মিজানুর রহমান মিজান, রংপুর অফিস : রংপুর মেট্রোপলিটন হারাগাছ থানার নিহত এএসআই পেয়ারুল ইসলামের খুনি পলাশ ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছে মাদকের সাথে। মাদকাসক্ত ছিলেন তার বাবা জাহিদুল, ফুফা মোফাজ্জল হোসেন। মাদক ও চুরির মামলায় দুইবার জেল খেটেছে তার ফুফাতো ভাই ও একই এলাকার মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে সুমন।

মঙ্গলবার (২৮, সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, মাদকের বৃত্তেই ছিল পুলিশ খুনি পলাশের বসবাস। শুধু তাই নয় চাচা নুর হোসেন, চাচা শ্বশুর আজিজুল ও একই এলাকায় বসবাসরত নুর হোসেনের স্ত্রীর মামাতো ভাই মফিজুল অন্য পেশার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে মাদকদ্রব্য পাচার করে আসছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছাকাছি থেকে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা চালালেও প্রশাসনের কাছে অধরা এই দলটি।

জানা যায়, ১৯৯৭ সালের দিকে মফিজুলকে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা থেকে রংপুরে তার ফুফা মরহুম লুৎফর রহমান নিয়ে আসেন এবং তারই ভিটায় বাড়ি করে দেন। রংপুরের তৎকালীন পৌরবাজারে ফজলু স্টোরে কাজ করতেন মফিজুল মিয়া। অল্পদিনেই অতিরিক্ত লোভে চুরি করতে থাকে। এমনকি চুরির কারণে পৌরবাজারে বেঁধে রাখেন ব্যবসায়ী ফজলু। পরে ১০ হাজার টাকা মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন তার ফুফা লুৎফর রহমান। এরপর থেকেই সে কি ব্যবসা করে কেউ জানে না।

মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর আগে হঠাৎ করে আলাউদ্দিনের চেরাগ পায়, মফিজুল, আজিজুল আর তার জামাই নুর হোসেন। পেশার ব্যাপারে এলাকাবাসীর কিছু জানা না থাকলেও তাদের অঢেল ধনসম্পদ যেন বিস্মিত করছে সবাইকে। হঠাৎ করে তাদের এমন অবস্থা যেন আঙুল ফুলে কলাগাছ হবার মতই।

একাধিক এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদক পাচারের সাথে জড়িত মফিজুল মাদক ব্যবসার কল্যাণেই সহায়সম্বলহীন নিঃস্ব অবস্থা থেকে হঠাৎ করেই ধনী হয়েছেন। আর তার ফুফা আজিজুলের বাড়ি পাটগ্রামের পানবাড়ি হওয়ায় বর্ডার দিয়ে মাদকদ্রব্য পাচার করে মফিজুল ও নুর হোসেনের মাধ্যমে বিরাট এক মাদক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তারা।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে একজন জানান, এক সময় এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হয় মফিজুল সাপের মনি পেয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পরই সে চুরি করতে গিয়ে দোকান মালিক তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। সে স্থানীয় না হওয়ায় তার ব্যাপারে আমরা নাক গলাই না। কিন্তু যাদের সামান্য সামর্থ্য নেই তাদের হঠাৎ করে বড়লোক হওয়া সন্দেহের জন্ম দেয়। ভারত থেকে শুধু পণ্যদ্রব্য নয়, এর আড়ালে মাদক পাচারের মাধ্যমে খুব অল্পসময়ে ধনী হয়ে উঠছে মফিজুল, আজিজুল ও তার জামাতা নুর হোসেন। এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের জরুরি ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ।

তেলীপাড়া এলাকার শাহজাহান হোসেন ঝন্নু বলেন, এলাকায় প্রত্যেকে কে কি করে আমরা বলতে পারি। কিন্তু মফিজুল কি করে আমরা জানিনা। কিছুদিন আগে শুনেছি সে ভারত থেকে মালামাল নিয়ে আসে কিন্তু কোনদিন দেখিনি। সে যদি ভারত থেকে পন্যদব্য আনতো তাহলে তো সেটা দেখা যেতো। কিন্তু তার দোকান পাট বা ব্যবসা কেন্দ্র কিছুই আমরা জানিনা।

একই এলাকার ফিরোজ হোসেন বলেন, অনেকেই ভারতীয় পন্য এনে ব্যবসা করে, কিন্তু এদের মতো হঠাৎ ফুলে ওঠে না। মফিজুলদের পৈতৃক কোন সম্পত্তি ছিল না। মফিজুলের ফুপা আজিজুল মিয়ার বাড়ি পাটগ্রামের পানবাড়ি এলাকায়। আগে সে সাড়াদিন জুয়া খেলতো। ২০০৪ সালের দিকে চাঁদা তুলে বড় মেয়ে পারভিনের বিয়ে দেয় পলাশের চাচা নুর হোসেনের সাথে। সেই আজিজুল, তার জামাতা নুর হোসেন আর মফিজুল আজ তাদের লাখ লাখ টাকা, তাড়া এখন লাখপতি। তাদের চলন বলন প্রশ্নবাণ। আজিজুল মানুষকে দেখায় সে ধান ব্যবসায়ী কিন্তু ব্যবসার আড়ালে ভাতিজা ও জামাইয়ের সাহায্যে গোপনে অবৈধ মাদক ব্যাবসা চালাচ্ছে তাড়া।

এলাকার অনেকে নাম না বলার শর্তে বলেন, হঠাৎ কড়ে এতো টাকা কোথায় তাড়া পেলেন। অবৈধ মাদক ব্যাবসা ছাড়া এতো টাকা, এতো সম্পদ কি কড়ে করতে পাড়ে। এলাকাবাসির দাবি তাদেরকেও যেন আইনের আওতায় এনে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যাবস্থা নেয়া হয়।

উল্লেখ্য, রংপুরে মাদকসেবীর ছুরিকাঘাতে পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) পিয়ারুল ইসলামের নিহতের ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে পলাশ নামের এক মাদক কারবারীকে। রংপুর মেট্রোপলিটন হারাগাছের বাহার কাছনা সাহেবগঞ্জ এলাকায় শুক্রবার রাত সাড়ে এগারোটার দিকে এএসআই পিয়ারুল ইসলামের ওপর মাদক কারবারী পলাশের ছুড়িকাঘাতে গুরুতর আহত হয়েও মাদকাসক্ত পলাশকে ছাড়েননি এএসআই পেয়ারুল। পরে অন্য সহকর্মী পুলিশ সাপর্টে গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় পেয়ারুলকে রমেক হাসপাতালে  অপারেশন করান। কিন্তু ঘাতক পলাশের ছুরিকাঘাত এতটা গভীর ছিল যে, তার লাঞ্চ কেটে যাওয়ায় রক্তক্ষরণ বেশি হয়। অপারেশন করার পরেও এএসআই পেয়ারুলকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আই সি ইউতে চিকিৎসকরা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার সকাল ১১টা ১৭মিনিটে তিনি মারা যন।