হুমায়ুন কবির জুশান, উখিয়া (কক্সবাজার) : কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহ।

বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর পরিচালিত সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) কার্যালয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে গুলি করে বন্দুকধারীরা।

মহিব উল্লাহ এআরএসপিএইচের চেয়ারম্যান ছিলেন। বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ২০১৯ সালে হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের দায়িত্বে নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক পুলিশ সুপার নাঈমুল হক জানান, এশার নামাজের পর রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হন। তাঁকে রোহিঙ্গা শিবিরের এমএসএফ হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত ঘোষণা করা হয়।

পুলিশ সুপার নাঈমুল হক জানান, সন্ত্রাসীরা মহিব উল্লাহকে লক্ষ্য করে পাঁচ রাউন্ড গুলি করে। এর মধ্যে তিনটি গুলি তাঁর দেহে বিদ্ধ হলে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাঁর মরদেহ উখিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে আকস্মিক এই হত্যাকাণ্ডের পর শিবিরগুলোতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেক রোহিঙ্গা কান্নায় ভেঙে পড়ে। জানা গেছে, কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের সাধারণ রোহিঙ্গারা নিজ দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরে যেতে চায়। নিহত রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহ সাধারণ রোহিঙ্গাদের দাবিদাওয়া নিয়েই লড়ে আসছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পরপরই সাধারণ রোহিঙ্গারা প্রকাশ্যে বলছে, দীর্ঘদিন ধরে শিবিরগুলোতে দাপট দেখানো সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আল ইয়াকিন মহিব উল্লাহকে হত্যা করে থাকতে পারে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আল ইয়াকিনসহ একাধিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। ওই সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলো মিয়ানমারে ফিরতে চায় না। বরং যারা মিয়ানমারে ফেরার পক্ষে কথা বলে, তাদের ওপর হামলা চালায়।

মহিব উল্লাহ সাধারণ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরতে উদ্বুদ্ধ করে আসছিলেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীগোষ্ঠী মহিব উল্লাহকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। কিন্তু দমাতে না পেরে তাঁকে চিরতরে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে।

গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা ঢলের বার্ষিকীতে মহিব উল্লাহ বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি বাংলাদেশে থাকতে চান না, যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরতে চান।

রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর ভাই হাবিবুল্লাহ বলেছেন, উখিয়া কুতুপালং লম্বা শিয়া ক্যাম্পে এশার নামাজ শেষে তার আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস এর অফিসে অবস্থানকালে ২০/২৫ জনের একটি বন্দুকধারী দল আমার ভায়ের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে।

ওই অফিসের অন্যান্যদের মারধর করে ছেড়ে দিলেও ভায়ের বুকে গুলি চালায় মাষষ্টার আব্দুর রহিম নামে এক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। তিনি বলেন, বন্দুকধারীদের এ দলে মাষ্টার আব্দুর রহিম, মোর্শেদ, লালুসহ ২০ থেকে ২৫ জন ছিলো। তাদের তিনি আল ইয়াকিনের সদস্য বলে দাবি করেন।

মুহিবুল্লাহর ভাই হাবিবুল্লাহ আরও জানান, রোহিঙ্গাদের যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য আমার ভাই এগিয়ে আসতেন। তাদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিলেন। শুধু এখানে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও আমার ভায়ের পরিচিতি ছিলো। হয়তো সেই যাত্রা বাধাগ্রস্থ করতে এ হামলা এবং তাকে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার সুষ্টু তদন্ত করে ঘাতকদের শাস্তির দাবি জানাই।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস-এর অন্যতম নেতা মুহিবুল্লাহ ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। তিনি উখিয়ার লম্বাশিয়া ইস্ট-ওয়েস্ট ক্যাম্প-১ এর বাসিন্দা ছিলেন।’ লম্বাশিয়া ইস্ট-ওয়েস্ট ক্যাম্প-১ এর মাঝি মো. রফিক বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে গুলি করে হত্যা করেছে। বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।

এদিকে স্থানীয় সুশিল সমাজের প্রতিনিধি এম,এ কাশেম বলেন, উখিয়া-টেকনাফের ৩৪ টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ তাদের আধিপত্য জানান দেয়ার জন্যে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যা স্থানীয়দের ভাবিয়ে তুলেছে।

কে এই মুহিবুল্লাহ: ২০১৭ সালে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে মুহিবুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। বিদেশিদের কাছেও তিনি পরিচিত ছিলেন। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে ১৫ জন সদস্য নিয়ে গড়ে তোলেন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ বা এআরএসপিএইচ। স্থানীয় বাংলাদেশি মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গেও গড়েন যোগাযোগ।

ধীরে ধীরে মুহিবুল্লাহ প্রধান পাঁচ রোহিঙ্গা নেতার একজন হয়ে ওঠেন। দুর্বৃত্তদের গুলিতে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ নিহত রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লাহ ১৯৯২ সালে রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। তখন থেকেই সে রয়েছে টেকনাফ অঞ্চলে। দেশের বাইরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে সফর করেন একাধিক দফায়।

কিন্তু ২০১৭ সালে রোহিঙ্গার ঢল নামার পর পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। সুস্পষ্টভাবে মুহিবুল্লার আজকের অবস্থানের মূল উত্থান হয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ২০১৮ সালে ইউএনএইচসিআরকে সংযুক্ত করার পর। রোহিঙ্গাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা থেকেই মদদ পায় মুহিবুল্লাহর সংগঠন এআরএসপিএইচ।

ইংরেজি ভাষা ও রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে দক্ষ মুহিবুল্লাহ ধীরে ধীরে বিদেশিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। এই মুহিবুল্লাহ মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিবকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ১৭ দেশের যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ২৭ প্রতিনিধি সাক্ষাৎ করেছিলেন সেখানেও যোগ দিয়েছিলেন মুহিবুল্লাহ।