খোলাবার্তা২৪ ডেস্ক : ভারতীয় টিভি সিরিয়াল মানেই কিছু খলনায়িকা ও কূটচরিত্র থাকবেই। আর টিভি ধারাবাহিকের খল চরিত্র ও কুটিলতা সমাজে নেতিবাচক বার্তা দেয়, এমন ভাবনায় ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এ ধরনের বিষয়বস্তুতে নিয়ন্ত্রণ আনতে চায়৷ তবে এই হস্তক্ষেপের প্রশ্নে শুরু হয়েছে বিতর্ক৷

সন্ধ্যা হলেই নারী ও তাদের জীবনকেন্দ্রিক বিষয়বস্তু নিয়ে ভারতের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর পর্দায় হাজির হয় জনপ্রিয় ধারাবাহিকগুলো৷ ভারত ছাড়িয়ে সেগুলোর বিপুল দর্শক রয়েছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরেও৷

এসব সিরিয়ালের নেতিবাচক বা খলনায়িকা চরিত্রগুলোও থাকে দর্শক আগ্রহের কেন্দ্রে৷ কিন্তু ধারাবাহিকগুলোর কুটিল দৃশ্য ও নেতিবাচক চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের কাছে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে বলে মনে করছে কেন্দ্র৷ তাই ১৯৯৪ সালের কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক বিধিতে বদল আসতে চলেছে৷ এজন্য কেন্দ্রীয় সরকারের আন্ডার সেক্রেটারি সোনিকা খাট্টার নোটিস জারি করেছেন বলে খবর প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে৷ কিন্তু এ নিয়ে বিতর্কও শুরু হয়েছে৷

এই মুহূর্তে ‘খড়কুটো’, ‘দেশের মাটি’, ‘শ্রীময়ী’ ভারতীয় বাংলা চ্যানেলগুলোতে চলা জনপ্রিয় ধারাবাহিক৷ শ্রীময়ী সিরিয়ালের ‘জুন আন্টি’ খলনায়িকা রূপে আলাদা খ্যাতি কুড়িয়েছেন৷

এই ধারাবাহিকের লেখক, পরিচালক লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘টেলিভিশনই শুধু কূটকচালি করে এমনটা নয়, জীবনেও সেটা থাকে৷ আবার ভাল চরিত্রও থাকে, যা আমাদের উৎসাহিত করে৷’’

সফল চিত্রনাট্যকার হিসেবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘‘সাহিত্যে এ ধরনের চরিত্রের দেখা কি মেলে না? জীবনের দর্পণ হিসেবে সাহিত্যে যদি এ সব থাকতে পারে, তা হলে টেলিভিশনে নয় কেন? কূটকচালি কি জীবনে ঘটে না? জীবনের একটা দিক বাদ দিয়ে চিত্রনাট্যে পূর্ণতা আসবে?’’ দর্শক স্বাধীনতার উপর গুরুত্ব দিয়ে তার বক্তব্য, ‘‘পরিণত দর্শকের বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা আছে৷ তবে নির্দিষ্ট বিধি যদি কার্যকর হয়, তার বিরুদ্ধে আমরা কথা বলতে পারি না৷’’

তবে কেন্দ্রীয় সরকারের এই পরিকল্পনা সামনে আসার পর তাকে সাধুবাদ দিয়েছেন নেটিজেনদের একটা বড় অংশ৷ তাদের মতে, অনেকদিন আগেই এ ধরনের আপত্তিকর বিষয় বাদ দেওয়া উচিত ছিল৷ এতে পারিবারিক সম্পর্কে প্রভাব পড়ছে৷ কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক রুল মানতে হয় ৯০০র বেশি টিভি চ্যানেলকে৷ কেবল টেলিভিশনের বিধিতে, ২০২১ এর সংশোধনীতে কনটেন্ট সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরো দৃঢ় করা হয়েছে৷ ত্রি স্তরীয় ব্যবস্থায় অভিযোগ জানানো যাবে৷ এর শেষ ধাপে থাকছে কেন্দ্রের কাছে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও৷

যদিও মনোবিদরা নয়া বিধির মধ্যে যুক্তি দেখছেন না৷ মনোবিদ ডা. কামাল হোসেনের মতে, ‘‘খলনায়ক-নায়িকাদের দেখে বাস্তব জীবনেও ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটবে, এটা খুব বালখিল্য ধারণা৷ অতীতে শেক্সপিয়রের আমল থেকেই তো খল চরিত্র আছে৷ বরং টেলিভিশনে যে অপরাধ, হিংসার দৃশ্য দেখানো হয়, তা মানুষের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলে৷ সেগুলি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত৷ খলনায়িকাকে বাদ দিলেই যে পৃথিবী স্বর্গোদ্যান হয়ে যাবে, এমন ভাবা শিশুসুলভ৷’’

কারো কোনো বিষয় পছন্দ না হলে তা বর্জনের অধিকার আছে৷ কিন্তু সেজন্য কি গোটা বিষয়বস্তু বাদ দেয়া যুক্তিসঙ্গত? এখানেই স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে সামনে আনছেন সমাজবিজ্ঞানীরা৷ প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সুহৃতা সাহা বলেন, ‘‘ডোমেস্টিক স্পেসও ক্ষমতা আর রাজনীতির বাইরে নয়৷ খলনায়িকা এর কানে, ওর কানে বিষ দিচ্ছে, এটা বাস্তবের ছবি৷ তবে গল্পের জন্য কিছুটা রং চড়িয়ে দেখানো হয়৷ এগুলির টিআরপি যদি ভালো থাকে, তার মানে দর্শক আছে৷ জোর করে খলনায়িকাদের কণ্ঠরোধ করে পরিবারগুলির সমস্যা মিটে যাবে, এটা ভাবা ঠিক নয়৷’’

রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুহৃতা৷ তিনি বলেন, ‘‘মানুষকে শিশু ভাবলে চলবে না৷ জনতার রুচি নির্ধারণ করে দেবে রাষ্ট্র, এটা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়৷ টেলিভিশনের অনেক কনটেন্ট সমর্থনযোগ্য নয়৷ সেটা মানুষ বিচার করবে৷ কিন্তু জোর করে বন্ধ করে দেয়া মানে এডাল্ট দর্শককে শিশু ভাবা৷’’

কিন্তু রাষ্ট্রেরও কি ভূমিকা নেই জনরুচি গঠনে? যা নেতিবাচক, তাতে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে সমস্যা কোথায়? দর্শকদের একটা বড় অংশ এই যুক্তি দিচ্ছেন৷ যদিও চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষকরা নিয়ন্ত্রণের পক্ষপাতী নন৷

অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এই বিধি মানলে রামায়ণ থেকে মন্থরা, মহাভারত থেকে শকুনি বাদ দিতে হবে৷ কিন্তু এ সব তো মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, বাদ দেয়া যাবে কীভাবে? বাস্তব বুদ্ধিরহিত হয়ে এ রকম নির্দেশ চলচ্চিত্রেও জারি হয়েছে৷ এখন টিভি সিরিয়ালের ক্ষেত্রে করা হচ্ছে৷ ভবিষ্যতে ওয়েব সিরিজে করবে৷ শিল্প, সাহিত্যে হস্তক্ষেপ না করে সরকারের নিজের সংবিধান নির্দিষ্ট কাজ মন দিয়ে করা উচিত৷’’