মিজানুর রহমান মিজান, রংপুর অফিস : হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০-১৪ জুলাই ২০১৯) বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান ও রাজনীতিবিদ যিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দেশ পরিচালনাকে অনেকেই সামরিক একনায়তন্ত্রের সাথে তুলনা করেন। তিনি জাতীয় পার্টি নামে রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীতে বেশ কিছু উপদলে বিভক্ত হয়। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন হতে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং তিনি একাদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৮৩ সালে নির্বাচিত সরকারের অধীনে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং সামরিক শাসন জারীর মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুন:প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ঘোষণা করে তিনি ১৯৮৬ সালে সংসদীয় সাধারণ নির্বাচন দেন। এই নির্বাচনে তিনি স্বপ্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসাবে অংশ গ্রহণ করেন এবং পরে পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে গণবিক্ষোভের চাপে এবং সেনাবাহিনীর সমর্থনের অভাবে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

জীবনী :

১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তারিখে তিনি দিনহাটা শহর, কোচবিহার জেলা, জলপাইগুড়ি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, ভারতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রংপুর জেলায় শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫১ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে (কোহাটে অবস্থিত) যোগ দেন এবং ১৯৫২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হন। ১৯৬০ – ১৯৬২ সালে তিনি চট্টগ্রাম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কেন্দ্রে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

১৯৬৭ সালে তিনি কোয়েটার স্টাফ কলেজ থেকে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি শিয়ালকোটে ৫৪ ব্রিগেডের মেজর ছিলেন। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯ – ১৯৭০ সালে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর অধিনায়ক ও ১৯৭১ – ১৯৭২ সালে ৭ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় এরশাদ ছুটিতে রংপুর ছিলেন। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে তিনি পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালিরা যখন ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসে তখন তিনিও প্রত্যাবর্তন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর সময় আগ্রা ক্যান্টনমেন্টে জাতীয় প্রতিরক্ষা কোর্সে অংশগ্রহণ করেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এরশাদ

পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর ১৯৭৩ সালে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে তিনি কর্নেল ও ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় তিনি মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান ও উপ সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। ১৫ অগাস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর এরশাদ বাংলাদেশের দিল্লি মিশনের মাধ্যমে দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে বার্তা পাঠান। ১৯৭৮ সালে তাকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ একই বছরের ডিসেম্বরে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব বুঝে নেন।

সামরিক অভ্যু্ত্থান ও রাষ্ট্রপতি

৩০ মে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর, এরশাদের রাজনৈতিক অভিলাষ প্রকাশ হয়ে পড়ে। ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সাল নাগাদ তিনি প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। ঐ দিন তিনি দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ.এফ.এম আহসানুদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে নিজের অধিকার নেন। এরশাদ দেশে উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই দলের মনোনয়ন নিয়ে ১৯৮৬ সালে পাঁচ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জামায়াত এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে যদিও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এই নির্বাচন বয়কট করে। সাধারণ নির্বাচনে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি ৭ ডিসেম্বর ১৯৮৭ সালে এই সংসদ বাতিল করেন। ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচন সকল দল বয়কট করে। এরশাদের স্বৈরাচারের বিরূদ্ধে দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে সকল বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ১৯৮৬

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ১৯৮৬ (অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ ১৫ অক্টোবর, ১৯৮৬) জয়লাভ করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এ নির্বাচনে ১৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। বাছাই –এ কোন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাদ না পড়ায় বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ জন। ৪জন প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১২ জন ছিল।

১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১২ জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন- ১। জনাব অলিউল ইসলাম চৌধুরী (সুক্কু মিয়া) ২। আলহাজ্ব মাওলানা খায়রুল ইসলাম যশোরী ৩। আলহাজ্ব মেজর (অব) আফসার উদ্দিন ৪। জনাব মুহাম্মদ আনছার আলী ৫। জনাব মওলানা মোহাম্মদুল্লাহ (হাফেজ্জী হুজুর) ৬। জনাব মোহাম্মদ খলিলুর রহমান মজুমদার ৭। জনাব মোঃ আব্দুস সামাদ ৮। জনাব মোঃ জহির খান ৯। লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবঃ) সৈয়দ ফারুক রহমান ১০। সৈয়দ মুনিরুল হুদা চৌধুরী ১১। স্কোঃ লিঃ (অবঃ) মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী ১২। জনাব হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ।

