চট্টগ্রামে সবুজ রঙের ছোট এলাচের চাষ প্রথম শুরু করেছেন ওমর শরীফ

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : ওমর শরীফ তরুণ কৃষি উদ্যেক্তা ও বৃক্ষপ্রেমী এক যুবক। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে দেশি-বিদেশী অনেক ফুল, ফল ও ঔষধী গাছের চারা। চারা সংগ্রহ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও ছুটে চলেছেন থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, দুবাই ও পাশ্ববর্তি ভারতে। স্বপ্ন এক সময় দেশে গড়ে তুলবেন সব ধরনের দূর্লভ গাছের চারা।

গড়ে তুলেছেন জোহরা এগ্রো ফার্মস এন্ড নার্সারী নামে বিশাল পরিসর। রয়েছে ফলদ ও ঔষুধী গাছের বাগান। কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা, সততার উপর ভর করে বুকভরা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন শরীফ। তাঁর দেখাদেখি উৎসাহ পেয়ে সহযোগিতা নিয়ে অনেক বেকার যুবক বাগান করছে।

মিরসরাই উপজেলায় প্রথম বারের মত এলাচের চাষ করেছেন তিনি। চট্টগ্রামে সবুজ রঙের ছোট এলাচের চাষ প্রথম শুরু করেছেন শরীফ।

সরেজমিনে বাগানে গিয়ে দেখো গেছে, রোপন করা এলাচ গাছে ফুল এসেছে। গোলাপী ধাচের একটা রঙ। কিন্তু চোখে পড়লো প্রতিটি ফুলের গোড়াতেই সবুজ রঙা একটা করে গুটি। এই গুটিগুলোই একেকটা এলাচদানা।

আদা-হলুদ-সটি গাছের সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে- এই এলাচের গাছের সঙ্গে তারা সাযুজ্য খুঁজে পাবেন। একই গোত্রের গাছ হয়তো। কিন্তু আদা কিংবা হলুদ যেমন গাছের নিচে শিকরে ধরে এই গাছে এলাচ ধরে গাছের গোড়ার ভাগটায়।

গোড়ার দিক থেকে লম্বাটে ধরনের একটি ফুল বের হয়। আর ফুলের গোড়ার দিকটাতেই বেড়ে ওঠে ফল। এই ফলই হচ্ছে আমাদের পরিচিত এলাচ।

এমন একটি দুটি নয় গাছের গোড়ায় মাটি সংলগ্ন হয়ে লতিয়ে ওঠা ডগাগুলোতে গুচ্ছ গুচ্ছ এলাচ ধরে। এখন গাঢ় সবুজ রঙ সেই এলাচের।

কথা হয় তরুণ উদ্যেক্তা ওমর শরীফের সাথে।

তিনি জানান, পাঁচ বছর আগে শখের বসে এলাচ চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে আগ্রহী হলেই তো হবে না। উদ্যোগীও হতে হবে, যার কমতি নেই ওমর শরীফের।

গুয়েতমোলা , শ্রীলংকা , থাইল্যান্ড, ভারত, ইরান ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ২০০টি চারা সংগ্রহ করে আনেন। এরপর সেই চারা দিয়ে এলাচের এক মিশ্র বাগান করেন এই পাহাড়ি অঞ্চলে।

তবে পথটা অত সহজ ছিলো না। চারা এনে লাগিয়ে দিলেই হয়ে যায় না, এর চাষের রীতিপদ্ধতিও রয়েছে। তা বুঝতে সময় লেগে যায়। এর বাইরে আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

কিন্তু হাল ছাড়েননি ওমর শরীফ। ব্রাউজ করে করে বিভিন্ন দেশের এলাচ চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে পড়াশুনা করে তার প্রয়োগ ঘটিয়ে তবেই এলাচ চাষ করে সফলতা পেয়েছেন তিনি।

কৃষি বিভাগ ও মসলা ইনস্টিটিউশনের কর্মকর্তারা একাধিকবার ওমর শরীফের বাগান পরিদর্শন করেছেন বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, ওমর শরীফের বাগানে রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রায় শতাধিক গাছ। রয়েছে বর্তমান বিশ্বের দামি মিয়াজাকি (সূর্যডিম) কিউজাই, ব্যানানা ম্যাংগো, ইন্দোনেশিয়ান ব্রুনাই কিং, কিং অফ চাকাপাত, আলফেনসো, আলফানচুন, থাই ব্যানানা আম গাছ।

