অবন্তিকা পাল, কলকাতা

[ অভিনেত্রী মীনা কুমারী। ‘নাজ়’ ছদ্মনামে লিখেছেন হরেক শায়েরি। কখনও প্রকাশ করেননি। শেষ জীবনে অসুস্থ অবস্থায় লেখার খাতাটি দেন গুলজ়ারের হাতে। তাঁরই সম্পাদনায় মীনার মৃত্যুর পর প্রকাশ পায় কবিতাগুলি। সঙ্কলনের নাম ‘তন্হা চাঁদ’। নিঃসঙ্গ চাঁদকে নিয়ে কাব্য লিখেই আমৃত্যু ব্যক্তিগত বিষাদের উপশম খুঁজেছেন তিনি। ]

সব শিল্পী-সত্তার মধ্যেই একটি মানবসত্তা অন্তর্লীন থাকে। তার সন্ধান আমরা কদাচিৎ পাই। বা, পাই না। আমরা তাঁর বিবিধ সম্পর্কের খবর নিই, বিচ্ছেদের খবরে আনন্দ অথবা বেদনা উপভোগ করি, সমাজমাধ্যমে চোখ বুলিয়ে জেনে নিই তাঁর রোজনামচা। এ সমস্তই বাহ্যিক, যা ওই শিল্পী দেখাতে চান। অথবা সংবাদমাধ্যম যা যা তুলে এনে দেখাতে পছন্দ করে। এ ছাড়াও শিল্পীর এক অস্তিত্ব থাকে যা গোপনে লালিত হয়, যা প্রচারের আলোয় অস্বচ্ছন্দ বোধ করে। অভিনেত্রী মীনা কুমারীকে দেশবিদেশের দর্শক ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ নামে চেনে। ‘বৈজু বাওরা’-র গৌরী থেকে ‘পাকিজ়া’-র সাহিবজানের সংক্ষিপ্ত যাত্রাপথে, কিংবা তারও বহু, বহু আগেই মেহজ়বিন বানো নামটির সঙ্গে জড়িয়ে যায় নিঃসঙ্গতা। প্রকৃত শিল্পী সব সময়ই একাকী, নিঃসঙ্গ। যত আলো এসে পড়ে, ঝলমল করে ওঠে মুখ, মানুষ তত একা, নির্জন হয়ে যায়। যে মেয়েটি কখনও প্রথাগত শিক্ষালাভ করেনি, সে হাতে নেয় কলম। ডায়েরির পাতায় লিখতে শুরু করে শের, নজ়ম, গজ়ল। একের পর এক ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের আলোর পাশাপাশি নিভৃতে জল পায়, মাটি পায় অন্য এক জীবন। কবি নাজ়-এর কাব্যজীবন।

