এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকা থেকে এক সাথে দুই সহোদর তাদের এক বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে যায় মিরসরাইয়ের নাপিত্তাছড়া ঝরনায়। গত রোববার (১৯ জুন) বিকালে তারা তিনজনই নিখোঁজ হলে দিবাগত রাতে ঝরনা থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সোমবার (২০ জুন) বিকাল ৪টার নাগাদ নিখোঁজ দুই সহোদরের একজন তানভীরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওইদিন বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সন্ধান মেলেনি তানভীরের ছোট ভাই তারেকের।

পুলিশ প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার সকালে তৌফিক আহম্মেদ তারেক, মাসুদ আহম্মেদ তানভীর ও ইশতিয়াকুর রহমান প্রান্ত চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকা থেকে নাপিত্তাছড়া ঝরনা দেখার উদ্দেশ্যে বের হয়। এরপর তারা ঝরনা এলাকার একটি টি স্টলে নিজেদের ব্যাগ রেখে ঝরনার চূড়ায় আরহণ করে। এরপর তারা তিনজনই নিখোঁজ হয়।

তবে ঝরনার দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে মিরসরাই থানা পুলিশকে খবর দেয়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা রাত ৮টার দিকে নিখোঁজ ইশতিয়াকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলে পুলিশ তার মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। নিহত ইশতিয়াক চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর বি ব্লকের বাসিন্দা জনতা ব্যাংকের মহা ব্যবস্থাপক (জিএম) মোহাম্মদ জাকারিয়ার ছেলে।

ইশতিয়াকের বাবা মোহাম্মদ জাকারিয়া অভিযোগ করেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। তারা যদি এই বৃষ্টির মধ্যে ছেলেদের বাঁধা দিতো তাহলে এভাবে তাদের হারাতে হতো না। তারা টিকেট বিক্রি করছে অথচ কোন গাইডের ব্যবস্থা রাখেনি।

নাপিত্তাছড়া ঝরনার দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টিএসআর ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান বলেন, ‘প্রচÐ বৃষ্টির কারণে আমরা রোববার টিকিট কাউন্টার বন্ধ রাখি। পর্যটকও খুব কম ছিল। এই তিনজন বেলা ১১টার দিকে ঝরনায় গেছে শুনেছি। ঝরনায় কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গাইড নিয়োগ করা হয়নি এমন প্রশ্নের সদুত্তোর দিতে পারেননি।

ইশতিয়াকের বন্ধু আলিফ মোহাম্মদ বলেন, ‘ইশতিয়াক শান্ত স্বভাবের মেধাবী ছাত্র ছিল। সে এইচএসসিতে এ প্লাস পেয়েছে। এবার বিএমএ ভর্তি হওয়ার কথা ছিলে। সে বন্ধুদের সঙ্গে এর আগেও ঝরনায় এসেছিল। এখানে ঝরনায় যাওয়ার রাস্তা নেই, নিরাপত্তা নেই, সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা না করে পাহাড়ের একটি প্রাকৃতিক ঝরনা প্রতি বছর ইজারা দিচ্ছে বন বিভাগ। আজ অবকাঠামো এবং পর্যটকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকলে হয়তো এ দুর্ঘটনা ঘটতো না।’

নিহত তানভীর ও নিখোঁজ তারেকের মামা মো. তৌহিদুল ইসলাম সুমন জানান, আমার বোন-বোন জামাইয়ের সব শেষ হয়ে গেছে। একসাথে দুটি ছেলেকে হারাতে হবে কোনদিন চিন্তা করতে পারেনি। দুলাভাই (তারেক, তানভীরের বাবা) ব্যবসায়ী। এখন তিনি অসুস্থ হয়ে বাসায় থাকেন। পড়াশোনা শেষ করে দুই ছেলে সংসারের হাল ধরার কথা, অথচ দুজনই চলে গেল। একজনের লাশ পাওয়া গেলেও আরেকজনের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

নিহত তানভীর চট্টগ্রাম নগরীর ইউএসটিসি’র স্নাতকের ছাত্র এবং নিখোঁজ তারেক চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেছে। তাদের বাবা সাহাব উদ্দিন ব্যবসায়ী। নিহত ইশতিয়াক তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে চট্টগ্রাম ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেছে।

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘এখানে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ইজারাদাতা এবং ইজারা গ্রহীতা দুই পক্ষের। তারা আগে পর্যটকদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে ইজারা দেওয়া উচিত হয়নি। পর্যটকদেরও গাফিলতি ছিল। তাঁদের এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে গহিন পাহাড়ে এভাবে যাওয়া ঠিক হয়নি। ভবিষ্যতে আমরা মিটিং করে পর্যটন স্পটগুলো উপজেলা পরিষদের আওতায় নিয়ে আসব।’

মিরসরাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কবির হোসেন জানান, নিহত ইশতিয়াকের মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য চমেক হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিখোঁজ দুই সহোদর তানভীর ও তারেকের মধ্যে তানভীরের মরদেহ একটি ছড়া থেকে সোমবার বিকাল ৪টায় উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তানভীরের ছোট ভাই কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র তারেকের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। তারা চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকার বি বøকের বাসিন্দা। তবে তাদের গ্রামের বাড়ি মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের পশ্চিম জোয়ার গ্রামে। বাকিজনকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ডুবরী দল কাজ করছে।

নিখোঁজ তারেককে উদ্ধারে চেষ্টা চালাচ্ছে মিরসরাই ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ডুবরী দল। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ঝরনা এলাকায় নিখোঁজ একজনের একটি জুতা কুড়িয়ে পেয়েছে। এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত গতকাল সোমবার বিকাল সাড়ে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত নিখোঁজ তারেকের সন্ধান পায়নি ডুবরী দল।