এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন বাজারে অবস্থিত বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরী হচ্ছে খাদ্যপণ্য। অধিকাংশ বেকারির নেই ট্রেড লাইসেন্স, বিএসটিআই, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ, স্যানিটারি ও ট্রেডমার্ক ছাড়পত্র। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে বেকারিগুলো।

মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বেকারিগুলোতে প্রশাসনের অভিযান হয় বিধায় এখন উপজেলার প্রত্যন্ত বাজারে বেকারি স্থাপন করছে অসাধু কারবারিরা। এসব বেকারিতে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন হাটবাজারে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নি¤œমানের উপকরণে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য খেয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

# বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
# বিক্রি হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে
# অধিকাংশ বেকারির নেই কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স

মিরসরাই উপজেলা স্যানিটারি ও নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক শংকর প্রসাদ বিশ্বাস বলেন, উপজেলায় ২০টি বেকারি রয়েছে। এর মধ্যে ৯ টিতে খাদ্য তৈরি হয় ওভেনে। বাকি ১১টিতে তৈরি হয় হাতে। এসব বেকারির পণ্য উপজেলার ৪৫টি বাজারের অন্তত পৌনে চৌদ্দ শ’ প্রতিষ্ঠান ও ২৪টি হোটেল-রেস্তোরাঁয় যাচ্ছে। গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে অন্তত ৫০ জনকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। একটি বেকারি চালুর আগে ট্রেড লাইসেন্স, বিএসটিআই, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ, স্যানিটারি ও ট্রেডমার্ক ছাড়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক। তবে উপজেলার বেকারিগুলোর অধিকাংশই এই নিয়মের তোয়াক্কা করছে না বলে জানান তিনি।

উপজেলার করেরহাট বাজারে রয়েছে সুরভি বেকারি, আজমীর বেকারি, বাদামতলী ঢাকা বেকারি। এ ছাড়া জোরারগঞ্জ বাজারে বার আউলিয়া বেকারি, ঠাকুরদিঘি বাজারে শুভপুর বেকারি, বামুন সুন্দর দারোগার হাটে আলাউদ্দিন বেকারি, আল্লার দান বেকারি, সুফিয়া রোডে নিউ মদিনা ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট, নিউ সেফ ফুড, নিউ মক্কা, নিউ মুরাদ বেকারি, বারইয়ারহাটে বিসমিল্লাহ বেকারি, আবুতোরাব বাজারে রাহাত ফুড প্রোডাক্টস, বিষু মিয়ার হাটে মাহি বেকারি, কমর আলী বাজারে ইসপা বেকারি, মিরসরাই নিউ ঢাকা বেকারি, দারোগারহাটে রাজ বেকারি, মিরসরাই বাজারে আল আমিন, নিউ ঢাকা ফুড, নিউ মক্কা, মুরাদ বেকারিগুলোর চিত্র একই রকম। রাহাত ফুড প্রোডাক্টস, ঢাকা বেকারি, শুভপুর বেকারি, আল আমিন বেকারিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, ব্যবসা পরিচালনার জন্য তাদের কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেই।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন বেকারি পরিদর্শন করে দেখা যায়, বেশির ভাগ কারখানায় কর্মচারীরা হাতে গ্লাভস ছাড়াই দু হাতে ময়দা পিষছেন। জুতা পায়ে দিয়েই ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন রকমের পণ্য সাজিয়ে রাখছেন। অনেককে খালি গায়ে আটা-ময়দার স্তুপে দাঁড়িয়ে পায়ে ময়দা মাখাতে দেখা যায়। কেউ আবার ময়দার খামির মেশিনে শুকাচ্ছেন। এঁদের অধিকাংশই ছিলেন খালি গায়ে। কারও শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। কেউ এক হাতে বিড়ি-সিগারেট ফুঁকছেন, অন্য হাত দিয়ে কাজ করছেন। খোলা তেলভর্তি ড্রামের ওপর দেখা যায়, মাছি ভনভন করছে। যত্রতত্র ইঁদুর ও তেলাপোকার বিষ্ঠা ছড়িয়ে থাকতেও দেখা যায়। খোলা পরিবেশে পণ্য তৈরির সময় উড়ে এসে ধুলো-বালি পড়ছে। অধিকাংশ বেকারির ফ্লোর পাকা করা নেই। এসব বেকারির পণ্যই বাহারি মোড়কে মুড়িয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। কারখানায় তৈরি বিস্কুট, পাউরুটি, কেক, মিষ্টির মতো খাবার এভাবেই চলে যাচ্ছে ভোক্তার নিকট।

জানা গেছে, বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যগুলো উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারের চায়ের দোকান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যান্টিন, কনফেকশনারির দোকানে বিক্রি করা হয়। ব্র্যান্ডের তৈরী পণ্যের চেয়ে কমিশন বেশী পাওয়ায় নিম্নমানের তৈরী বেকারি খাদ্যপণ্য দেদারসে বিক্রি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। পণ্যের প্যাকেটে বিএসটি আই সীল ও লাইসেন্স নং দেওয়া থাকলেও তার কোন ডকুমেন্ট নেই অধিকাংশ বেকারির। ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে চলছে খাদ্যপণ্য বিক্রি।

আবুতোরাব বাজারের রাহাত ফুড প্রোডাক্টসের মালিক আবুল বশর বলেন, আমি বেকারি দিয়েছি মাত্র তিন বছর হয়েছে। শুধু ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স আছে। অন্য কোন লাইসেন্স নেই। বেকারির মাল কম চলে; তাই লাইসেন্স নিচ্ছি না। সামনে নেবো।

মিরসরাই বাজারের আল আমিন বেকারির স্বত্বাধিকারী মো. ইউসুফ বলেন, বর্তমানে চিনি, ময়দার দাম ও শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশি। স্কয়ার, প্রাণসহ বড় বড় কোম্পানিগুলোর কারণে গ্রামের ছোটখাটো উদ্যোক্তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মিরসরাই পৌরসভার ঢাকা বেকারির মালিক মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ব্যবসা শুরু করেছি ৬ মাস আগে। শিগগিরই অনুমোদনের জন্য আবেদন করব।’

উপজেলার বারইয়ারহাটের শেফা ইনসান হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এস এ ফারুক বলেন, ভেজাল কেমিক্যাল ও নি¤œমানের উপকরণ দিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করা এসব খাদ্য সামগ্রী খেলে যে কেউ জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। শিশুদের জন্য এসব খাবার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

বিএসটিআই চট্টগ্রামের ফিল্ড অফিসার আশিকুজ্জামান বলেন, ‘যেসব বেকারি শর্ত না মেনে পরিচালনা করছে শিগগির তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিনহাজুর রহমান বলেন, যে সব বেকারি যথাযথ নিয়ম মেনে চলবে না তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।