খোলাবার্তা২৪ ডেস্ক : নতুন বছরের শুরুতেই করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের মুখে পশ্চিমবঙ্গ৷ একদিকে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, এরই মধ্যে বিধি ভেঙে বর্ষবরণে মেতে উঠে বাঙালি৷

২০২০ সালে করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় পশ্চিমবঙ্গে একদিনে সর্বাধিক আক্রান্তের সংখ্যা ছিল চার হাজার একশ ৫৭৷ দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় এই সংখ্যা পাঁচগুণ বেড়ে যায়৷ গত বছরের ১৪ মে একদিনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২০ হাজার আটশ’ ৪৬ জন৷

করোনার তৃতীয় পর্বে করোনার প্রকোপ অতীতের সব পরিস্থিতিকে ছাপিয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন৷ তাদের মতে, করোনার সংক্রমণ দৈনিক ৩৫ হাজার ছাড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে৷ শহরের বেসরকারি হাসপাতালগুলো জানাচ্ছে, গত সপ্তাহের তুলনায় চলতি সপ্তাহে বেশি মানুষ করোনা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা করাতে আসছেন৷

বড়দিনের পরপরই বিশেষজ্ঞরা করোনা বিষয়ে বিপদের সতর্কবাণী দিয়েছেন৷ তবে তাতেও কর্ণপাত করেনি সাধারণ মানুষ৷ ৩১ ডিসেম্বর বর্ষবরণের রাতে জেলা শহর থেকে কলকাতায় হুল্লোড়ে মেতেছে বাঙালি৷ পার্ক থেকে পাব, সমুদ্রতট থেকে রেস্তোরাঁ, সর্বত্রই ভিড় আর ভিড়৷ অথচ শুক্রবার সন্ধ্যার বুলেটিন অনুযায়ী, রাজ্যে নতুন করে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন তিন হাজার ৫১ জন৷ এরমধ্যে কলকাতায়ই আক্রান্ত ১৯৫৪ জন৷ শনিবার সকালের হিসেব অনুযায়ী, ভারতে নতুন করে করোনা আক্রান্ত ২২ হাজার সাতশ ৭৫ জন৷ ওমিক্রন মিলেছে এক হাজার চারশ ৩১ জনের শরীরে৷ আর কলকাতায় ওমিক্রন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৭৷

পশ্চিমবঙ্গে করোনায় যতজন আক্রান্ত তার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ কলকাতার৷ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামী বলেছেন, ‘‘বড়দিনের ভিড়ের ফল আমরা এখনো পাইনি৷ জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তার রিপোর্ট আসবে৷ এখন কলকাতায় করোনার যে ছবি, তা পুরভোটের জের৷ নির্বাচনের সভা-সমিতি, মিছিল, সমাবেশ, শপথ অনুষ্ঠানের ভিড় থেকে এই সংক্রমণ৷ ইতিমধ্যে পজিটিভিটি রেট বাড়তে শুরু করেছে৷ সরকারি ল্যাব তো বটেই, বেসরকারি ল্যাবেও প্রচুর পজিটিভ ফল পাওয়া যাচ্ছে৷ তৃতীয় ঢেউ শুরু হয়ে গিয়েছে বলেই ধরে নেয়া যায়৷’’

এই পরিস্থিতিতে সে দেশের রাজধানী দিল্লি এবং বাণিজ্যনগরী মুম্বইতে বর্ষশেষ ও বর্ষবরণের উৎসব নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে৷ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তা করা হয়নি৷

করোনার নৈশবিধি ২৪ ডিসেম্বর থেকে পয়লা জানুয়ারি পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছে৷ ৩ জানুয়ারির পর্যালোচনা বৈঠকের পর নিয়ন্ত্রণ জারি হবে৷ গত ৩০ ডিসেম্বর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘গত দুবছর লকডাউন দেখেছি আমরা৷ মানুষের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে৷ কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়েছে৷ তাই এখনই লকডাউন করা হবে না৷’’

এদিকে চার পুরনিগমের ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে গিয়েছে৷ শুরু হয়েছে প্রচার৷ ভোটের সমাগমে করোনা বাড়তে পাড়ে আশঙ্কায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন চিকিৎসকদের অনেকে৷

ভাইরোলজিস্ট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাক্তন পরামর্শদাতা ডাঃ অমিতাভ নন্দী বলেন, ‘‘কোভিড রাজনীতিকদের খেলা হয়ে গিয়েছে৷ আমরা প্ৰথমে জেনেছি যে, মানুষ কাছাকাছি এলে কোভিড ছড়াবে৷ তাহলে ২৫ ও ৩১ ডিসেম্বর পার্ক স্ট্রিটে এত লোকের ভিড় হল কেন? যদি ওমিক্রনের তৃতীয় ঢেউ আসে, তার জন্য সরকার দায়ী৷’’

তবে করোনার বিধি আরোপ করতে গিয়ে যে মানুষের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে সে বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি৷

ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের সদস্য চিকিৎসক অর্জুন দাশগুপ্ত বলেন, ‘‘দেশে লকডাউন হলে সরকারের একটা দায়িত্ব থাকে৷ মানুষকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়৷ কিন্তু আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা নেই৷ বরং উৎসবকে প্রাধান্য দেয়া হয়৷ এটা সরকারের ব্যর্থতা বলা যেতে পারে৷’’

এদিকে নতুন বছরের শুরুতে গঙ্গাসাগর মেলা৷ তার প্রস্তুতি চলছে৷ এ ধরনের মেলায় করোনা ভাইরাসের ‘সুপার স্প্রেডার’ হতে পারে আশঙ্কায় তা বাতিল করার দাবি তুলছেন চিকিৎসকরা৷

ডাঃ গোস্বামী বলেন, ‘‘ওমিক্রনের উপসর্গ কম৷ কিন্তু বয়স্ক মানুষ বা যাদের কোমর্বিডিটি রয়েছে, তাঁদের জন্য বিপজ্জনক৷’’

তৃতীয় ঢেউ কার্যত এসে পড়ায় কলকাতা বইমেলার আয়োজনে প্রশ্নচিহ্ন পড়ে গিয়েছে৷ ৩১ জানুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি মেলা হওয়ার কথা যার মূল ভাবনায় এবার বাংলাদেশ৷

বইমেলার আয়োজক পাবলিশার্স ও বুকসেলার্স গিল্ড-এর কর্তা ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘গত নভেম্বরে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী আলোচনা করে এই ঘোষণা করেছিলেন৷ এখন আমরা আমাদের সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে চলেছি৷ রাজ্য সরকার যা বলবে, সেই অনুযায়ী হবে৷’’

এদিকে সাত জানুয়ারি কলকাতার চলচ্চিত্র উৎসব শুরুর কথা৷ নজরুল মঞ্চের বদলে এবার নবান্ন সভাগৃহ থেকে উৎসবের ভার্চুয়াল উদ্বোধন করা হবে৷ কিন্তু বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র প্রদর্শন হবে কি? সোমবার সরকার কী বলে, সে দিকেই তাকিয়ে সব মহল৷