এম এম হারুন আল রশীদ হীরা, নওগাঁ : নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার শিয়ালা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষানীতিকে উপেক্ষা করে উপবৃত্তির তালিকায় পার্শ্ববর্তী বগুড়া জেলার আদমদিঘী উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নাম অর্ন্তভূক্ত করে টাকা উত্তোলন করার অভিযোগ উঠেছে শিয়ালা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরেন্দ্রনাথ সরকারের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে ৩শ’ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গত ৩১ অক্টোবর তারিখে পরিদর্শন খাতায় নোট করেছেন।

জাতীয় শিক্ষানীতি অনুসারে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষায় সহায়তার জন্য সরকারিভাবে উপবৃত্তি পাবেন। এতে ওই শিক্ষার্থীদের ৭৫% উপস্থিতির হার, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীতে ৩৩% নম্বর পেতে হবে, অষ্টম ও নবম শ্রেণীতে গড়ে ৪০% নম্বর পেতে হবে ও ভর্তির পর থেকে বিরতিহীন ভাবে অধ্যয়ন করতে হবে।

এ ছাড়া এ প্রতিবেদকের হাতে থাকা কাগজপত্রে দেখা যায়, শিয়ালা উচ্চ বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী (গতমাসের ভোটার তালিকা অনুযায়ী) ২শ ২৪ জন অথচ উপবৃত্তির চাহিদার তালিকায় প্রধান শিক্ষক হরেন্দ্রনাথ সরকার ৪৩৮ জন শিক্ষার্থী দেখিয়েছেন। যা প্রতারণার শামিল। এর মধ্যে ১শ ৩৯ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পেয়েছেন। অথচ প্রাপ্যতা অনুসারে ওই প্রতিষ্ঠানের ৬৯ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পাবেন। উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৪ জন শিক্ষার্থী ওই প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়াই করে না। তারা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তাদের নামে যে উপবৃত্তির টাকা আসে এটাও তারা জানেন না।

অভিভাবক ভোটার তালিকা অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণীতে শিক্ষার্থী আছে ৫৩ জন, সপ্তম শ্রেণীতে ৫০ জন, অষ্টম শ্রেণীতে ৩৯ জন, নবম শ্রেণীতে ৪১ জন, দশম শ্রেণীতে ৪১ জন। উপবৃত্তি পায় ষষ্ঠ শ্রেণীতে ২৪ জন, সপ্তম শ্রেণীতে ৫২ জন, অষ্টম শ্রেণীতে ২৫ জন, নবম শ্রেণীতে ২৩ জন, দশম শ্রেণীতে ১৮ জন। এরমধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানের কোন কাগজপত্রে নাম নেই ষষ্ঠ শ্রেণীর ১০ জনের, সপ্তম শ্রেণীর ২১ জনের, অষ্টম শ্রেণীর ৫ জনের, নবম শ্রেণীর ২ জনের, দশম শ্রেণীর ৬ জনেরসহ মোট ৪৪ জনের।

তিনি উপবৃত্তির জন্য শিক্ষার্থী দেখিয়েছেন ষষ্ঠ শ্রেণীর ১৩০ জন, সপ্তম শ্রেণীর ১০০ জন, অষ্টম শ্রেণী ৭৮জন, নবম শ্রেণীর ৭০ জন, দশম শ্রেণীর ৬০ জনসহ মোট ৪৩৮ জন।

চাপাপুর ইব্রাহীম মেমোরিয়াল মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী নাদিয়ার মা আঞ্জুমান আরা, শ্রী জয় চন্দ্রের বাবা প্রবীণ কুমারসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক বলেন, আমার ছেলে/মেয়েদের কখনো তো শিয়ালা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেইনি তারা কেউ সেই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে না।

এ ছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক জানান, উপবৃত্তির কাজে প্রধান শিক্ষকের সাথে অফিস সহকারী নূরুল ইসলাম জড়িত। তারা আরও বলেন, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন যাবৎ উপবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক মাসিক বেতন আদায় করে আসছে।

এ বিষয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী নূরুল ইসলাম বলেন, উপবৃত্তি দেওয়ার নামে অনেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩শ টাকা করে নেওয়ার যে কথা ইউএনও স্যার পরিদর্শন বইতে লিখেছেন তা সঠিক নয়। এ ছাড়া শিক্ষানীতি উপেক্ষা করে অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কিভাবে উপবৃত্তি দেওয়া হয়েছে তার কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরেন্দ্রনাথ সরকার সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে এসব একটু-আধটু করতেই হয়। আপনাকে আমাদের প্রতিষ্ঠানে চায়ের দাওয়াত রইল আপনি আসেন সামনা-সামনি কথা বলবো।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, আপনার মাধ্যমে এই বিষয়টি প্রথম জানলাম। সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাহাদাত হুসেইন বলেন, আমি এই প্রথম ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়েছি। সেখানে আমি যথেষ্ট অনিয়ম পাওয়ার পর সবার সামনে আমি সেগুলো লেখে তাদের পড়ে শুনিয়েছি। তখন তারা কেউ মিথ্যে বলেননি। আর অতিরিক্ত শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপবৃত্তি উঠানোর বিষয়ে জানতাম না। সরকার শিক্ষার জন্য অনেক কিছু করছে। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।