উখিয়া বাজারে সবজির পসরা নিয়ে বসেছেন বয়োবৃদ্ধ গুরা মিয়া। ছবি: হুমায়ুন কবির জুশান

হুমায়ুন কবির জুশান, কক্সবাজার : বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়লেও এখনো তার নাম গুরা মিয়া। কারো কাছ থেকে চেয়ে নয়, পরিশ্রম করে খেতে চায় সে। ভারি কোন কাজ করতে পারেন না। তাই গ্রামের বউ-ঝি ও পাড়া-পড়শি থেকে শাক-সবজি (তরি-তরকারি) ক্রয় করে তা উখিয়া বাজারে এনে বিক্রি করেন। বছর শেষে বয়স্ক ভাতার তিন হাজার টাকায় (৩০০০) অল্প পুজিঁতে ব্যবসা শুরু করেন।

স্ত্রী হারা বৃদ্ধ গুরা মিয়ার জীবন চলে অভাব-অনটনে। বাজারে তার কোন দোকান নেই। অন্য দোকানের সামনে বসে সামান্য তরি-তরকারি বিক্রি করতে অনেক সময় তাকে সারাদিন বসে থাকতে হয়। ক্রেতারা দামাদামি করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্রেতা বলেন, আমি বাজারে আসলে এই বৃদ্ধ লোকটিকে খুঁজি। তার থেকে তরি-তরকারি কিনে নিই। কোনদিন দামাদামি করি না। সে যে দাম বলবে সেই দামেই আমি ক্রয় করে থাকি। অনেককে দেখি দামাদামি করে না কিনে চলে যেতে। এই বৃদ্ধ মানুষটির কাছ থেকে ক্রয় করলে আমি মনে করি তাকে সহযোগিতা করা হয়ে থাকে। খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষের খবর কেউ রাখে না।

সানজিদা নামের এক এনজিওকর্মী বলেন, আমি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিওতে চাকরি করি। থাকি উখিয়া সদরে ভাড়া বাসায়। বাজার করতে আসলেই আমি এই বৃদ্ধ লোক থেকেই তরি-তরকারি কিনে নিয়ে যাই। তার শাক-সবজি থাকে সব সময় টাটকা। গ্রামীণ ক্ষেত থেকে তুলে আনা সবজি। তিনি প্রতিদিন অল্প অল্প শাক-সবজি নিয়ে বসেন। খুব কম কথা বলেন।

এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় বৃদ্ধ সবজি বিক্রেতা গুরা মিয়ার। তিনি জানান, ভিক্ষা নয়, আমি হালাল উপায়ে ব্যবসা করে চলতে চাই। সরকার আমাকে বয়স্ক ভাতা দেয়। আমি বছর শেষে বয়স্ক ভাতার তিন হাজার (৩০০০) টাকা দিয়ে শাক-সবজির ব্যবসা শুরু করি।

গুরা মিয়া বলেন, আমার ছয় সন্তানের মধ্যে চার ছেলে তাদের মা থাকতেই আলাদা হয়ে যায়। ছেলেরা তাদের যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। এরাও গরিব। তাই তারা আমাকে সহযোগিতা করতে পারে না। আমি তাদের জন্যে দোয়া করি। আমার স্ত্রীও নেই। জীবন সঙ্গি হিসেবে আর কাউকে স্থান দিতে পারিনি। আমি একা। আমি কারো বুঝা হয়ে থাকতে চাই না। যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন কর্ম করে সৎভাবে থাকতে চাই।

তিনি বলেন, বয়স্ক ভাতার অল্প পুঁজিতে গ্রামীণ শাক-সবজি বউ-ঝিদের কাছ থেকে ক্রয় করে বাজারে এনে বিক্রি করি। প্রতিদিন দুই একশ টাকা লাভ হয়। তা দিয়ে আমার ওষুধ খরচ ও সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয়। এর পরও থেমে নেই একা জীবন-সংসার।

সমাজকর্মী রেজাউল করিম বলেন, এই বয়সে অনেকে বিনা পুঁজিতে ভিক্ষা করে জীবন চালায়। কিন্তু তিনি ভিক্ষা না করে হালাল উপায়ে ব্যবসা করে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে চান। মানুষ ভিক্ষুককে দশ-পাঁচ টাকা দান করে থাকেন। অথচ এই বৃদ্ধ সবজি বিক্রেতার কাছ থেকে দামাদামি করে দশ-পাঁচ টাকা কম দিতে চেষ্টা করেন।

স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন কেন্দ্রীয় ফেমাস সংসদের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, আমরা নামি-দামি হোটেলে খেতে যািই। খেয়ে হোটেল বয়কে বিশ-পঞ্চাশ টাকা দিয়ে দিই। অসহায় এসব মানুষের কথা চিন্তা করি না। আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবিক হওয়া দরকার। এবং প্রত্যেক সন্তানের উচিত তাদের মা-বাবার প্রতি যত্নশীল হওয়া। স্বেচ্ছাসেবি সংগঠনের পক্ষ থেকেও অসহায় মানুষের পাশে এগিয়ে আসা উচিত বলে আমি মনে করি। বৃদ্ধরা বুঝা নয় তারা আমাদের দেশের সম্মানিত সিনিয়র নাগরিক।