জন্মনাম, পাথরে পাথরে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গল্পে লিখেছিলেন, ‘পাঁচ ছেলের পর যখন এক কন্যা জন্মিল তখন বাপ-মায়ে অনেক আদর করিয়া তাহার নাম রাখিলেন নিরুপমা’। কিন্তু না, রবীন্দ্রবংশোদ্ভূত মীনা কুমারীর জন্মমুহূর্ত এতখানি গৌরবময় ছিল না। সেখানে দারিদ্রের লাঞ্ছনা ছিল। নারীজন্মের প্রত্যাখ্যান ছিল। রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি হেমসুন্দরী বাল্যবৈধব্যের যন্ত্রণা থেকে অব্যাহতি পেতে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন, বাংলা ছেড়ে চলে যান মেরঠে। সেখানে তাঁর পুনর্বিবাহ হয় হিন্দিভাষী সাংবাদিক ও গল্পকার পেয়ারেলালের সঙ্গে। তাঁদের একটি মেয়ে হয়, নাম রাখা হয় প্রভাবতী দেবী। সুকণ্ঠী হওয়ার সুবাদে কৈশোর অতিক্রম করার পর প্রভাবতী সঙ্গীতশিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বোম্বে পাড়ি দেন। আলাপ হয়, মাস্টার আলি বক্স-এর সঙ্গে। আলি বক্স পেশায় হারমোনিয়াম-বাদক এবং সঙ্গীতশিক্ষক। কিছু হিন্দি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার কাজও করেছিলেন তিনি। কর্মসূত্রের আলাপচারিতা ঘনিষ্ঠতার রূপ নিলে প্রভাবতী ধর্মান্তরিত হন। তাঁর নতুন নাম হয় ইকবাল বানো। এই নামেই আলি বক্সের সঙ্গে নিকাহ হয় তাঁর। ইকবাল তখন মঞ্চে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করেন, নাচগান করেন। দুজনের এই রোজগারে সংসার চলে না। ইকবাল ও আলির প্রথম সন্তান জন্মায়, কন্যাসন্তান। আশা ছিল, দ্বিতীয় বার হয়তো পুত্রসন্তান জন্মাবে। অথচ আবারও একটি মেয়ে হয়, তারিখ ১ অগস্ট ১৯৩৩ (মতান্তরে ১৯৩২)। হতাশ আলি বক্স বোম্বে শহরের মধ্যেই একটি অনাথ আশ্রমের বারান্দায় শিশুটিকে রেখে আসেন। কিছু দূর এগিয়ে যাওয়ার পর বাচ্চাটির তীব্র কান্নার আওয়াজে ফিরতে বাধ্য হলে, এসে দেখেন বারান্দায় পড়ে থাকা মেয়ের সারা গায়ে লালপিঁপড়ে ভর্তি। অবশেষে আলি বক্সের মায়া হয়। মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘরে ফেরেন। মাতাপিতা সম্মিলিত ভাবে সিদ্ধান্ত নেন, এই মেয়েকেই ছেলের দায়িত্ব পালন করে তাঁদের দেখাশোনা করতে হবে এক দিন। নাম রাখা হল মেহজ়বিন। অতএব, যে বয়সে খেলনা কোলে নিয়ে, বই হাতে নিয়ে আদরে প্রতিপালিত হওয়ার কথা ছিল, সেই বয়সে মেহজ়বিন গেলেন ফিল্মের অডিশন দিতে। পরে এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনি মাত্র ছ’বছর বয়সে সিনেমাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন, এ কথা কি সত্যি?”

রিনরিনে গলায় মিঠে হেসে মীনা বলেছিলেন, “জীবন আমায় সিনেমার জন্য বেছে নিয়েছিল।”

ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখার পর মেহজ়বিনের নাম হয় বেবি মীনা। এই নামেই তাঁকে রুপোলি পর্দার একাধিক ছবিতে দেখা যায়। মীনার তেরো বছর বয়সে মুক্তি পায় ‘বাচ্চো কা খেল’, সেখানে অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর নাম দেখানো হয় মীনা কুমারী। মীনা কুমারীর ডাকনাম ছিল মুন্না। এই মুন্না ছোটবেলায় চেয়েছিল মাদ্রাসায় গিয়ে পড়াশোনা করতে। কিছু দিন স্কুলে যেতেও শুরু করে। কিন্তু একের পর এক ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। বাড়িতে শিক্ষক রেখে উর্দু ও হিন্দির পাঠ চলতে থাকে। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি পড়ুয়া মীনার নাম দিয়েছিল ‘রিডিং মেহজ়বিন’। ঘরে বাইরে, শুটিংয়ের ফাঁকে সর্বত্রই দেখা যেত মীনার হাতে কোনও না কোনও বই, সে কবিতার হোক বা গল্পের। মুন্নার উপার্জনে সংসারের একটা বড় খরচ অতিবাহিত হত। ঘরে তার সঙ্গী ছিল প্রায় পিঠোপিঠি বোন মধু, ওরফে মাহলিকা। কারও খেলার জন্য একটা পুতুলও ছিল না। মীনা কিছু পাথর তুলে এনে একা একা খেলত, তাদের বালিশের পাশে রেখে ঘুম পাড়াত, গল্প বলত। মীনার বয়স যখন আঠেরো অতিক্রান্ত, এক বার পরিচালক শাওন কুমার ছবির কাজের জন্য মীনার সঙ্গে দেখা করতে যান। মীনার ঘরে ঢুকে দেখেন, ইটের গায়ে গায়ে ইংরেজি অক্ষরে সর্বত্র ‘এম’ লেখা। শাওন রসিকতা করে শায়েরি শোনান, ‘হ্যায় ইয়ে কেয়া কিয়া ম্যায়নে/ নাম পত্থরো পে লিখ দিয়া ম্যায়নে।’ মীনা বলেন, ‘এই পাথরগুলো আমার নীরব সঙ্গী। আমি হাসলে এরা হাসে, আমি কাঁদলে এরা কাঁদে। এমনকি যখন বকাবকি করি, তখনও মুখ বুজে সব শোনে।’ আব্বা-আম্মার কাছ থেকে মীনা বিত্তসম্পত্তি পাননি, উত্তরাধিকার সূত্রে মীনা পেয়েছিলেন সঙ্গীত, কবিতা, নৃত্যে পারদর্শিতা আর অতুলনীয় অভিনয় দক্ষতা। কমবয়সের কড়কড়ে বাসি রুটিতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে, প্রচুর খ্যাতি ও অর্থ অর্জন করার পরেও ঘরে ফিরে বাসি রুটি খেতেন প্রায়ই।

