এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : আম, লিচু, আনার, মাল্টা, আপেলসহ হরেক রকমের ফলে সাজানো ছোট্ট একটি দোকান। মাঝখানে বসে আছেন একজন যুবক। মুখে স্ফীত হাসি। দূর থেকে মনে হবে একজন সুস্থ-স্বাভাবিক যুবক। তবে তিনি অন্যদের মতো স্বাভাবিক নন। একটি পা অকেজো। ক্রাচে ভর করে চলেন। তারপরও অন্যদের ওপর নির্ভরশীল নন তিনি। ফলের দোকান দিয়েছেন। এতে যা আয় হয় তা দিয়েই সংসার চলছে।

জানা গেছে, অন্য শিশুদের মত সুস্থ্য-স্বাভাবিক জন্ম হয় রাজুর। বজলুর রহমান ও হালিমা বেগমের সংসারে আনন্দের বন্যা। প্রথমে মেয়ে সন্তান জন্মের পর প্রথম ছেলে সন্তান জন্ম হয়েছে। নাম রেখেছেন ইসমাইল হোসেন রাজু। আদর-যত্নে বেড়ে উঠছে রাজু। কিন্তু বিধিবাম ৪ বছর বয়সে হটাৎ প্রচন্ড জ¦র হয় রাজুর। কিছুতেই জ¦র কমছে না। পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে দেখা গেল শরীরে টাইফয়েট বাসা বেধেছে। এরপর দেশে বিভিন্ন চিকিৎসকের পরনাপন্ন হলেন, কিন্তু কোন লাভ হয়নি।

পরে দেশের বাইরে ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করার পরও আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয়নি রাজুর। একটি পা অকেজো হয়ে যায়। এরপর থেকে ক্রাচের উপর ভর করে চলতে হয় তাকে। কিছুদিন পর বাবা মারা যান। পরিবারের দায়িত্ব পড়ে তার ঘাড়ে। পড়াশোনা বেশিদুর এগোতে পারেনি সে। ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনার পর বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষা জীবন। শারীরিক প্রতিবন্ধি হয়েও সে কারো উপর নির্ভর ছিলেন না। প্রথমে বাড়ির পাশে ছোট একটি ছাট কুলিং কর্নার দিয়ে বসেন। সেখানে যা আয় হয় তা দিয়ে চলে যায় মা-বোন ভাই নিয়ে তার সংসার। ২০১২ সালে বিয়ে করেন রাজু। বর্তমানে তার ঘরে ৮ বছরে ইসরাফুল ইসলাম রাদিব, ৩ বছরের মো. হিমায়েত ইসলাম নামে দুটি ছেলে রয়েছে।

ইসমাইল হোসেন রাজু ১৯৮৮ সালে মিরসরাই উপজেলার মধ্যম মঘাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে রাজু ২য়।

ইসমাইল হোসেন রাজু বলেন, ৪ বছর বয়সে টাইফয়েটে আক্রান্ত হয়ে তার একটি পা অকেজো হয়ে যায়। এরপর অন্যদের মত স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেন না। ক্রাচে ভর করে চলতে হয় তাকে। আমি শারীরিকভাবে অক্ষম হলেও কখনো অন্যের উপর নির্ভর করিনি। নিজে কিছু করার চেষ্টা করেছি সব সময়। প্রথমে বাড়ির পাশে কালামিয়ার বাজারে ছোট্ট একটি কুলিং কর্নার দিয়েছি। বিয়ে করার পর পরিবারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কুলিং কর্নারের আয় দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। পরে ৩০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে মিরসরাই সদরে একটি ফলের দোকান দিয়েছি। প্রতিদিন দোকানে ৮-১০ হাজার টাকা বিক্রি হয়। বেশি পুঁজি দিতে পারছি না। পুঁজি দিতে পারলে প্রতিদিন ১৮-২০ হাজার টাকা বিক্রি করা সম্ভব। রাজু আরো বলেন, কোন ব্যক্তি বা সংস্থা যদি সুদমুক্ত-ঋণ দিতো তাহলে আমার ব্যবসার পরিধি আরো বাড়ানো যেত।

রাজু মিরসরাই উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রতি ৩ মাসে ২২৫০ টাকা প্রতিবন্ধি ভাতা পেয়ে থাকেন বলে জানান।

মিরসরাই বাজার পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি নুরুল গনি তুহিন বলেন, রাজুকে ছোট থেকে দেখছি। সে খুব পরিশ্রমী। প্রতিবন্ধি হয়েও কোনদিন কারো কাছে হাত মুখাপেক্ষী হননি। সে ব্যবসা করে চলছে। তবে তাঁর পুঁজি কম, কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাকে ব্যবসার জন্য সহযোগিতা করলে ভালো হতো।