রাজশাহী প্রতিনিধি : রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাট-বাজারে, রাস্তার মোড়ে এবং প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে ও পাড়া-মহল্লায় সম্প্রতি ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে শতাধিক সমিতি কাম এনজিও।

অবৈধভাবে গড়ে উঠা এসব সমিতি কাম এনজিওর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে প্রতারিত ও হয়রানীর শিকার হচ্ছেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি এ ধরনের পাঁচটি এনজিও গ্রাহকদের দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করে উধাও হয়ে গেছে। এ ঘটনায় ওইসব এনজিও’র পরিচালকদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলেও কেউ গ্রেফতার হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাগমারা উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দু’টি পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি যত্রতত্রভাবে গড়ে উঠেছে ১২৫টি সমবায় সমিতি। প্রথমে সমিতির নামে নিবন্ধন নেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তারা এনজিও’র মতো ঋণদান কর্মসূচীর পাশাপাশি উচ্চ হারে (প্রতি লাখে বার্ষিক ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত) লাভ দেয়ার প্রলোভন দিয়ে অবৈধভাবে এফডিআর নেয়ার কাজও করে থাকে।

এ সমিতিগুলোর মধ্যে বেশির ভাগেরই নিবন্ধন দেয়া হয়েছে বাগমারা উপজেলা সমবায় অফিস ও সমাজসেবা অফিস থেকে।

উপজেলা সমবায় অফিসের দেয়া তথ্য মতে, সম্প্রতি বাগমারায় মোট ৭টি সমবায় সমিতির নিবন্ধন দেয়া হয়েছে।

এগুলো হচ্ছে- করতোয়া সেভিং এ্যান্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি:, সূর্য্য মূখী সেভিং এ্যান্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি:, জুই সেভিং এ্যান্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি:, শাপলা সেভিং এ্যান্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি:, শিউলী সেভিং এ্যান্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি:, রজনীগন্ধা সেভিং এ্যান্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি: এবং রোজ সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লি:।

স্থানীয় সমবায় অফিস থেকে নিবন্ধন পাওয়া এসব সমবায় সমিতি নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা না করে এলাকার বিভিন্ন লোকজনের বাসা-বাড়ি ভাড়া নিয়ে পথচারীদের নজরে পড়ার মতো রঙিন সাইন বোর্ড ঝুঁলিয়ে দিয়ে অবৈধভাবে এফডিআর ও ঋণদান কর্মসূচীর পাশাপাশি এনজিও’র মতো কাজ করে থাকে।

চিকাবাড়ী বাজারস্থ বিহেড ফাউন্ডেশন নামে একটি এনজিও উচ্চ হারে লাভ দেয়ার প্রলোভন দিয়ে অবৈধভাবে এফডিআর নেয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রতি লাখে বার্ষিক ২৬ হাজার টাকা হারে লাভ দেয়ার প্রলোভন দিয়ে ১৩ জন গ্রাহকের কাছে থেকে অর্ধকোটি টাকার এফডিআর নেয়া হয়েছে বলে কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন।

এ ছাড়া কিস্তির টাকা দিতে বিলম্ব হওয়ায় নূরনবী নামে এক ফিড ব্যবসায়ীকে ওই এনজিও’র লোকজন মারপিট করে আহত করে। এ ঘটনায় ওই গ্রাহক থানায় অভিযোগ দিলে স্থানীয়ভাবে তা নিষ্পত্তি করা হয়।

এদিকে ‘জনপ্রিয় সেভিং এ্যান্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি:’ ও ‘জন কল্যাণ সংস্থা’ নামে দু’টি এনজিও সম্প্রতি গ্রাহকদের দেড়কোটি টাকা আত্মসাৎ করে উধাও হয়ে গেছে।

এ ঘটনায় প্রতারিত গ্রাহকদের পক্ষ থেকে আদালতে দু’টি মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় ওই দু’টি এনজিও’র পরিচালকের নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হলে এখনো কেউ গ্রেফতার হয়নি। তবে বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, ওয়ারেন্টের কপি থানায় পৌঁছার আগেই তারা দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে।

মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাড়িয়া ইউনিয়নের শীতলাই গ্রামের সাইদুর রহমানের বাড়ি ভাড়া নিয়ে কয়েকজন প্রতারক ‘জন কল্যাণ সংস্থা’ নামে একটি এনজিও’র সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে ঋন প্রদানের নামে সদস্য সংগ্রহ শুরু করেন। মাত্র তিন/চার দিনের ব্যবধানে তারা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে ঋণ দেয়ার প্রলোভন দিয়ে শতাধিক গ্রাহকের কাছে থেকে অর্ধ কোটি টাকা জামানত নিয়ে সটকে পড়েছে।

ওই প্রতারক চক্র শীতলাই গ্রামের রাসেলের কাছ থেকে ২১ হাজার, চন্দ্রপুর গ্রামের নাসিমা বেগমের কাছ থেকে ৬ হাজার, আলোকনগর গ্রামের মুন্টু, মানিক ও মোমেনা বিবির কাছে থেকে ঋণ দেয়ার প্রলোভন দিয়ে জামানত বাবদ ১০ হাজার করে টাকা নিয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। এভাবে কয়েকটি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায় ওই এনজিও।

বাগমারা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আলাউদ্দিন বলেন, বাগমারায় জন কল্যান সংস্থা নামে কোন এনজিও বা সংস্থা নেই। এ নামে কোনো সমিতি কিংবা এনজিও’র নিবন্ধন উপজেলা সমবায় অফিস থেকে দেয়া হয়নি। একটি প্রতারক চক্র বাইরে থেকে এসে ভূয়া এনজিও’র নাম ব্যবহার করে গ্রাহকদের ধোকা দিয়ে অর্ধকোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে।

বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক সুফিয়ান বলেন, ওই প্রতারক চক্রকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যৎতে আর কেউ যেন এ ধরণের অপকর্মের সুযোগ না পায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বলা হয়েছে।