হুমায়ুন কবির জুশান, কক্সবাজার : মিয়ানমারের বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা যুবকেরা বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা তরুণীদের সাথে নিয়মিত মোবাইলে যোগাযোগ করে। তারা একে অপরের সাথে মন দেয়া-নেয়াসহ বিয়ের আশ্বাসে মিলিত হওয়ার অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় দিন গুণছে। এই সুযোগে সুন্দরী রোহিঙ্গা তরুণীরা বাংলাদেশ থেকে সাগর পথে মালেশিয়ায় যেতে চায়।

মানব পাচারকারীচক্র মালেশিয়ায় তাদের প্রেমিকের কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে বাংলাদেশের ক্যাম্পের রোহিঙ্গা তরুণীদের সহজেই তাদের প্রলুব্ধ করে। আবার অনেক তরুণীকে বিয়ের পাশাপাশি ভালো চাকরির প্রলোভনে ফেলে সুযোগ বুঝে দেওয়া হতো মালেশিয়ায় যাওয়ার অফার। বিদেশে গেলেই মোটা অংকের অর্থ উপার্জন হবে।

শরণার্থীর কষ্টের জীবন অবসান হয়ে উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা পাবে। এমন ফাঁদে পড়লেই রোহিঙ্গা নারীদের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এলাকা দিয়ে সাগর পথে মালেশিয়ায় পাচার করা হতো।

এভাবে মালেশিয়ায় পাচার করা হয়েছে হাজারো রোহিঙ্গা নারীকে। অন্যদিকে সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্যে গেলে শুধু বাগানের মালি বা বাসা-বাড়িতে বুয়ার কাজ করে প্রতি মাসে লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। এজন্য বিদেশ যেতে বেশি টাকা খরচ হবে না। সামান্য ৩০-৪০ হাজার টাকা যোগাড় করতে পারলেই হবে। আবার যারা টাকা দিতে পারবে না তাদেরকেও সুযোগ করে দেয়া হয়। তখন সব ব্যয় বহন করবে তারা। এমন প্রলোভন দেখিয়েও পাচার করা হয়েছে হাজারো রোহিঙ্গা নারীকে।

সম্প্রতি মালেশিয়ায় পাচারের সময় সাগর পথে টেকনাফে পাচারকারীচক্রসহ রোহিঙ্গা নারীদের গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এর পর থেকে পাচার কিছুটা কমছে বলে মনে করলেও গোপনে মানব পাচার থেমে নেই এমনটাই সচেতন মমহলের অভিমত।

হেল্প কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম বলেন, এক সময় উখিয়ার রেজু খালের মোহনা দিয়ে ইনানী সাগর পথে মানব পাচার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এলাকার মানুষের সচেতনতায় এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের পর উখিয়ায় মানব পাচার থেমে যায়। ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে উখিয়া-টেকনাফে ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়। তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মানব পাচারকারীচক্র আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।

স্থানীয়রা বলছেন, সাগর পথে আবারও বেড়েছে মানব পাচার। রোহিঙ্গা নারীরা অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তির আশায় মৃত্যু ঝুঁকি জেনেও সাগর পাড়ি দিচ্ছেন তারা। এতে ধীরে ধীরে বাড়ছে প্রাণহানি।

আজিমুল্লাহ নামের এক রোহিঙ্গা যুবক বলেন, ক্যাম্পের পাঁচ-দশ ফুট ঘরের গাদাগাদি জীবন থেকে মুক্তির আশায় যেতে চান বিদেশে। এতে পড়েন পাচারকারীদের খপ্পরে। অনেক সময় সাগরে মাঝপথে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় তাদের স্বপ্নের দেশে পাড়ি দেয়ার চেষ্টা। ট্রলারে ডুবে চোখের সামনে মারা যেতে দেখেছেন অনেককে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও ভয়াবহ সেই স্মৃতি ভুলতে পারছেন না এখনো।

আরেক অসহায় রোহিঙ্গা নারী সানজিদা বলেন, আমার ৭ মেয়ে ৩ ছেলে। তাদের বাবাও বেঁচে নেই। ছেলেরা বিয়ে করে যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। এখনো ৪ উপযুক্ত মেয়ে ঘরে আছে। আমার মেয়েদের যৌতুক দেয়ার সামর্থ নেই। তাই ভবিষ্যত নিরাপত্তার চিন্তায় ঝুঁকি নিয়ে মেয়েকে মালেশিয়ায় পাঠাতে আমার মতো অনেক রোহিঙ্গা তুলে দিচ্ছেন পাচারকারীদের কাছে।

পুলিশ বলছে, চিকিৎসাসহ নানা সেবা নেয়ার কথা বলে ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে দালালদের খপ্পরে পড়ছে রোহিঙ্গারা। এর সুযোগ নেয় মানব পাচারকারীরা। মরিচ্যা যৌথ চেক পোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ জানান, মামলায় হাজিরা দেওয়ার কথা বলে অনেক রোহিঙ্গা গাড়িতে করে কক্সবাজারে চলে যায়।

বিজিবির এক সদস্য জানান, রোহিঙ্গারা চিকিৎসা ও বিভিন্ন মামলার কথা রাস্তা পার হয়ে সাগরে চলে যায়, সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ করা খুবই মুশকিল।

এপিবিএন-৮ সহকারী পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ জানান, দালালরা কয়েকস্তরে এ মানবপাচার করে। এত রোহিঙ্গারা যেমন জড়িত, তেমনি বাংলাদেশি কিছু অসাধু চক্র জড়িত।

জেলা প্রশাসন বলছে, পাচারের কারণ চিহ্নিত করে তা নিরসনেনেয়া হচ্ছে পদক্ষেপ। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ মামুনুর রশীদ জানান, চিকিৎসা সেবা নিতে রোহিঙ্গাদের উখিয়া সদর হাসপাতালে আসতে হয়, তখন কেউ কেউএ সুযোগে বাইরে কোথাও যাওয়ার চেষ্টা করে। গত চার অক্টোবর টেকনাফের বাহারছড়া উপকূলে ৮০ জন যাত্রী নিয়ে মালেশিয়াগামী ট্রলার ডুবে ৪৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও মরদেহ ভেসে আসে ছয় জনের। হদিস মেলেনি অনেকের।