দেখা হবে চন্দনের বনে

শৈশব-কৈশোরের ভক্তিমূলক ছবির ইমেজ থেকে বেরিয়ে মীনা কুমারী যখন দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভাল স্ক্রিপ্ট খুঁজছেন, তখন ফণী মজুমদারের ‘তামাশা’ ছবিতে নায়িকার চরিত্রে তিনি অশোক কুমার ও দেবানন্দের বিপরীতে কাজ পেয়ে যান। ১৯৫০ নাগাদ এই ছবির শুটিং চলাকালীন, ফ্লোরে বেশ নামকরা এক পরিচালক কামাল আমরোহীর সঙ্গে মীনা কুমারীর পরিচয় করিয়ে দেন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী অশোক কুমার। কামাল সে সময়ে তাঁর ‘আনারকলি’ ছবির জন্য নতুন মুখ খুঁজছেন। মীনাকে তাঁর পছন্দ হয়। তবে, এটাই কামালের সঙ্গে মীনার প্রথম সাক্ষাৎ নয়। সদ্যতরুণ পরিচালক কামাল একটি ছবিতে শিশুশিল্পী নেওয়ার জন্য প্রথম বার আলি বক্সের বাড়িতে যান। পাঁচ বছরের একটি মেয়ে মুখে কলার পেস্ট মেখে হাসিমুখে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। ছবির জন্য তখন অবশ্য মেহজ়বিন নির্বাচিত হননি। অতঃপর মীনা সতেরো আর কামাল চৌত্রিশে বছর বয়সে এসে পৌঁছন। মার্চ, ১৯৫১-তে ‘আনারকলি’ ছবির চুক্তিপত্রে সই করেন মীনা। তত দিনে পুরনো মলিন ঘর ছেড়ে মীনাদের পাঁচ জনের পরিবার উঠে এসেছে বান্দ্রার নতুন বাড়িতে। দেড় বছর ধরে ক্যান্সারে ভোগার পর মারা গেছেন মীনার মা ইকবাল। ‘আনারকলি’ ছবির শুটিং শুরু হওয়ার ঠিক আগে মীনা সপরিবারে ফিরছিলেন মহাবালেশ্বর থেকে। রাস্তায় গাড়ি দুর্ঘটনায় সামনের সিটে বসে থাকা মীনা সাঙ্ঘাতিক জখম হলেন। ভর্তি করা হল পুণের হাসপাতালে। খবর পেয়ে মুম্বই থেকে ছুটে এলেন পরিচালক। মীনার তত ক্ষণে জ্ঞান ফিরেছে। কামালকে দেখে বোন মধু বললেন, “নাও, এত ক্ষণ যার অপেক্ষায় ছিলে সে এসে গেছে।” কামাল বুঝতে পারলেন, এ সম্পর্ক নেহাত নায়িকা ও পরিচালকের পেশাগত যোগাযোগে থেমে নেই। শুরু হল উপন্যাসের নতুন অধ্যায়। যেখানে একে অপরের কাছে হয়ে উঠলেন মঞ্জু ও চন্দন— উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা। চার মাস হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মীনা। প্রায় প্রতিদিন কামালের গাড়ি আসত, তিনি মীনার কাছে দু’দণ্ড বসতেন, চিঠি তুলে দিতেন তাঁর মঞ্জুর হাতে, বিনিময়ে পেতেন চন্দনকে লেখা একটি চিঠি।

