এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : মো. ফিরোজ হোসেন। ১০ বছর ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিভিন্ন রুটের বাসের লাইনম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দিনে যা আয় হয় তা দিয়ে মোটামুটি চলে যায় তার সংসার। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সড়কে বাসের সংখ্যা কমে গেছে। কমে গেছে তার আয়।

আগে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ টাকা আয় হতো, এখন ৩০০ টাকাও হচ্ছে না। অনেক কষ্টে দিন কাটছে তার।

শনিবার সকালে ফিরোজ বলেন, ভাই অনেক কষ্টে আছি। ছেলে কাল ইলিশ মাছ নিতে বলেছিলো, পারিনি। কাল আয় করেছি ৩৬০ টাকা। তা দিয়ে তো ইলিশ কেনা যায় না। পরে এক কেজি লইট্টা মাছ কিনে নিয়েছি। জ¦ালানির দাম বেড়ে যাওয়ার রাস্তায় আগের মতো গাড়ি নেই। আমারও ইনকাম আগের মতো নাই।

শনিবার (১৩ আগস্ট) একইদিন সকাল সাড়ে ১০টা। মিরসরাই সদরে ফুটওভারব্রিজের নিচে ভ্যান নিয়ে বসে আছেন চালক আলমগীর, মীর হোসেন, শাসছুল হক, নুর নবী সহ ৮-১০জন। আলমগীর বলেন, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বসে আছি। এখনো একটা ভাড়াও পাইনি। গত দুই সপ্তাহ এভাবে যাচ্ছে। আগের মতো ভাড়া নেই। আয় অনেক কমে গেছে। তারউপর জিনিসপত্রের দাম হুহু করে বাড়ছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। এরপর রয়েছে সাপ্তাহিক কিস্তি। কিভাবে চলবো বুঝতে পারছি না।

দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন দাম বেড়ে যাওয়ায় চরম কষ্টে দিন কাটছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন পেশার নিম্ন আয়ের মানুষের। জ¦ালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রভাব পড়েছে তাদের নিজ নিজ পেশায়। একে তো আগের মতো আয় নেই, তার উপর খরচ বেড়ে গেছে অনেক বেশি। কাউকে কিছু বলতে পারছে না। এ যেন মানুষের বোবা কান্না। শুধু নিম্ন আয়ের নয়, জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক দাম বেড়ে কষ্টে রয়েছেন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বারইয়ারহাট-বড়দারোগাহাট রুটে চলাচল করা লেগুনার হেলপার আব্দুর রহমান বলেন, বারইয়ারহাট থেকে মিরসরাই সদর পর্যন্ত এসেছি একেবারে খালি গাড়ি নিয়ে। যাত্রী নেই তেমন। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকে ভাড়াও বেড়ে গেছে। কিন্তু যাত্রী অনেক কম এখন। বারইয়ারহাট থেকে বড়তাকিয়া পর্যন্ত ২০০ টাকার ভাড়া আদায় করতে পারিনি। অথচ আগে এই দুরত্বে ৫০০-৬০০ টাকা ভাড়া তুলতাম। তেলের টাকাও উঠবে না।

পান দোকানদার নুরুল আলম বলেন, বেচা-কেনা নেই বললে চলে। আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ। এই দোকানের আয় দিয়ে সংসার চলে। গত কিছুদিন ধরে বেচাকেনা একেবারে নেই। তার উপর পান সিগারেটের দামও বেড়ে গেছে। আগের মত পুঁজি দিতে পারছি না। বেচা-কেনা না বাড়লে না খেয়ে থাকতে হবে।

মিরসরাই কলেজ রোড়ের মাথায় বসা মুচি নেপাল চর্মকার বলেন, আগের মতো কাজ নেই। মানুষ ঠিকমতো খেতে কষ্ট হচ্ছে। কিভাবে জুতার কাজ করাবে। কাজ কমে যাওয়া আমরাও অনেক কষ্টে আছি।

উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের মধ্যম ওয়াহেদপুর এলাকার নির্মাণ শ্রমিকের সহকারি আবু বক্কর বলেন, আমি কাজ করে ৪০০ টাকা বেতন পাই। এই বেতনে কিছু হয় না। চাল, ডাল, তেল সহ বিভিন্ন সবজির যেভাবে দাম বেড়েছে, কিন্তু আমাদের বেতন বাড়েনি। মাছ-গোসত তো দুরে কথা এই বেতনে এক জিনিস কিনলে, আরেক জিনিস কিনতে পারি না।

কলেজ ছাত্র সাদমান সময় বলেন, বয়লার মুরগী, ডিম ছিলো মধ্যবিত্ত, নি¤œ মধ্যবিত্তদের খাবারের তালিকার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু গত কয়েকদিন বয়লার মুরগী ও ডিমের দামও বেড়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, বাজারে এক দোকানে জিনিসের এর ধরনের দাম রাখে। এ জন্য প্রশাসনের অভিযান অভিযান চালানো প্রয়োজন।

বারইয়ারহাট পৌর বাজারের মুদি দোকানদার আব্দুল মতিন বলেন, সব কিছু আমরা বেশি টাকায় কিসতে হচ্ছে। তাই আমরা আগের তুলনায় বেশি টাকায় খুচরা কাস্টমারদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে।

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিনহাজুর রহমান বলেন, শুধু মিরসরাই নয়, সারাদেশে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। এতে সাধারণ মানুষের সংসার চালাতে আসলে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ইতমধ্যে বিভিন্ন বাজারের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য অভিযান চালাচ্ছি। দুয়েকদিনের মধ্যে বাজারমূল্য নিয়ে অভিযান পরিচালনা করবো।