নেত্রকোনা প্রতিনিধি : তোফাজ্জল হোসেন নামে ৩৩ বছরের এক প্রতিবন্ধী যুবক এক সময় দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবীকা নির্বাহ করতেন। পাঁচ কন্যা সন্তানের জনক নিজেকে তখন বড় অসহায় মনে করতেন। কিন্তু হঠাৎই একদিন তিনি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠায় ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে ধার করা স্বল্প পূজি নিয়ে ব্যবসায় নেমে পড়ায় জীবনই তার পাল্টে যায়। প্রতিবন্ধী তোফাজ্জল ভিক্ষৃুক থেকে এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।

তোফাজ্জল হোসেন সদর উপজেলার মৈশাখালী গ্রামের মৃত সমর আলীর পুত্র। যখন তার বয়স ৭ কি ৮ তখন তিনি টাইফয়েটে আক্রান্ত হন। কিন্তু পিতা দারিদ্রতার কারনে চিকিৎসার অভাবে হাত-পা শুঁকিয়ে বাঁকা হয়ে কোমড় থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত অবশ হয়ে যায়। শুরু হয় কষ্টের জীবন ও পরনির্ভশীলতা।

পিতার মৃত্যর পর পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে তিনি হাতে তুলে নেন ভিক্ষার থালা। টানা ১৬-১৭ বছর দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাবৃত্তি করে স্ত্রী ও পাঁচ কন্যা সন্তান নিয়ে দুঃসহ জীবন-যাপন করতে থাকেন। এই দীর্ঘ সময়ে তার মনে কোন শান্তি ছিল না। ছিল না কোন স্বপ্নসাধ। স্ত্রী, পাঁচ কন্যাদের নিয়ে তিনি সর্বদা এক অনিশ্চিত দুঃস্বপ্নের বেড়াজ্বালের মধ্য দিয়ে অতিকষ্টে জীবন-যাপন করতেন।

অসুস্থতার কারণে যেদিন তিনি ঘর থেকে বেব হতে পারতেন না, এমন অনেক দিনই স্ত্রী,সন্তানদের নিয়ে অভুক্ত থাকতে বাধ্য হতেন। সেই দুঃখের কাহিনী বলতে গিয়ে তোফাজ্জল আবেগ, আপ্লুত হয়ে পড়ায় দু’চোখ গড়িয়ে তার অশ্রুধারা নেমে আসে। মনে হলো আমাকে একজন নির্ভরযোগ্য সাংবাদিক মনে হওয়ায় তার অতীত জীবনের দুঃস্বপ্নের বর্ণনা দিতে পারায় হৃদয়ের গভীবে জমাট বাঁধা ফাঁফর বেড়িয়ে পড়ায় তাকে বড় হালকা মনে হচ্ছে। তবে তিনি এও বলতে ছাড়লেন না যে, ইতোপূর্বে অনেক সাংবাদিক তার সাক্ষাৎকার নেয়ার পরেও তা কোন প্রত্রিকায় প্রকাশ হতে দেখেননি।

তোফাজ্জল একদিন ভিক্ষা করাকালীন পুলিশের টি আই ওয়ান জহিরের কাছে স্বাভাবিক নিয়মেই হাত পাতেন। কিন্তু না ওই পুলিশ তাকে সবার মত ভিক্ষা দেননি। মানবিক ওই পুলিশ কর্মকর্তার পরামর্শ ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেন ভিক্ষুক তোফাজ্জল হোসেন। জীবনযুদ্ধে পরাজিত প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক তোফাজ্জল নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। যকন স্বপ্ন বাস্তবরূপে ধরা দেয়ায় তার জীবন ব্যবস্থাই পাল্টে যায়। তার স্বপ্ন ছিল অতিসামন্যই।

তিন চাকার ভ্যানগাড়ির ব্যবস্থা হওয়ায় দেরী না করে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে ধার করা সামান্য পূঁজি নিয়ে ওয়াশিং পাউডার, শেম্পু, বিভিন্ন ধরনের সাবান,বাল্পসহ আরো নানান আইটেমের পণ্য নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন তিনি। এর আগে তিনি অসহায় অবস্থায় রাস্তায় নেমে ছিলেন ভিক্ষার থালা নিয়ে। কিন্ত এবার নামেন ভাগ্য বদলাতে আত্মবিশ্বাসী হয়ে দ’ুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে। তিনি এখন ক্ষুদে ব্যবসায়ী। শহর ও শহরতলীতে ফেরি করে বেড়ান। এতে আয়, রোজগার তার মন্দ নয়। গড়ে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করে থাকেন। এতে ৫-৭শ’ টাকার মত লাভ হয়ে থাকে।

কাটতি বাড়তির দিকে হলেও মূলধনের অভাবে ব্যবসা বড় করতে পারছেন না। ব্যবসা শুরুর পর থেকে মেয়েদের তিনি মাদরাসায় পড়াচ্ছেন। আশার কথা তোফাজ্জলের অনুপ্রেরনায় উৎসাহীত হয়ে তার মত আরো ৭জন ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে তারাও এখন পণ্য নিয়ে ফেরি করে জীবন নির্বাহ করছেন।

জীবন পাল্টে যাওয়া তোফাজ্জল হোসেন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ভিক্ষা করতে খুবই খারাপ লাগত, অপরগ হয়েই দ্বারে দ্বারে গিয়ে হাত পাততে হতো। সর্বদা নিজেকে ছোট মনে হওয়ায় দিলে শান্তি ছিলনা। কিন্তু এখন পুঁজি খাটিয়ে পরিশ্রমের মাধ্যমে যে আয়-রোজগার হচ্ছে তাতেই আমি তৃপ্তও খুসী। তবে সুদমুক্ত ঋণের কোন সহযোগীতা পেলে আরো বড় পরিসরে ব্যবসা করা সম্ভব হতো। আর ভিক্ষে নয়, আত্মনির্ভশীলতা হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার জন্য অন্যান্য ভিক্ষুকদের প্রতি তিনি আহবান জানান।