এম. মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি : এক মাসের অধিক সময় ধরে বৃষ্টিপাত নেই। রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন এলাকায় খাল-বিলে পানি না থাকায় পাট পঁচাতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। পাট এখন পরিপক্ক হয়েছে। এখন পাট না কাটলে আসন্ন রোপা মওসুমে ধান রোপন করতে দেরি হয়ে গেলে ধানের ফলনও ভাল হবে না।

ফলে অনেক কৃষক পাট কেটে মাঠেই ফেলে রাখায় শুকিয়ে লাল হয়ে মরে গেছে। সেগুলোর আঁশ আর ছাড়ানো যাবে না। আবার ডেবায় স্যালো মেশিনের সাহায্যে পানি দিয়ে অল্প পানিতে পাট পঁচাতে গিয়ে পানি পঁচে কালচে হওয়ায় পাটের কালার কালো হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষকরা পাটের কাংখিত দাম পাচ্ছে না। পাট বেচে লোকসান, উৎপাদন খরচও উঠছে না। এখন কৃষকরা না পারছে পাট কাটা দেরি করতে,না পারছে ক্ষেতেই শুকিয়ে মরে যেতে দেখতে। ফলে সোনালী আঁশ পাট এখন রাজবাড়ীর কৃষকদের গলারন ফাঁস হয়ে গেছে।

সরেজমিনে রাজবাড়ীর পাচ উপজেলার মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ জমির পাট কাটা শুরু হয়েছে। বৃষ্টি না হওয়ার কারণে মাঠে পানি জমেনি। জমি থেকে নদী বা খালের দূরত্ব অনেক দূর। যে কারণে সেখানে পাট নেয়া কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। অনেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি,নছিমন ও ভ্যানে বোঝাই করে নদী বা খালে নিয়ে ফেলছে। তবে কিছু কিছু জমির পাট কেটে মাথায় করে খালে, বাড়ির পুকুরে জাগ দিচ্ছেন কৃষকরা। জমি থেকে অনেক দূরে পাট নিয়ে জাগ দেওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আবার মাছ চাষ করায় খালের অনেক জায়গায় পাটজাগ দিতে দিচ্ছেন না প্রভাবশালী মহল। অনেক জমি পাট ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা মূলত বৃষ্টির পানির জন্য অপেক্ষা করছেন। বৃষ্টির পানিতে মাঠে জলাবদ্ধতা শুরু হলে পুরোদমে পাটকাটা শুরু হবে।

নারুয়া ইউনিয়নরে সাবের আলী নামে এক কৃষক জানান, এ বছর বৃষ্টির পরিমাণ খুবি কম, আষাঢ় মাস শেষ হয়ে গেছে। এখনো কোথাও পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নেই। বানের পানির আশায় আছি। খালে সামান্য বৃষ্টির পানি জমছে সেখানে পাট জাগে ফেলতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পানির অভাবে আঁশ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

সদর উপজেলা বানীবহ ইউনিয়নের মিঠু সরদার নামের এক কৃষক জানান, পাট চাষে কোনো লাভ নেই। অনেক খরচে জমি প্রস্তুত করা, বীজ বোপন সেঁচ দেয়া, সার দেয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, পাটকাটা, জাগ দেয়া ও পাট ধোয়া পর্যন্ত যে খরচ হয়, হিসাব করলে কৃষকদের লছ। করতে হয়, তাই করি।

পাট সোনালী আঁশ হিসাবে পরিচিত । পদ্মা পাড়ের রাজবাড়ী জেলায় ব্যাপক পাটের চাষ হয়। বাংলাদেশে উৎপাদিত মোট পাটের প্রায় ৭ শতাংশ পাট চাষ হয় রাজবাড়ীতে। বেশ কয়েকটি পাটকল স্থাপিত হওয়ায় পাটে সমৃদ্ধ রাজবাড়ী জেলা। কিন্তু এ বছর জেলার চাষিরা পাট নিয়ে বিপাকে রয়েছেন। এ বছর বর্ষার মৌসুম শেষ হয়নি। কিন্তু তেমন কোনো বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে মাঠে পানি জমেনি। খাল-বিল ও হাওড়ে পানির স্বল্পতা রয়েছে। ফলে পাট পচাতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এ বছর রাজবাড়ীতে ব্যাপক পাট চাষ হয়েছে। জেলার ৫টি উপজেলাতে ৪৯ হাজার ১২২ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। যা গতবারের থেকে প্রায় ১ হাজার হেক্টর বেশি। আশা করা হচ্ছে এ বছর জমিতে সোয়া লাখ মেট্রিক টন পাট উৎপাদন হবে।

পাটচাষিরা বলেন, এ বছর রাজবাড়ীতে পাটের স্বাভাবিক ফলন হয়েছে। বাজার দর ভালো আছে। কিন্তু পানি না থাকার কারণে পাট কাটা সম্ভব হচ্ছে না। জমি থেকে বিভিন্ন পুকুরে পাট জাগ দেওয়ার কারণ পুকুরের মাছ মারা যাচ্ছে। এ বছর রাজবাড়ীতে (২২ শতাংশ) একপাখি জমিতে ৬ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত ফলনের আশা করা হচ্ছে।
পাট পচানো নিয়ে কৃষকরা জেলা প্রশাসকের কাছে রাজবাড়ীর পদ্মা পারের বেরীবাঁধে স্লুইসগেটের মাধ্যমে পানি ভিতরের বিভিন্ন মাঠে ঢোকানের দাবি করেছেন।

ওই বাঁধ তৈরীর বিশ বছরেও স্লুইসগেটের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু বন্টন না করায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এলাকার জনপ্রতিনিধি ও কৃষকরা।

জেলা পাট অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. হারুন অর রশিদ বলেন, বর্তমানে সরকারের কাছে পাট পচানোর আধুনিক কোনো ব্যবস্থা হাতে নেই। স্লুইচগেটের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ তার।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক এসএম শহীদ নূর আকবর বলেন, এ বছর জেলায় পাটের ফলনও ভালো হয়েছে। তবে খালে বিলে পর্যাক্ত পানি না থাকায় কৃষকরা পাট জাগ দেয়া নিয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়েছেন।

তিনি আরো বলেন, জমি থেকে অনেক দূরে বহন করে নিয়ে পাট জাগে ফেলতে হচ্ছে বলে কৃষকদের পাট উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। পাটের ভালো দাম না পেলে লোকশান গুণতে হবে কৃষকদের।