সঞ্জয় মুখার্জি

– শুভ সন্ধ্যা। কেমন আছ?
– ভালো আছি এখনো। শুভসন্ধ্যা।
– হুম। ভুলটা শুরুতেই করেছি আমি। ‘শুভসন্ধ্যা’ যে একসাথে হয়, ভুলেই গিয়েছিলাম।
– শুধু ‘শুভসন্ধ্যা’ নয়, ‘শুভ’ সবসময় শব্দের আগে যুক্ত থাকে।
– মনে আছে বাবা, মনে আছে। আর ভুল হবে না। তবে আজ কিন্তু অন্য কোনো আলাপ নয়, তোমার ভুল থেকে শেখার কাহিনী শুনব।
– বেশ! ভালোই হবে। তবে কাহিনী নয় ওটা ‘কাহিনি’ হবে।
– তাই নাকি? তাহলে এ ভুল তো তুমিও করেছ!
– নিশ্চয়। অভিধান দেখে যখন ভুল শুধরে নেব ভাবছি, ততক্ষণ প্রেসে বইয়ের প্রচ্ছদ ছাপা শেষ।
– তারপর? প্রকাশককে বলোনি?
– তারপর আর কী! প্রকাশককে বলেছিলাম কিন্তু বললো বাড়তি খরচ করে লাভ কী! প্রচলিত বানানেই থাকুক। পাঠক হঠাৎ করে নতুন বানান পছন্দ করবে না।
– তুমি কী বললে তখন?
– চুপ করে ছিলাম। প্রকাশক বইমেলায় বই রাখবে যদিও নিজের পয়সায় বই ছাপছি সেটাই বা কম কীসে?
– হুম। তাহলে এটাও একটা ‘কাহিনি’ বলতে পারি কি?
– যা খুশি বলো। তারপর থেকেই কাজ করছি বানান নিয়ে।
– বাঃ! এটাও একটা কাহিনি। তোমার প্রথম ভুলের বিষয়টা যদি বলো।
– প্রথম ভুলটি ছিল ক্রিয়াপদে। তখন আমি কলেজে পড়ি। লেখালিখি করছি বেশ। একটি শিশু-কিশোর সংগঠনের সাথে সাহিত্যচর্চায় মন দিয়েছি। কলেজের বাংলা বিভাগের সম্মানিত শিক্ষক ছিলেন সেদিনের সাহিত্য আসরের আমন্ত্রিত অতিথি। তার সামনেই স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছি।
– তুমি তখন থেকেই আবৃতি করো?
– আবৃতি নয় ‘আবৃত্তি’।
– জানি, জানি। ভুল হয়েছে। তা তোমার ক্রিয়াপদে কী ভুল ছিল?
– খাই আর খায়, যায় আর যাই। ছড়া লিখেছিলাম। সেখানে আমি যায় বা খায় এমন একটা কিছু লিখেছিলাম। স্যার খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন আমি বা আমরা হলে ‘ই’ আর বাদবাকি সব ‘য়’ দিয়ে লিখো।
– জানি সেই কারণেই আমাদের ভুলগুলো চোখে পড়ে তোমার। এরপর কোন ভুলটা বেশী মনে পড়ে?
– উফ্! বেশী নয়, ওটা বেশি হবে। বেশী লিখলেই ‘বেশধারী’ মনে হবে কিন্তু!
– আহা! তোমার ভুলের কথা শুনতে চাই আজ।
– আমার জীবনে বানান ভুলের শেষ নেই। তবে অন্যতম একটা ভুলের কথা বলি, যা আমি দীর্ঘদিন আত্মবিশ্বাস নিয়েই করেছি।
– কী ভুল?
– ‘পূণ্য’বানানটি। আমি পাপ-পূণ্য এভাবেই লিখেছি বছরের পর বছর।
– ‘পূণ্য’ বানানে কী ভুল? দন্ত্য ‘ন’ হবে?
– আরে না!
– তাহলে?
– ‘পুণ্য’ হবে উ-কার যোগে।
– তাই নাকি?
– জি।
– হায়, হায়! আমিও তাহলে এ ভুল করি প্রতিনিয়ত!
– তা কীভাবে ঠিক হলো?
– আরেকটা বানান ভুল ঠিক করতে গিয়ে।
– মানে কী?
– মানে হলো ‘ভুবন’ বানান বহুদিন ধরে ‘ভূবন’ লিখেছি। তারপর ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ… ‘ এই গানের সুরে কোনো এক মেন্টরের সাথে বানানটা ঠিক লিখেছি কি না, অভিধান দেখতে গিয়েই ‘ভুবন’ আর ‘পুণ্য’ বানান ঠিক হয়েছে আমার।
– হায়, হায়! আমিও তো…
– তোমার আবার কী হলো?
– ভূবন বানান তো আমিও লিখি। ওটাও যে উ-কারে লিখতে হবে, তা আজই জানলাম। আহা! কী পরিচিত সুর! ‘গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে…’ আর ভুল করব না।
– তোমারও তো দেখি ভুলের শেষ নেই হে! তুমিও কিছু বলো, আমার মতো।
– কী বলব আর! ভুলে ভরা জীবনে একটাই প্রার্থনা।
– কী সে-টা শুনি?
– ‘… এ জীবন পুণ্য করো দহন দানে… ‘
– অপূর্ব! এভাবেই বানান শুদ্ধি অভিযান এগিয়ে চলুক অনিন্দ্য সংলাপে। শুভসন্ধ্যা।