কিন্তু এ সময়ে জানা গেল, প্রযোজকের ব্যবসায় মন্দা শুরু হওয়ায় ‘আনারকলি’-র শুটিং আর চালানো যাবে না। তাতে অবিশ্যি নায়িকা ও পরিচালকের মনে বিশেষ বেদনার সঞ্চার ঘটল না। এমনকি দুর্ঘটনার ফলে স্থায়ী ভাবে বেঁকে যাওয়া বাঁ হাতের কড়ে আঙুল নিয়েও মীনা খুব বেশি বিচলিত হলেন না। কেননা, কাজের সময়টুকু ছাড়া সারা দিন-রাত জুড়ে মঞ্জু ও চন্দন ডুবে থাকতেন একে অন্যের ফোন কলে। মীনা আলি বক্সকে স্পষ্ট জানালেন, বিয়ে যদি করতে হয় তবে সে তার চন্দনকেই করবে। আর আলি বক্সেরও জেদ, বিয়ে করলে এ বাড়ির দরজা মীনার জন্য চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে যাবে। জীবনে মীনা ঢুকে পড়ার আগেই কামালের এক স্ত্রী, দুই পুত্র ও এক কন্যা ছিল। সবার অলক্ষে ১৯৫২-র ১৪ ফেব্রুয়ারি মঞ্জুকে বিয়ে করলেন চন্দন। সাক্ষী ছিলেন কামালের ব্যক্তিগত সহকারী বাকর আলি এবং মীনার বোন মধু। বেশ কয়েক মাস ব্যাপারটা গোপন রাখা গিয়েছিল। তার পর খবর পৌঁছয় আলি বক্সের কানে। তৎক্ষণাৎ স্বাধীনচেতা মেয়ের সঙ্গে একগুঁয়ে পিতার বচসা বেধে যায়। আলি বক্স চান উভয়ের মধ্যে ডিভোর্স করাতে। মীনা ঘর থেকে বেরিয়ে কামালের নতুন ছবি ‘দায়েরা’-তে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য চলে যান। কয়েক দিন পর বাড়ি ফিরে এলে আব্বা সত্যিই আর দরজা খোলেন না।

মীনাকে রাতারাতি চলে যেতে হয় কামালের বাড়িতে। সেখানে কামালের স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সুখের সংসার। প্রথমটায় কিছু মনোমালিন্য হলেও ধীরে ধীরে বাচ্চাদের সঙ্গে ‘ছোটি মা’-এর চমৎকার ভাব জমে যায়। মীনা মানুষটাই তো এমন। দরদি, মিষ্টভাষী। পরিচালক কামাল আর নায়িকা মীনার যৌথ উদ্যোগে বহু ছবি মুক্তি পায় এর পর। বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় হয়, বক্স অফিসে সাফল্যও পায়। ১৯৫৪-এ ‘আজ়াদ’ ছবির জন্য সকলে দক্ষিণ ভারত যান। সেখানে কাজের ফাঁকে একান্তে বসে কামাল মীনাকে ‘পাকিজ়া’ ছবির পরিকল্পনার কথা শোনান। ছবির কাজ শুরু হয় ১৯৫৬-তে, কিন্তু নানা জটিলতায় কাজ বন্ধও হয়ে যায় দ্রুত। অবশেষে ১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে ‘পাকিজ়া’ মুক্তি পায়। ছবিটি প্রথম কয়েক সপ্তাহ একেবারেই বক্স অফিস সাফল্য পায়নি। মীনার তখন গভীরতর অসুখ। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ৩১ মার্চ ১৯৭২ তারিখে চন্দনের সম্মতিতে মঞ্জুর লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। মীনা মারা যান। তাঁকে শোয়ানো হয় মুম্বইয়ের রেহমতাবাদ কবরস্থানে। একুশ বছর পর চন্দনের মৃত্যু হলে মঞ্জুর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী চন্দনকে কবর দেওয়া হয় মঞ্জুর কবরের পাশে। মীনা কুমারীর মৃত্যুর পর ‘পাকিজ়া’ সাফল্যের মুখ দেখে। বলা বাহুল্য, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘পাকিজ়া’ এখনও আলোচ্য বিষয়।

চাঁদ একা, আকাশ একাকী

অদ্ভুত বিষাদ এল

অস্ফুট স্বর বলতে বলতে

ফুটিফাটা জমির ওপরে ছুটতে ছুটতে

দগ্ধ পায়ের পাতা নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে

ক্লান্ত হয়ে যাই, কিন্তু

অদ্ভুত বিষাদ এল

যে মুখে সম্মোহন নেই, সরলতা নেই,

এমনকি অপারগতা নেই কোনও…

– নাজ়

‘মীনা, মওত মুবারক হো!”

