নবাব সিরাজ উদ দৌলার হাতে লেখা পত্র। ছবি: ইন্টারনেট

খোলাবার্তা২৪ ডেস্ক : বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব, নবাব সিরাজ উদ দৌলার তরবারি, হাতে লেখা চিঠি, তাঁর পোশাক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দলিল চট্টগ্রামে রাউজানে সংরক্ষিত আছে বলে খবর বেরিয়েছে।

আর এমন খবরে নড়েচড়ে বসেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। নবাব পরিবারের ১১তম বংশধর দাবিদার নবাব সৈয়দ মাহাদী মর্তজা আলী উদ দৌলা খাঁ বংশ পরম্পরায়ে এ সব প্রাচীন নির্দশন সংরক্ষণ করে আসছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ জানান, নবাব সিরাজ উদ দৌলার বংশধর সৈয়দ মাহাদীর বিষয়ে খোঁজ নিতে তিনি এরই মধ্যে রাউজান গেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, তার কাছে যেসব দলিল, নথিপত্র রয়েছে তা ফার্সী ভাষায় লেখা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এ ব্যপারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নবাব সিরাজ উদ দৌলার ১১তম বংশধর দাবিদার নবাব সৈয়দ মাহাদী মর্তজা আলী উদ দৌলা খাঁ চট্টগ্রামের রাউজানের শাহনগর গ্রামে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। পৈত্রিক আবাসস্থল নোয়াখালির বেগমগঞ্জে হলেও প্রায় ৪০ বছর ধরে মসজিদের ইমামতি পেশার সুবাদে আছেন রাউজানে।

সৈয়দ মাহাদীর দাবি, তারা নবাব সিরাজ উদ দৌলার কন্যা উম্মে জহুরার বংশধর। তার বাবার নাম নবাব সৈয়দ হাফেজ আবদুল্লাহ আলী আকাবাদৌলা খাঁ। দাদার নাম নবাব সৈয়দ মো: শওকত হোসেন আনোয়ার আক্তার চাঁনগাজী। বললেন, ব্রিটিশদের ভয়ে আত্মপরিচয় গোপন রেখে নবাব পরিবারের সদস্যরা ভারত বর্ষের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

এরমধ্যে দাদা সৈয়দ মো: শওকত হোসেন আনোয়ার আক্তার ১৮৯৯ সালের ঢাকার নবাব খাজা আহসান উল্ল্যাহর সাথে দেখা করলে তিনি গোপনে তাদের নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে বোনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ইংরেজদের ভয়ে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আত্মগোপন করেন।

সেসময় তার কাছে থাকা নবাব সিরাজ উদ দৌলার ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী এবং যুদ্ধের তলোয়ারসহ অনান্য সরঞ্জাম বড় পাতিলে ভরে মাটিতে লুকিয়ে রাখেন। তার দাদার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে কবরস্থানে মাটি খুঁড়ে নবাব সিরাজ উদ দৌলার ব্যবহৃত পোষাকসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করেন।

নবাব পরিবারের বংশধর দাবিদার সৈয়দ মাহাদী এক এক করে বের করে আনেন তার কাছে থাকা নবাব সিরাজ উদ দৌলার ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। জানান, মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ কর্তৃক নবাব আলীবর্দী খাঁকে দেয়া সনদ তার কাছে রয়েছে। দেখানো হয়, নবাব সিরাজ উদ দৌলাকে দেয়া আলীবর্দী খাঁর কুরআন শরীফ, পলাশীর যুদ্ধ পরিকল্পনার দলিল, নবাব সিরাজ উদ দৌলার হাতে লিখা চিঠিসহ ফার্সী ভাষায় লিখা দুর্লভ বিভিন্ন কাগজপত্র।

সৈয়দ মাহাদী মর্তুজা জানান, তার কাছে থাকা তরবারিটি বাংলার শেষ নবাবের। তরবারিতে খোদাই করে নবাব সিরাজ উদ দৌলার নাম লিখা রয়েছে। তরবারি সাথে আছে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসাবে নবাব সিরাজ উদ দৌলার ব্যবহৃত ছড়ি। নবাব ১০টি বাহিনীর প্রধান ছিলেন বলে তার পোশাকে কাঁধের দুই পাশে ৫টি করে ১০টি বোল্ডার রয়েছে। তার কাছে থাকা এসব পোশাকই নবাবের বলে দাবি করেন তিনি।

বংশানুক্রমিক ভাবে দাদার কাছ থেকে এসব সামগ্রী পেয়েছেন বলে দাবি করেন সৈয়দ মাহাদী মর্তুজা। তিনি জানান, নবাব সিরাজ উদ দৌলার ব্যবহৃত পোশাকটি এর মধ্যে বিভিন্নস্থানে ছিঁড়ে গেছে। নবাবের মাথার তাজটিও ধুলাবালিতে মলিন হয়ে গেছে।

নিজের অভাব-অনটনের কথা তুলে ধরে সৈয়দ মাহাদী জানান, অভাবের কারণে নবাব সিরাজ উদ দৌলার পোশাকের সাথে থাকা মণি-মুক্তা, স্বর্ণালংকার তার দাদা-বাবারা বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। এখনো অভাবের তাড়না নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তবে কারো কাছে সাহায্যের জন্য যাননি। এলাকায় টিউশনি এবং মসজিদের ইমামতি করে সংসার চালাচ্ছেন জানান তিনি।

ভয়েস আমেরিকার কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে সৈয়দ মাহাদী মর্তুজা বলেন, সরকারের কাছে তাদের চাওয়া-পাওয়া কিছু নেই। সরকারীভাবে নবাব সিরাজ উদ দৌলার ব্যবহৃত তরবারি, পোশাক, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেয়া হলে তিনি তা হস্তান্তর করবেন। তবে, এ জন্য বংশ স্বীকৃতি দাবি জানান তিনি।

রাউজান পৌরসভার মেয়র জমির উদ্দিন পারভেজ জানান, তিনি ছোট বেলা থেকে সৈয়দ মাহাদী নবাব পরিবারের বংশধর বলে শুনে আসছেন। তবে, সরকারিভাবে এ সংক্রান্ত কোন তথ্য নেই বলে জানান তিনি।

এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী ভয়েস অব আমেরিকাকে জানান, বাংলার ইতিহাস প্রায় তিন হাজার বছরের বেশী পুরানো। এ অঞ্চল যারা শাসন করেছে তাদের অধিকাংশই ছিল ভিন্ন দেশী। নবাব আলীবর্দী খাঁও ছিলেন তুরস্কের বাসিন্দা। ফলে নবাব আলীবর্দী খাঁ বা নবাব সিরাজ উদ দৌলার রাজ কার্যক্রম পরিচালিত হতো ফার্সী ভাষায়। সৈয়দ মাহাদী মতুর্জার কাছে ফার্সী ভাষায় লিখা যেসব দলিলপত্র পাওয়া গেছে সেগুলি নবাব সিরাজ উদ দৌলা কিংবা আলীবর্দী খাঁর আমলে হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে, এ জন্য সরকারি উদ্যোগে এ সব নথি, দলিল পত্র যাচাই-বাছাই করা দরকার বলেও মনে করেন।

সরকারি উদ্যোগে সৈয়দ মাহদী মতুর্জার কাছে থাকা নথি পত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুত সংরক্ষণের পরমার্শ দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপচার্য।

তিনি বলেন, এরমধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সভ্যতা সম্পর্কে জানতে পারবে, বাংলার ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হবে। – তথ্যসূত্র: ভোয়া