নিহত নুরুল মোস্তফা সওদাগর (বামে), নুরুল মোস্তফার মেঝ ছেলে আহমদ হোসেন (মাঝে) ও আটক নুরুল মোস্তফার বড় ছেলে সাদেক হোসেন ওরফে সাদ্দাম (ডানে)। ছবি: প্রতিনিধি

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে নৃসংশভাবে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার (১৩ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাতে উপজেলার ৩ নং জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের মধ্যম সোনাপাহাড় গ্রামে নির্মম এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।

ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পরিবারের বড় ছেলে সাদেক হোসেন ওরফে সাদ্দাম ও তার স্ত্রী আইনুন নাহারকে আটক করেছে পুলিশ। অবশ্য পরে ঘটনার সাথে আইনুন নাহারের সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

নিহতদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) পাঠিয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ছেলে সাদেক হোসেন খুনের ঘটনায় স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

নিহতরা হলেন, স্থানীয় নতুন বাজারের মুদি ব্যবসায়ী নুরুল মোস্তফা সওদাগর (৬০), তাঁর স্ত্রী জোসনা আক্তার (৫০) ও তাদের মেজ ছেলে আহমদ হোসেন (২৫)। বৃহস্পতিবার বেলা ৫টা নাগাদ পুলিশ জানিয়েছে এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নিহতদের স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পরিবারের সম্পত্তি ভাগভাটোয়ারা নিয়ে দীর্ঘ ৪ বছর যাবৎ নুরুল মোস্তফার সাথে তার দুই ছেলে সাদেক ও আলতাফ হোসেনের বিরোধ চলছিলো। দুই ছেলে পরিবারের ভরনপোষন দিতো না। মেজ ছেলে আহমদ হোসেন বাবার সাথে মুদি দোকান করতো। মোস্তফা সম্পত্তি তার স্ত্রী মেজ ছেলে আহমদ হোসেন এবং একমাত্র মেয়ের নামে দলিল করে দেয়। এরপর থেকে পরিবারে বিরোধের সূত্রপাত।

স্থানীয় জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর মধ্যম সোনাপাহাড় ওয়ার্ডের সদস্য মনির আহম্মদ ভাসানী জানান, সম্পত্তি নিয়ে মোস্তফার সাথে বড় ছেলে সাদ্দাম এবং ছোট ছেলে আলতাফ হোসেনের বনিবনা ছিলো না। তবে এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে কোন শালিস দরবারও হয়নি।

নিহত নুরুল মোস্তফার ছোট ছেলে আলতাফ হোসেন জানান, ঘটনার রাতে তিনি মিরসরাইয়ের বারইয়ারহাট পৌর এলাকায় একটি মাছের আড়তে কর্মরত ছিলো। ভোরবেলায় ফোনে খবর পেয়ে তিনি বাড়িতে আসেন।

এ সময় আলতাফ বলেন, ‘মেজ ভাইয়ের আগে আমি বিয়ে করায় বাবা আমাকে তিন বছর আগে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এরপর থেকে পরিবারের সাথে আমার কোন যোগাযোগ ছিলো না। আমার বড় ভাই ডাকাতরা মা, বাবা ও ভাইকে হত্যা করার কথা বললেও আমার মনে হচ্ছে তিনি হত্যা করেছেন।

মধ্যম সোনাপাহাড় গ্রামের বাসিন্দা শামসুদ্দিন আবির বলেন, ঘটনায় নিহত আহম্মদ হোসেনের বিয়ের কথা বার্তা পাকা হয়। শুক্রবার (আজ) ফর্দ অনুষ্ঠান আয়োজনের দিনক্ষণ ঠিক ছিলো। গত বুধবার বিকালের দিকে তার বাবা মুদি ব্যবসায়ী নুুরুল মোস্তফা গ্রামের গন্যমান্য ব্যক্তিদের দ্বারস্ত হন পরিবারের অন্য ছেলেদের থেকে মেঝ ছেলের বিয়েতে কিছু টাকা পয়সা নিয়ে দিতে। আমরা ধারণা করছি হয়তো বা বুধবার রাতে এই ইস্যুতে পরিবারের মধ্যে ঝগড়া হতে পারে। সেই ঝগড়া থেকেই খুনের ঘটনার সূত্রপাত।

