কক্সবাজার অফিস : চাঞ্চল্যকর মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় প্রধান আসামী যথাক্রমে বহিস্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলী আদালতে নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেছেন।

আজ সোমবার বিচারিক আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ধারার বিধানমতে আসামী হিসেবে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পেয়ে তারা এই দাবি জানান। একইসাথে মামলার অন্য ১৩জন আসামীও নিজদের নির্দোষ দাবি করেন।

আদালত সূত্র জানান, সোমবার সকাল ১০টায় এই মামলার দিনের কার্যক্রমের শুরুতে আদালতের বিচারক কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল আসামী লিয়াকত আলীকে সম্বোধন করে তার বিরুদ্ধে ৬৫ জন সাক্ষীর দেয়া জবানবন্দী একে একে পড়ে শুনান।

বিচারক বলেন, ‘আপনি সাক্ষীদের সাক্ষ্য শুনেছেন এবং আপনার পক্ষে নিয়োজিত বিজ্ঞ আইনজীবী সাক্ষীকে জেরা করেছেন। আপনি নিজে সাক্ষীদের জবানবন্দী ও জেরা শুনেছেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী? জবাবে লিয়াকত বলেন, ‘আমি নির্দোষ, বাদীর দাবী মিথ্যা এবং সাক্ষীরা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ছাড়া দোষ স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষরগুলো তার নয় বলেও দাবী করেন।’

এরপর বিচারক ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে সাক্ষীদের দেয়া জবানবন্দী পড়ে শুনান এবং বলেন, আসামীরা আপনার নির্দেশে এবং পরিকল্পনায় পারস্পরিক যোগসাজসে সহায়তায় এই হত্যাকান্ডসহ পূর্বাপর ঘটনা সংগঠিত করেছেন মর্মে সাক্ষীরা বক্তব্য প্রদান করেছেন। ইহাতে আপনার জবাব কী? এ সময় ওসি প্রদীপ নিজকে নির্দোষ দাবী করেন এবং আদালতে সাফাই সাক্ষী দেবেন না বলে জানান।

আদালতের প্রশ্নের জবাবে ওসি প্রদীপ আদালতে লিখিত বক্তব্য দেবেন বলে জানান। বক্তব্য কী এখন প্রস্তুত করছেন? আদালতের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রদীপ হ্যাঁ-সূচক জবাব দেন।

এ সময় প্রদীপের নিযুক্ত আইনজীবী রানা দাশ গুপ্ত লিখিত বক্তব্যে প্রদীপের স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য আদালতের অনুমতি প্রার্থনা করলে আদালত অনুমতি দেন এবং প্রদীপ তাতে স্বাক্ষর দেন।

অনুরূপভাবে আসামী লিয়াকতও সাফাই সাক্ষী দিতে অপারগতা জানিয়ে লিখিত বক্তব্য আদালতে উপস্থাপন করেন।

এর আগে গত ১ ডিসেম্বর এই মামলার আট আসামি মৌখিকভাবে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তারা সিনহা হত্যার ঘটনায় নির্দোষ দাবি করেছিলেন।

মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫ এর তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলামকে পাঁচ দিনব্যাপী আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করেছেন।

১ ডিসেম্বর বিকালে জেরা শেষ হওয়ার পর সাক্ষীদের বক্তব্য আসামিদের শুনানো হয়। ওই দিন আট আসামি মৌখিকভাবে আদালতে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তারা লিখিতভাবে আদালতে বক্তব্য দেবেন। তবে সাফাই সাক্ষী দেবেন না বলে আদালতকে জানিয়েছেন।

এই তিন টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার ও পরিদর্শক লিয়াকতসহ সাত আসামি আদালতে বক্তব্য দেবেন।

মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও কক্সবাজার আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জানান এ মামলায় এখন পর্যন্ত ৬৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে দীর্ঘ ৫দিন ধরে আসামীপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করেন। যথারীতি আজ সকাল সাড়ে ৯টায় ওসি প্রদীপসহ মামলার ১৫ আসামিকে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে নিয়ে আসা হয়।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। হত্যার পাঁচদিনের মাথায় ৫ আগস্ট সিনহার তাঁর বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা তদন্ত শেষে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাক্ষী সহ আলোচিত মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করেন র‌্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকান্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।