এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : ‘বিএলএফ ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে কম্পানী কমান্ডার নূর নবী চৌধুরীর নেতৃত্বে মারিশ্যা মডেল টাউন দখল করি আমরা। সেখানে একদিন ভারতের স্বাধীনতাকামী মিজোরাম প্রদেশের গেরিলাদের সাথে আমাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। যাতে তাদের অনেক লোক হতাহত হয়েছিল।’

মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসব কথা বলছিলেন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা কবির আহম্মেদ। ১৯৬৯’র গণঅভ্যত্থান থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সাথে অংশ নেন এ সাহসী যোদ্ধা। যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের উত্তর প্রদেশে একটি ট্রেনিং সেন্টারে প্রায় ৪৫দিন বিএলএফ এর মত উচ্চমান সম্পন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মুখযুদ্ধ অংশ নেন। মিরসরাই ছাড়াও তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ কিছু যুদ্ধে অংশ নেন।

১৯৬৭ সালে স্থানীয় জোরারগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন কবির আহম্মেদ। ১৯৬৮ সালে তিনি সীতাকুন্ড কলেজে ভর্তি হয়ে সেখানেও ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন। ১৯৭০ সালে ইন্টারমেডিয়েট পাশ করে ফেনী কলেজে বিএ ভর্তি হন। সেখানেও ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন। ১৯৬৯ এর গণ অভ্যত্থানে কবির আহম্মেদ স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম কমিটির জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন এলাকার সভাপতি হয়ে কৃষক, শ্রমিক, মজুর, ছাত্র জনতা ও সর্বস্তরের মানুষকে স্বাধীনতার পক্ষে উদ্বুদ্ধ করেন।

গণ-অভ্যত্থানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবির আ‏হম্মদ বলেন, ‘১৯৭১ এর ২ মার্চ আমাদের এলাকায় স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। ২০ মার্চ আমরা এলাকার সর্বত্র স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন ও বিতরণ শুরু করি। ২৫ মার্চ শেষ রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি আমাদের কাছে পৌঁছলে স্থানীয়ভাবে সড়ক ও রেল পথে প্রতিরোধ শুরু হয়। এখানে প্রথম দিকে পাকিস্তানী সাজোয়া বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে শুভপুর ব্রীজে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। সেখানে নেতৃত্ব দেন মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।’

মুক্তিযুদ্ধের শুরু দিকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাহসি এ যোদ্ধা বলেন, ‘১৯৭১ এর জুলাই মাসে আমরা বেশ কজন মিলে ভারতে যাই। সেখানে কয়েকদিন ইয়ুথ ক্যাম্পে থাকার পর হরিণা ক্যাম্পে আমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হওয়ার কথা। মুক্তিযুদ্ধের আগে ফেনী কলেজে যখন আমি পড়ছিলাম। তখন ইউএসটিসি নামক এক ধরণের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল আমাদের। যেখানে যুদ্ধের বিভিন্ন কলা-কৌশল শেখানো হয়েছিল। হরিণা ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা ক্যাপ্টেন আমার অস্ত্র চালানোর কৌশল পরখ করে দেখলেন এবং সন্তুষ্ট হলেন। পরে আমরা ২১ আগস্ট নায়েক শফিউল্যার নেতৃত্বে ১৭ জনের একটি এফএফ টিম দেশে প্রবেশ করে অবস্থান নিই মিরসরাইয়ের তেতৈয়া গ্রামে।’

গুরুত্বপূর্ণ সম্মুখযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবির আহম্মেদ বলেন, ‘১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে মিরসরাইয়ের আবুরহাট এলাকায় পাক আর্মি আক্রমণ করার কথা ছিল। খবর পেয়ে আমরা জোরারগঞ্জ-আবুরহাট সড়কের কমরী পুল এলাকায় অবস্থান নিই। পাক আর্মি আসতে না আসতেই আমরা তাদের ওপর হামলা চালাই। এসময় বেশ কয়েকজন পাকিস্তানী আর্মি মারা যায় অনেকে আহতন হয়। পরে অবশ্য আহদের তাদের জোরারগঞ্জ উইমেন কলেজে (বর্তমান জোরারগঞ্জ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার কলেজ) পাকিস্তানী দ্বিতীয় ব্রিগেড নামে একটি ক্যাম্পে নিয়ে চিকিৎসা দেয় তারা।’

এদিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্মুখযুদ্ধে সফল হওয়ার পর কবির আহম্মদের ডাক পড়ে আবার ভারতে। সেখানে তাকে যুদ্ধের রিপোর্ট করতে বলা হয়। এ সম্পর্কে কবির আহম্মদ বলেন, ‘আবুরহাট সড়কের সম্মুখ যুদ্ধের রিপোর্ট দেয়ার জন্য এবং আরও অস্ত্র আনার জন্য ১৯৭১ সালের ২ অক্টোবর তারিখে আমাকে পুনরায় ভারতে পাঠানো হয়। সেখানে গেলে আমাকে উচ্চমান ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রেনিং করতে আগরতলা পাঠানো হয়। আগরতলা থেকে একটি কার্গো বিমানে আমাদের বেশ কজনকে ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখানে আমার সাথে মহিউদ্দিন রাশেদ, এটিএম ঈসমাইল, আব্দুল হাই চৌধুরী, ফয়েজ আহম্মদ নিজামী, রাখাল চন্দ্র বনিক, বেলায়েত হোসেন চৌধুরী, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, নূর নবী চৌধুরী, ফেরদৌস ভারী চৌধুরী প্রকাশ মিহির চৌধুরী ও কবির চৌধুরীর মত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের দেখা হয়। সেখানে আমরা ৪৫ দিন বিএলএফ ট্রেনিং শেষে ভারতের দেমাগ্রী পাহাড় হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করি।’

বিএলএফ ট্রেনিং নেয়ার পর সাহসী ও যুদ্ধে পারদর্শী কবির আহম্মদের এবার দায়িত্ব পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সেখানে কোম্পানী কমান্ডার ছাত্রলীগ নেতা নূর নবী চৌধুরী ও ভারতীয় আর্মির নেতৃত্বে মারিশ্যা মডেল টাউন দখল যুদ্ধে তিনি অংশ নেন। কবির আহম্মদ বলেন, ‘মারিশ্যা মডেল টাউন দখলের পর আমরা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে যাই। এখান থেকে একটি গ্রæপকে দায়িত্ব দেয়া হয় চট্টগ্রামের বোয়ালখালী ও খাগড়াছড়ির দিঘীনালা এলাকায়।’

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় পাকিস্তানী আর্মির সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেয় ভারতের স্বাধীনতাকামী মিজোরাম প্রদেশের লোকজন। নিজের স্মৃতিচারণে এমন তথ্য দেন মুক্তিযোদ্ধা কবির আহম্মদ। তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বর মাসের ১০ তারিখে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের মারিশ্যা মডেল টাউনের পাশের একটি পাহাড়ে অবস্থান করছিলাম। এসময় মিজোরাম প্রদেশের ৪০/৫০ জন গেরিলা আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরাও পাল্টা হামলা চালালে সম্ভবত তাদের অনেকেই নিহত হয়।’

নিজের এলাকা মিরসরাই ৮ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হলেও পাহাড়ী জনপদে সম্মুখযুদ্ধে লড়তে গিয়ে কবির আহম্মদ কিছুই জানতেন না। বরং তিনি রামগড় হয়ে এলাকায় ফিরেন ১২ ডিসেম্বর। ফিরে দেখেন নিজের এলাকা মিরসরাই ততক্ষণে স্বাধীন হয়ে গেছে। কবির আহম্মদ বলেন, ‘পাহাড়ী এলাকা হওয়াতে আমরা হানাদার মুক্ত হওয়ার বিষয়টি জানতাম না। পরে ১২ ডিসেম্বর কিছু পথ পায়ে হেটে, কিছু পথ টেক্সিতে আবার কিছু পথ ট্রাকে ছড়ে এলাকায় ফিরে আসি। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসলে ২০ জানুয়ারি আমরা মিরসরাই থানায় যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র জমা দি।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা কবির আহম্মদ ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর মিরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের হাজীশ্বরাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মৃত আলহাজ্ব নূর আহম্মদ ও মা মৃত রৈয়েছের নেছা। ৭ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে কবির আহম্মদ পঞ্চম। কবির আহম্মদের স্ত্রী রেহানা আক্তার মারা যান ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল। দুই কন্যা ও দুই পুত্র সন্তানের জনক তিনি। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তিনি ১৮৮৪ সালে মিরসরাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে তিনি উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে জয়লাভ করেও তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ নিতে পারেন নি। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে তিনি ১৯৯৭ সালে উক্ত পরিষদের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ২০০১ সালে বিএনপি জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর তিনি নিজের ইচ্ছায় চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি নেন। ২০১০ সালে পুনরায় তিনি মিরসরাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার পদে নির্বাচন করে নির্বাচিত হন। অধ্যবদি তিনি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কবির আহম্মদ, মুক্তিবার্তা নম্বর-০২০৩০৪০৪৪৪ , গেজেট নম্বর-৫৪৪২।