাসির জন্য ভরসার নাম। তিনি পরম মমতায় প্রসূতি মায়েদের সেবা দিয়ে আসছেন। রাত-দিন, ঝড়-বৃষ্টি নয় যে কোন সময় তাকে ডাকলে কাছে পাওয়া যায়। তার মোবাইল নম্বর প্রায় প্রতিটি গর্ভবতী মায়েদের কাছে দেয়া আছে। তিনি বর্ষায় নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে ঘোড়ার গাড়িতে গিয়ে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে সেবা দেন।

আফরোজা নার্স খাখকাউলিয়া ইউনিয়নের কুরকী গ্রামের কলেজ শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী। তার বড় মেয়ে চায়নাতে মেডিকেল পড়াশোন করছে। আর ছোট মেয়ে টাঙ্গাইল সৃষ্টি স্কুল এন্ড কলেজে নবর শ্রেনীতে অধ্যায়নরত।

এ বিষয়ে আফরোজা খাতুন জানান, বাল্য বিয়ের কারনে চৌহালীতে প্রসুতি মায়েরা সব সময় একটু বেশি মৃত্যুঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া চরাঞ্চলে উন্নত চিকিৎসা সেবার সুযোগ না থাকায় সব সময় গর্ভবতি মায়েরা বেশি চিন্তিত থাকেন। এ কারণে তাদের সেবা দিতে চৌহালী চিকিৎস অথবা নার্সদের একটু বেশি সজাগ থাকতে হয়।

এতে প্রসূতিদের সেবা দিতে চিকিৎসকদের বর্ষায় নৌকা ও শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। তারপরও একটি নিরাপদ ডেলিভারি করানোর পর ভীষণ তৃপ্তি পাওয়া যায়। গড়ে প্রতি মাসে হাসপাতালে প্রায় ৩০টি এবং বাড়ি গিয়ে প্রায় ২২টি নরমাল ডেলিভারি করা হয়। এতে বছরে প্রায় সাড়ে ৬শ ডেলিভারি করা হয়। সব মিলে চাকুরি জীবনে প্রায় দেড় যুগে সাড়ে ৪ হাজার প্রসুতি মাকে নরমাল ডেলিভারি করিয়েছি।

তিনি আরও জানান, নদী ভাঙনে ঘবাড়ি হাড়াচ্ছেন আবার কেউ বা নৌকায় ঝড়ের কবলে পড়ে প্রসব বেদনা উঠে নরমাল ডেভিভারি করিয়েছি। এমন আরও বেশ কয়েকটি ডেলিভারির ঘটনা আমার জীবনের সেরা স্মৃতি হয়ে আছে।

এ বিষয়ে চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও প.প কর্মকর্তা এম এ কাদের জানান, নার্স আফরোজা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের প্রসূতি মায়েদের কাছে একটি বিশ্বস্তার নাম। তার কাছে বহু মা নরমাল ডেভিভারি হয়েছে। তিনি একজন সফল নার্স হিসেবে এলাকায় বেশ পরিচিত।