সাইফুদ্দিন মুহাম্মদ, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া কনটেইনারবিহীন পণ্যের (খাদ্যশস্য, সার, সিমেন্ট, ইস্পাত ও সিরামিকশিল্পের কাঁচামাল বড় জাহাজের হ্যাচ বা খোলে আনা হয়) ৭৪ শতাংশই বহির্নোঙরে খালাস করা হয়। এর পরিমাণ গত অর্থবছরে ছিল ৩ কোটি ৬৩ লাখ টন।

তবে পণ্যপরিবহন সংকটে আমদানিকারকদের বিরাট আর্থিক ক্ষতিরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে আমদানিকারকদের গত এক বছরেই ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এই ক্ষতি হয়েছে এই কারণে যে বিলম্বের জন্য জাহাজ কোম্পানিগুলো তাদের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমদানিকারকদের এই বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রায়। এই সবকিছুর ফলে দেশের বাজারে আমদানীকৃত পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে এবং তার অর্থনৈতিক চাপ গিয়ে পড়ছে ভোক্তাসাধারণের ওপর।

অধিকাংশ আমদারিকারকরা জানিয়েছেন, গত ৭/৮ মাস ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে সাগরে নোঙর করা পণ্যবাহী বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে একটি চক্র বাল্কহেডগুলোকে (পণ্যবাহী জাহাজ) পণ্য পরিবহণে বাধা দিচ্ছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম বহিঃনোঙ্গরে লাইটার জাহাজও রয়েছে অল্প সংখ্যক। ফলে ঠিক সময়ে বড় জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস কাজ হচ্ছে না। যেখানে বড় জাহাজগুলো থেকে ১৮ দিনের মধ্যে পণ্য খালাসের কথা সেখানে খালাসী জাহাজ সংকটে ৩ মাসেও অধিক সময় বিলম্ব হচ্ছে পণ্য খালাসে। ফলে জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম বৃদ্ধি এবং ডেমারেজ চার্জসহ পণ্য আমদানি-রফতানি ব্যয় বাড়ছে।

আমদারিকারদের অভিযোগ, একটি চক্র সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ভুল তথ্য দিয়ে সাশ্রয়ী পণ্য পরিবহন বাল্কহেড পরিচালনা কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে।

তারা বলছেন, লাইটারের অর্ধেক ভাড়ায় বাল্কহেডে পণ্য পরিবহণে সুযোগ রয়েছে। যেখানে বাল্কহেডগুলোকে বড় জাহাজ থেকে পণ্য পরিবহণে বাঁধা দেওয়া বন্দরের সুনাম নিয়ে ষড়যন্ত্রের অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে দীর্ঘ দিন ধরে পণ্য খালাস হত লাইটার জাহাজ ও বাল্কহেড দিয়ে। আমদানিকারকের পক্ষে তাদের পরিবহন এজেন্টরা বাল্কহেড দিয়ে বহির্নোঙর থেকে মাদার ভেসেলের পণ্য কম ভাড়ায় ব্যবহার করেন। কারণ হিসেবে এক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী জানান, দেশের সব এলাকায় লাইটার জাহাজ যেতে পারে না।

বাঁশখালী এস.আলম পাওয়ার প্লান্ট, মঘনামা শেখ হাসিনা সাব মেরিন, কক্সবাজার বিমান বন্দর, কুতুবদিয়া, মাতারবাড়ি, ভাসান চর, সন্দ্বীপ, গুপ্তছড়া, নোয়াখালী মুছাপুর, কক্সবাজার রাবার ড্রেম এবং মিরেরসরাই অর্থনৈতিক জোসসহ যেসব স্থানে বিভিন্ন মেঘা প্রকল্পের কাজ চলছে সেখানে অবাধে যেতে পারে বাল্কহেড। তাছাড়া, লাইটার জাহাজের তুলনায় বাল্কহেডের ভাড়া একেবারে কম। এ কারণে বাল্কহেডের প্রতি আমদানিকারকদের নির্ভরশীলতা বেশি।

বাল্কহেড ব্যবসায়ী এসোসিয়েশন অব চট্টগ্রাম সভাপতি মোহাম্মদ চান মিয়া বলেন, চট্টগ্রামে প্রায় আড়াই হাজার বাল্কহেড রয়েছে। দেশের যেসব অঞ্চলে লাইটার ভেসেলের মাধ্যমে সরাসরি মালামাল পাঠানো যায় না, সেখানে বাল্কহেডের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করা হলে খরচ পড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা টনপ্রতি।