এলাকার বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, রাত ৪টার দিকে ডাকাত ডাকাত চিৎকার শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। মোস্তফা সওদাগরের বাড়িতে এসে দেখি ভেতর থেকে ঘরের দরজা তালা লাগানো। পরে মোস্তফার বড় ছেলে সাাদেক তালা খুলে দিলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে দেখি মোস্তফা, তার স্ত্রী ও মেজ ছেলে রক্তাত্ব অবস্থায় নিচে পড়ে আছে। কিন্তু সাদেক, তাঁর স্ত্রী ও সন্তান অক্ষত। তখনই ধারনা হয়েছে সাদেক মা, বাবা-ভাইকে খুন করে ডাকাতির নাটক বানাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, প্রায় সময় তাদের পরিবারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঝগড়া বিবেধ লেগেই থাকতো।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে প্রথমে স্থানীয় জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ, এরপর পিআইবি ও চট্টগ্রাম সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের ডিএনএ ও হত্যাকান্ডের বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।

পিবিআই এসপি নাজমুল হাসান বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে এসে আলামত সংগ্রহ করেছি। তদন্তের পর ঘটনার রহস্য বেরিয়ে আসবে। এরপর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (মিরসরাই সার্কেল) মোহাম্মদ লাবিব আব্দুল্লাহ উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা বাড়ির ভেতর ডাকাতির কোন আলামত পাইনি। ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র গুছানো ছিল। আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি পারিবারিক বিরোধ বিশেষ করে সম্পত্তি ভাগ ভাটোয়ারা নিয়ে নির্মম এ খুনের ঘটনা ঘটেছে।’

হত্যাকান্ডের পর সাদেক হোসেন সাদ্দাম ও তার স্ত্রী আইনুন নাহারকে আটক করা প্রসঙ্গে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘যেহেতু ঘরের ভেতরে সাদ্দামকে স্বস্ত্রীসহ অক্ষত পাওয়া গেছে। সেহেতু আমরা তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নিয়েছি। থানায় নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’

পুলিশ আরো জানায়, নিহত নুরুল মোস্তফা ও তার স্ত্রী জোসনেয়ারা বেগমের গলায় এবং শরিরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো ছুরির আঘাত পাওয়া গেছে। তারা দু’জন একই কক্ষে মেঝেতে পড়েছিলো। নিহত আহম্মদ হোসেনের গলা কাটা অবস্থায় নিজের সয়ন কক্ষের মেঝেতে পড়েছিলো।

এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম, মাহমুদ হাসান বলেন, এমন ঘটনা আগে পত্র-পত্রিকায় দেখেছি। কিন্তু আজ বাড়ির পাশে একসাথে তিনজনকে খুন করার ঘটনা দেখেছি। সম্পত্তির জন্য নিজের ছেলে কিভাবে মা-বাবা ও ভাইকে খুন করতে পারে?

জোরারগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নুর হোসেন মামুন বলেন, খবর পেয়ে আমরা দ্রæত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। ঘরে গিয়ে বড় ছেলের কথা-বার্তা সন্দেহজনক হলে তাকে থানায় আটক করে নিয়ে এসেছি। কিন্তু প্রথমে থানায় খুনে বিষয়টি স্বীকার না করলেও বিকেলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে মা, মাবা ও ভাইকে খুনে কথা স্বীকার করে এবং তাঁর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ঘরের পেছনে জমি থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহত চুরি উদ্ধার করা হয়েছে।

মূলত তাকে সম্পত্তি না দেয়ায় ও তাঁর স্ত্রীকে প্রায় সময় বকাঝকা এবং তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার কথা বলায় সে তাদের হত্যা করেছে।

তিনি আরো জানান, প্রথমে ঘুমের মধ্যে বাবাকে উপর্যপুরি চুরিকাঘাত করে। এরপর মা ঘুম থেকে উঠলে কিছু বুঝার আগে তাঁর শরীরের আঘাত করে। তাদের আওয়াজ শুনে পাশের কক্ষে ঘুমনো ভাই আহম্মদ হোসেন এগিয়ে আসলে তাকেও একইভাবে হত্যা করা হয় বলে সাদেক জানান।