মীনা কুমারীকে মৃত্যুর অভিনন্দনবার্তা জানিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় বা-জি, দিদিতুল্য বন্ধু, নার্গিস। একটি জনপ্রিয় উর্দু পত্রিকায় ‘ইয়ে উন দিনো কি বাত হ্যায়’ শিরোনামের ধারাবাহিকে মীনা কুমারীর মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে নার্গিস অকপটে বলতে পেরেছিলেন— “মীনা, আর কখনও এ পৃথিবীতে ফিরো না। এ জায়গা তোমার মতো মানুষের জন্য নয়।” ষাটের দশকের শুরুতে ‘ম্যায় চুপ রহুঙ্গি’ ছবির শুটিংয়ে মীনা কুমারী আর নার্গিস পাশাপাশি ঘরে ছিলেন। মাঝরাতে মীনার ঘর থেকে কামাল ও মীনার ঝগড়া, চিৎকার আর মীনার কান্নার শব্দ ভেসে আসে। পরদিন সকালে দেখা যায় মীনার সমস্ত চোখমুখ ফোলা। একই ঘটনা ‘পিঁজরে কে পনছি’ ছবির শুটিংয়েও দেখা গিয়েছিল।

মীনার চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক পেশা নিয়ে কামালের আপত্তি ছিল না। তবে স্বামী হিসেবে তিনি কিছু শর্ত চাপিয়ে দিয়েছিলেন। এক, মীনার মেকআপ রুমে মেকআপ আর্টিস্ট ছাড়া কেউ ঢুকতে পারবে না। দুই, মীনার গাড়িতে কোনও পুরুষ সহকর্মী উঠতে পারবে না। তিন, যত ব্যস্ততাই থাক, মীনাকে বাড়ি ফিরতে হবে সন্ধের আগে। মীনা সব শর্তই মেনে নিয়েছিলেন প্রথম দিকে। ক্রমশ তা আর সম্ভব হয় না। এক জন প্রাপ্তবয়স্ক শিল্পীর স্বাধীন জীবন সব সময় শর্তের নিগড়ে আটকে থাকবেই বা কেন! মীনার জীবনযাপন নিয়ে কামাল অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করেন। সহকারী বাকর আলিকে নিয়োগ করেন গুপ্তচর হিসেবে। বাকর মীনার সমস্ত খবর কামালকে জানাতেন। এক বার বাকর মেকআপ রুমে আচমকা ঢুকে গুলজ়ারকে দেখতে পান এবং তৎক্ষণাৎ মীনার গালে সজোরে থাপ্পড় মারেন। স্তম্ভিত অপমানিত মীনা ফোন করে কামালকে ফ্লোরে ডেকে পাঠান। কামাল আসেন না। সে দিন শুটিংয়ের পর মীনা আর কামালের কাছে ফেরেননি। বোন মধুর বাড়িতে চলে যান। কামাল সেখানে গিয়ে কয়েক বার মীনাকে ফিরে আসতে অনুরোধ করেন। মীনা ফেরেন না। এর পর আর কামালও ডাকেননি কখনও। ১৯৬৩ নাগাদ একটি ছবির প্রিমিয়ারে কয়েক জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ায় সময়ে অভিনেতা শোহরাব মোদী বলেন, “ইনি স্বনামধন্য অভিনেত্রী মীনা কুমারী, ইনি তাঁর স্বামী, পরিচালক কামাল আমরোহী।” কামাল সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলে ওঠেন, “আমি পরিচালক কামাল আমরোহী, ইনি আমার স্ত্রী মীনা কুমারী।”

১৯৬৪-তে উভয়ের সম্মতিক্রমে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তার কয়েক বছর আগে থেকেই মীনা নিয়মিত মদ্যপান শুরু করেন। বহুচর্চিত ‘সাহিব বিবি অউর গুলাম’ ছবিতে মীনা অভিনয় করেছিলেন মদ্যপ ছোটি বহু-র চরিত্রে। সেখানে কিন্তু কোথাও মীনা এক বিন্দু মদ মুখে দেননি, পুরোটাই ছিল অভিনয়। একদা কামাল স্বয়ং তাঁকে শিখিয়েছিলেন, মদ না খেয়েও কী ভাবে মদ্যপের অভিনয় করা যায়। সেই মীনা, প্রাথমিক ভাবে, ডাক্তারের পরামর্শ মতো দীর্ঘকালীন অনিদ্রার চিকিৎসার জন্য রোজ সামান্য ব্র্যান্ডি খেতে শুরু করেন। ক্রমে মদ ও শায়েরি, এই হয়ে পড়ে তাঁর ভাল থাকার চেষ্টায় প্রধান অবলম্বন। মীনার মৃত্যুর পর শিল্পী তবস্সুমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চার বার বিবাহিত কামাল আমরোহী সঙ্কোচহীন ভাবে বলেছিলেন, “মীনা যত ভাল অভিনেত্রী, স্ত্রী হিসেবে ততটাই খারাপ।”

জীবনের নিষ্ঠুর পরিহাসে যে সমীকরণে দু’জন মানুষ প্রেমে পড়ে, সেই সমীকরণে দু’টি মানুষ প্রেমে বাঁধা থাকে না। মীনা যখন সিরোসিস অব লিভারে আক্রান্ত, কামাল আবার মীনাকে প্রস্তাব দেন ‘পাকিজ়া’ ছবির কাজ শুরু করার। সঙ্গীত পরিচালক খৈয়াম ও তাঁর স্ত্রী সঙ্গীতশিল্পী জগজিৎ কৌরের অনুরোধে মীনা অভিনয় করতে রাজি হন। ওই সময়ে খৈয়ামের পরিচালনায় একটি রেকর্ডও বেরোয়, নাম ‘আই রাইট, আই রিসাইট’— মীনার লেখা ও গাওয়া কবিতাংশগুলির সঙ্কলন। ১৯৭১-এ মুক্তি পায় গুলজ়ার নির্মিত ছবি ‘মেরে আপনে’। অন্যতম প্রধান চরিত্রে মীনা কুমারী। মীনা তখন আরও অসুস্থ, শরীর খুব দুর্বল। তাঁর লেখার খাতাটি তিনি গুলজ়ারকে দিয়ে যান। মীনার মৃত্যুর পর গুলজ়ারের সম্পাদনায় প্রকাশ পায় নাজ় ছদ্মনামে লেখা কবিতাগুলি। বইয়ের নাম— ‘তন্হা চাঁদ’।

চাঁদ একা হয়, আকাশও বড়ই একাকী

কোথায় হৃদয় মিলে যায় দু’টি একাকী

আকাঙ্ক্ষা নেভে, তারারাও নিভু নিভু আজ

কাঁপে ধোঁয়া কাঁপে নিভৃতে কোথাও একাকী

একেই জীবন বলে কি না আমি জানি না…

– নাজ়

১৯৬৮-তে তিন মাস লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকার পর শহরে ফিরে মীনা প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর নিজস্ব কোনও ঘর নেই। আশৈশব তিনি যা উপার্জন করেছেন, প্রাথমিক ভাবে মা, বাবা, বোনেদের জন্য। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির জন্য দু’হাতে বিলিয়ে দিয়েছেন অধিকাংশ। সঞ্চিত অর্থে ওই বছর মীনা বান্দ্রায় বারো তলায় একটি ফ্ল্যাট কেনেন। বাড়িটির নাম ছিল ‘ল্যান্ডমার্ক’। তাঁর নিজের এক চিলতে বাসস্থান। শেষ তিন বছর মীনা ওখানেই কাটিয়েছিলেন। ‘পাকিজ়া’ ছবির প্রিমিয়ারের দিন কামালের পাশে বসে রোমাঞ্চিত হয়ে বলেছিলেন, ‘স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে!’ চোখে জল এসেছিল মীনার। মীনার? না কি নিজেকে ফেলে আসা মেহজ়বিনের? এক বার আউটডোর শুটিং থেকে ফেরার পথে ডাকাতরা গাড়ি আটকেছিল তাঁদের। গাড়ির মধ্যে মীনা কুমারী আছেন জানতে পেরে ডাকাত সর্দার একটি ছুরি মীনার হাতে দিয়ে বলেছিল, “হাত কেটে তুমি নিজে হাতে তোমার নাম লিখে দাও।” বহু কষ্টে মীনা লিখে দিয়েছিলেন। আপামরের কাছে এতখানি কাঙ্ক্ষিত মেয়েটি প্রিয় মানুষের চোখে প্রত্যাখ্যাত থেকে গেছেন আজীবন। বহু পুরুষের নাম উঠে এসেছে বার বার। সর্বত্রই তো ভাল থাকার, ভালবাসা পাওয়ার সন্ধান… খেপারা যেমন খোঁজে পরশপাথর।