তারস্থলে একবার লাইটার তারপর বাল্কহেডের মাধ্যমে পরিবহণ করা হয় সে ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে ৬০০ থেকে ৭০০টাকা বাড়তি খরচ পড়ে। তিনি বলেন, সেখানে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প ব্যয় কমাতে চায়,অথচ সেখানে পরিবহন ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

উদাহরণ দিয়ে মোহাম্মদ চান মিয়া বলেন, একটি মাদার ভ্যাসেল একদিন অলস বসে থাকা মানে ১০-১৫ হাজার ডলার বাড়তি খরচ। বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় শুধু নয়, মেরিটাইম ওয়ার্ল্ডে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, বড় জাহাজ থেকে পণ্য স্থানান্তরের জন্য দেশে ১ হাজার ২০০ লাইটার জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে এখন সচল রয়েছে প্রায় ৯০০।

এ ছাড়া চট্টগ্রামে লাইটারের বিকল্প হিসেবে বাল্কহেড রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার। এসব পণ্য স্থানান্তরের পরিবহনগুলো বন্দরের আসা বড় জাহাজগুলো থেকে পণ্যখালাসে যথেস্ট নয়। ফলে পরিবহন সংকটে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য খালাস করতে পারেছেনা আমদানিকারকরা।

এতে তাদের বিলম্ব মাশুল গুণতে হচ্ছে। এরই মধ্যে বাল্কহেডের কার্যক্রমে নিষেজ্ঞা দেওয়ায় আমদানিকারকরা বিপুল ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন।

চট্টগ্রামের বড় আমদারিকারক টিকে গ্রুপ সূত্র জানায়, টিকে গ্রুপের গমবাহী ‘এমভি ইরামস’ জাহাজ থেকে গম খালাস করতে সময় লেগেছে ৭৩ দিন। জাহাজটি থেকে গম খালাস শেষ হয় গত ২০ আগস্ট। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী পণ্য খালাসে জাহাজ না পাওয়ায় ঠিক সময়ে খালাস সম্ভব হয়নি। পেলে ২০-২২ দিনের বেশি লাগত না। উল্টো বিদেশি জাহাজের বাড়তি সময় অবস্থান করার খরচ দিতে হয়েছে। সময়মতো সব পণ্য বুঝে না পাওয়া এবং পরিবহনের বাড়তি খরচ দুই দিকেই ক্ষতির শিকার হয়েছেন চট্টগ্রামের এ শিল্প গ্রুপকে।

নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি এখানে দায়িত্ব নিয়ে আসার পর তিন মাসে বাল্কহেড জাহাজের বিরুদ্ধে ১০০ মামলা করেছি; আটক হয়েছে অনেক বাল্কহেড জাহাজও। এর পরও নানা কৌশলে তারা পণ্য পরিবহন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বাল্কহেড ব্যবসায়ী এসোসিয়েশন অব চট্টগ্রাম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শামসুউদ্দীন বলেন, বাল্কহেড সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার (বে-ক্রসিং) উপযুক্ত নয় বলে মহলবিশেষের ষড়যন্ত্রের কারণে প্রশাসন নিষেজ্ঞা দেওয়ায় আমদানিকারকদের বিরাট আর্থিক ক্ষতিরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আমদানিকারকরা জানান, পদ্মাসেতু নির্মাণে সমস্ত মালামাল বাল্কহেড দিয়ে পরিবহন হচ্ছে। ভারত থেকে পণ্য আমদানিতেও বাল্কহেড ব্যবহার করা যায়। চট্টগ্রাম বন্দরের ড্রেজিংয়েও ব্যবহার হচ্ছে বাল্কহেড। অথচ বন্দর চ্যানেলে পণ্য পরিবহনে বাল্কহেড ব্যবহার করা যাবে না এমন সিদ্ধান্ত আত্মঘাতি।

তারা বলেন, পণ্যবাহী বাল্কহেড নিয়ে জঠিলতায় আমদানিকারক, শিপিং এজেন্ট, শিল্পোদ্যোক্তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা বা সাধারণ মানুষের ওপরই আসছে। নদীপথে যেসব কারখানায় কাঁচামাল নেওয়া হয় সে সব কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন, সাপ্লাই চেন স্বাভাবিক রাখা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে আমদানিকারক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে।