এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : বিশ্বের বিনিয়োগ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। আরো অনেক দেশ আগ্রহ প্রকাশ করছে। এ জন্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর (বিএসএমএসএন) কে একটি আন্তর্জাতিক মানের সবুজ স্মার্ট শিল্প নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে যাতে বিনিয়োাগকারীরা পরিবেশের ভারসাম্য রজায় রেখে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।

বেজা নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুণ জানান, এ লক্ষ্যে বিশ্ব ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় সামগ্রিকভাবে আনুমানিক ৪,৩৪৭.২১ কোটি টাকা ব্যয়ে বিএসএমএসএন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হচ্ছে।

তিনি বলেন, আসন্ন স্মার্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি বিএসএমএসএন বিপুল পরিমাণ দেশি -বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ কোর মাধ্যমে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে। বিএসএমএসএনকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্মার্ট শিল্প নগরীতে রূপান্তরিত করতে বেজা সমুদ্রবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুকেন্দ্র, মেরিন ড্রাইভ এবং আবাসিক এলাকা, পর্যটন পার্ক, হাসপাতাল, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সামাজিক অবকাঠামোর সমন্বয়ে একটি ‘স্মার্ট সিটি’ নির্মাণের জন্য একটি বিশদ মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেছে। মাস্টার প্ল্যানের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো যাতে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হয় এবং জনসেবাগুলো ইন্টারেক্টিভ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল হয় তা নিশ্চিত করা।

বেজা প্রধান বলেন, সরকার বিএসএমএসএনকে সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরিণত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, দ্রুত শিল্পায়ন এবং পণ্যেও বৈচিত্র নিশ্চিত করা, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করা এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা।

তিনি বলেন, বেজা এই প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে, যাতে টেকসই বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয় এবং শিল্প জমির জন্য একটি গতিশীল স্থানীয় বাজার তৈরি হয়।

শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, এই বিশাল প্রকল্পটি মিরসরাইয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে যেখানে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তিনি জানান, প্রকল্পটির লক্ষ্য মূলত বিএসএমএসএন-এর জোন ২ এ এবং জোন ২ বি-সহ বিভিন্ন জোনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং এইভাবে সেখানে বেসরকারি বিনিয়োাগ বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।

জানা গেছে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ১৫ বছরের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, পত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিবছর অতিরিক্ত ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় প্রত্যাশা নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

মিরসরাই, সীতাকুন্ড ও ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। ইতোমধ্যে ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এখানে নিশ্চিত হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে জাপানের নিপ্পন, ভারতের এশিয়ান পেইন্টস, যুক্তরাজ্যের বার্জার পেইন্টস, সিঙ্গাপুরের উইলমারসহ আরো অনেকে এবং দেশী স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে পিএইচপি, বসুন্ধরা গ্রুপ, টি কে গ্রুপ ছাড়াও আরো নানা বিনিয়োগকারী।

এ শিল্পনগরে ইতোমধ্যে সরকারী বিভিন্ন সংস্থার সাথে বেজার সুসমন্বয়ের ফলে নির্মিত হয়েছে শেখ হাসিনা সরণি, দেশের সর্বপ্রথম সুপারডাইক, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গ্যাস সংযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ। এ শিল্পনগরে বর্তমান ১৩টি শিল্প নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে আরও ১৫টি প্রতিষ্ঠান শিল্প নির্মাণের অংশ হিসেবে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। জুলাই মাস নাগাদ কমপক্ষে দুটি শিল্প কারখানা উৎপাদনে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ শিল্পনগরে মাধ্যমে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরে (মিরসরাই, ফেনী এবং সীতাকুন্ড অর্থনৈতিক অঞ্চল) ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড বাংলাদেশে তাদের তৃতীয় ফ্যাক্টরি স্থাপন করতে যাচ্ছে। এখানে প্রায় ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ৫০০লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ কারখানায় মূলত প্রসাধন সামগ্রী এবং পিইটি বোতল প্রস্তুত হবে।

এছাড়া, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নারীদের কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বেজা চেয়ারম্যান জানান, প্রকল্পের অধীনে বেজা বিএসএমএসএন-এর অভ্যন্তরে একটি ৩০ কিলোমিটার সড়কের পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যেমন একটি সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্টন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ডি¯্রালিনেশন প্ল্যান্ট, সৌর জ্বালানি ব্যবস্থা, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, বর্জ্য বাছাই সুবিধা এবং ছাদ ও ভাসমান সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে।

এছাড়া প্রয়োজনীয় ভূমি উন্নয়ন, প্রয়োাজনীয় সাইট আপগ্রেডিং, একটি বিনিয়োাগকারী ক্লাব নির্মাণ এবং টেলিযোগাযোগ নেটওয়াার্ক, বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক, গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক, পরিবেশগত ল্যাব এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাসহ ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) কেন্দ্র, একটি জরুরী সাড়া কেন্দ্র, একটি দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র, স্যানিটেশন ও পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। সড়ক নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজগুলো শিগগির শুরু করা হবে। এ লক্ষ্যে সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হতে চলেছে এবং বেজা শিগগির দরপত্র আহবান করবে।