এলাচ গাছ ছাড়াও রয়েছে দারচিনি, লবজ্ঞ, এভাকাডো, পুলসান, রাম্বুটান, আপেল, তেঁতুল, থাই সপদা, চেনাক ফ্রুট, থাই বেরিকেডেট মাল্টা, বারমাসি মাল্টা, চাইনিজ কমলা, দার্জিলিং কমলা, চায়না ৩ লিচু, লটকন, ভিয়েতনাম নারিকেল।

অগামী কিছুদিন পর তিনি এভাকাডো, রাম্বুটান, পুলসান, ডুরিয়া, ম্যাগোইস্টান এর চারারও সরহরাহ করার মনস্থির করেছেন।

এলাচ নিয়ে এখন অনেক জ্ঞান রাখেন ওমর শরীফ। জানালেন, দু’রকমের এলাচ ফলে- বড় ও ছোট। বড় এলাচ এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের শীত প্রধান অঞ্চলে প্রচুর জন্মায়।

বড় এলাচের ৫০ প্রজাতির মধ্যে এ উপমহাদেশে বহু আগে থেকে বেশ কয়েকটির ফলন হয়। তবে চট্টগ্রামে এই সবুজ রঙের ছোট এলাচের চাষ ওমর শরীফই প্রথম শুরু করেছেন।

তিনি জানান, আষাঢ় মাসে ফুল আসে এলাচ গাছে। আর ভাদ্র ও আশ্বিন মাসের শেষদিকে এলাচ পরিপক্ক হয়। তখন বাগান থেকে কাঁচা এলাচ সংগ্রহ করে রোদে শুকাতে হয়।

বেশি উৎপাদন হলে ড্রায়ার মেশিনে শুকাতে হয়। না শুকিয়ে ঘরে রাখলে পচন ধরবে। ফল পরিপক্ক হলে দেখতে কিছুটা সবুজের উপর লালচে হবে। চারা লাগানো থেকে ফল পেতে তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়।

বিভিন্ন জাতের এলাচের মধ্যে সবুজ-কালো, নিল-সাদা ও বেগুনীসহ ১৩ জাতের এলাচ আমদানি করা হয় বাংলাদেশে।

দেশে এলাচ চাষ নতুন নয়। সিলেট, বগুড়া ,সাতক্ষীরা, তিন পার্বত্য জেলাসহ বেশ কয়েক অঞ্চলে যে এলাচ জন্মে। তবে সেগুলো তার নাম মোরঙ্গ এলাচ।

কিন্তু সবুজ দানার এলাচ চাষ এটাই প্রথম। নিজের সাফল্যের পর কৃষকদের মাঝে এলাচের চাষ ছড়িয়ে দিতে জোহরা এগ্রো ফার্মস ও নার্সারীতে এখন চারা উৎপাদনেও মন দিয়েছেন ওমর শরীফ। যেখানে এবার প্রায় ১০ হাজার এলাচ চারা গজানো হবে।

বাণিজ্যিকভাবে এলাচ চাষে আগ্রহীরা এই বছর আমার কাছ থেকে চারা কিনতে পারবেন। চারা বড় হলে আগ্রহী চাষিদের কাছে বিক্রি করতে পারবো। তাতে অদূর ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে আর এলাচ আমদানি করতে হবে না, বলছিলেন এই কৃষি উদ্যোক্তা।

তার স্বপ্ন সেখানেই থেমে নেই। বলছিলেন, “দেশের মাটিতে উৎপাদিত এলাচ নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করা হবে বিদেশেও। এতে সরকার পাবে বৈদেশিক মুদ্রা। আর সরকার যদি বাণিজ্যিকভাবে এলাচ চাষে আগ্রহীদের আর্থিক সহযোগিতা করে তাহলে খুব অল্প সময়েই এ স্বপ্নপূরণ সম্ভব।

ভারত, চীন ও মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের উর্বর জমি এলাচ চাষের উপযোগী। এলাচ চাষে আলাদা কোনো জমি প্রয়োজন হয় না।

ওমর শরীফ বলেন, পাঁচ বছরের পরিশ্রমে আমি দেখেছি, অন্য গাছের ছায়া তলে এলাচের ভালো ফলন হয়। তাই আমি মিশ্রফলের বাগানে এলাচ চাষ শুরু করেছি। যে কেউ বাড়ির আঙ্গিনা অথবা ফলদ বৃক্ষের বাগানে এ জাতের সবুজ সুগ্রানি মসলা এলাচের চাষ করতে পারবে।