৯১-পরবর্তী রাজনৈতিক পেশাজীবন

ক্ষমতা হারানোর পর এরশাদ গ্রেফতার হন এবং ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত কারারুদ্ধ থাকেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি কারাগার থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। বি.এন.পি সরকার তার বিরুদ্ধে কয়েকটি দুর্নীতি মামলা দায়ের করে। তার মধ্যে কয়েকটিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং সাজাপ্রাপ্ত হন।

গ্রেফতার

১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। ছয় বছর অবরুদ্ধ থাকার পর ৯ জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে আদালতের রায়ে দণ্ডিত হওয়ার কারণে সংসদে তার আসন বাতিল হয়ে যায়।

তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি ২০০০ সালে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যার মধ্যে তিনি মূল ধারার চেয়ারম্যান ছিলেন । ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তার সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তার স্ত্রী রওশন এরশাদ প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হন।

ব্যক্তিগত জীবন

এরশাদ ১৯৫৬ সালে রওশন এরশাদকে বিয়ে করেন। রওশন ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে তিনবার সংসদ সদস্য হন। ২০০৮ নির্বাচনে এরশাদ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন কিন্তু রওশন বিএনপির সাথে যান। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরে তিনি সংসদের বিরোধী দলের নেত্রীর দায়িত্ব নেন। এরশাদের মৃত্যুর পর, তিনি দলের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি হন। তাদের এক ছেলে রয়েছে – রহগীর আল মাহি শাদ এরশাদ। ২০০০ সালে ১৪ বছর বয়সী এক মেয়েকে অপহরণ করার অভিযোগে শাদ এরশাদকে গ্রেফতার করার পর তিনি আইনি জটিলতায় পড়েন, পরে মেয়েটির বাবা মেয়েটিকে মানসিকভাবে অস্থির বলে উল্লেখ করেন। পরে এরশাদ দাবি করেন যে এটি একটি মিথ্যা অভিযোগ যা তার দলের সম্মানহানি করতে করা হয়েছে। এরশাদ গ্রেফতারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। শাদ বিয়ে করেছেন আর্মিম খানকে। আর্মিম খান বাংলাদেশের ২৪টি ব্যবসায়ী পরিবারের মধ্যে অন্যতম একজন ব্যবসায়ী এম আর খানের নাতনী।

২০০০ সালে এরশাদ বিদিশাকে বিয়ে করেন। পরে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় ও ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার বিদিশার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আনে। এরশাদ বিদিশাকে তার প্রথম বিবাহ গোপন রাখার জন্য তালাক দিয়েছিলেন, যে বিবাহ তাদের বিয়ের সময়েও বিদ্যমান ছিল। একই সঙ্গে তাদের একটি ছেলে রয়েছে যার নাম এরিক এরশাদ।

আরমান এরশাদ ও জেবিন নামে এক ছেলে ও এক মেয়েকে এরশাদ পালক নিয়েছিলেন।

১৯৮৬ সালে ব্রিটেনের দ্য ওবজারার পত্রিকাটি মারিউম মুমতাজের নামের এক মহিলার উদ্ধৃতি দিয়ে জানায় যে, তিনি ১৯৮২ সালের ১৪ আগস্ট গোপনে এরশাদকে বিয়ে করেছিলেন। যার জন্য এরশাদ তাকে ব্যাংকার চৌধুরী বদরুদ্দীনকে তালাক দেওয়ার জন্য বাধ্য করেছিলেন। ১৯৯০-এর প্রথম দিকে, নিউইয়র্ক পোস্ট এবং দা সানডে পত্রিকায় এই বিষয়টি আবার এসেছিল। ১৯৯০ সালের জুন মাসে, ঐ মহিলা বিবাহের বিচ্ছেদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এরশাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে এরশাদ তাকে পরিত্যাগ করেছে।

১৯৯০ সালে সরকারি মালিকানাধীন দৈনিক বাংলা দাবি করে যে, এরশাদ এবং জিনাত মোশাররফ প্রায়ই বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের মালিকানাধীন অতিথিশালায় মিলিত হতেন। জিনাতের স্বামী এ. কে. এম. মোশাররফ হোসেনকে ১৯৮৮ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে এরশাদ সরকারে চাকরি দেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন।

মৃত্যু :

শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০১৯ সালের ২৬ জুন তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ৪ জুলাই তাকে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। তিনি ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি রক্তে ইউরিয়া, হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রথম, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা টানেলে দ্বিতীয়, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে তৃতীয় এবং রংপুরের কালেক্টরেট ঈদগাহ ময়দানে চতুর্থ নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবার পর ১৬ জুলাই তাকে রংপুরের পল্লী নিবাসের লিচুবাগানে তার বাবার কবরের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।