এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : বিয়ের দুই বছর পর প্রবাসী রাজিব-পান্না দম্পতির কোলজুড়ে প্রথম পুত্র সন্তান পৃথিবীতে আসে। কিন্তু জন্মের পর মাত্র ১ ঘন্টার বেশি বেঁচে থাকলো না সেই নবজাতক। মাথায় ব্রেন টিউমার নিয়ে জন্মের কারণে মারা যায় ওই নবজাতক। তখন রাজিব প্রবাসে থাকায় সন্তানের মুখ দেখা হয়নি।

এরপর দেশে আসলেন, এক বছর পর তাদের ঘরে জন্মগ্রহণ করে ২য় সন্তান। নাম রাখেন লামিয়া আক্তার। মা, দাদা-দাদির পরম আদরে বেড়ে উঠছেন লামিয়া। লামিয়াকেও দেখা হয়নি বাবা রাজিবের।

কয়েকমাস পরে একমাত্র কন্যা সন্তানকে দেখতে দেশে আসার কথা তার। কিন্তু কে জানতো এই সন্তানকেও দেখা হবে না তার! ভাগ্যের নির্মম পরিহাস দেশে আসার আগে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে লাশ হয়ে গেল এক বছরের লামিয়া। বিদেশে বাকরূদ্ধ বাবা রাজিব। বাড়িতে বার বার জ্ঞান হারাচ্ছেন মা পান্না। চোখের সামনে আদরের সন্তান পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তাকে সান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না স্বজনরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের জমাদার গ্রামের গোলবক্স মুহুরী বাড়ির আজিজুল হকের ছেলে রাজিব উদ্দিনের সাথে একই ইউনিয়নের পান্না আক্তারের চার বছর আগে বিয়ে হয়। বিয়ের এক বছর পর রাজিব এবং পান্নার কোল জুড়ে আসে একটি পুত্র সন্তান। সে পুত্র সন্তান জন্মের ১ ঘন্টা পর মাথার ব্রেইন টিউমারে মারা যায়।

রাজিবের স্বজন মো. হুমায়ুন কবির বলেন, আমার মামাতো ভাই রাজিব উদ্দিন ও ভাবী পান্না আক্তার চার বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের দু’তিন মাস পর ভাইয়া প্রবাসে চলে যায়। একবছরের মাথায় ভাবী একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেন। জন্মের এক ঘন্টার পর মাথায় ব্রেইন টিউমারের কারণে সে পুত্র সন্তানটি মারা যায়। প্রবাসে থাকায় সে পুত্র সন্তানের মুখ দেখেন নাই রাজিব। ৫-৬ মাস পর উনি দেশে আসেন। দেশে এসে ৩-৪ মাস থেকে চলে যান। এরপর তাদের কোল জুড়ে আসে লামিয়া আক্তার।

হুমায়ুন আরও বলেন, লামিয়া আক্তারকে দেখার জন্য ছুটি নিয়ে দেশে আসার কথা রয়েছে। এ মাসের মধ্যে দেশে আসার কথা রয়েছে। তার আগে লামিয়া ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে চলে গেছেন। লামিয়া একটু একটু করে কথা বলতে শুরু করেছে। তাকে হারিয়ে তার দাদা-দাদি, মা, নানা-নানি, চাচা সহ স্বজনরা বারবার মূর্চা যাচ্ছেন। শুক্রবার বিকেল জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

এলাকার বাসিন্দা মাজহারুল হক চৌধুরী বলেন, বসতঘর, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার পুড়ে যাওয়া মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু এক বছরের শিশু এভাবে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। কপাল খারাফ রাজিবের প্রথম সন্তানও জন্মের পর মারা গেলো। ২য় সন্তানও জন্মের এক বছরের মাথায় চলে গেলো। খুবই মর্মান্তিক।

জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের জমাদার গ্রামের গোলবক্স মুহুরী বাড়ির আজিজুল হকের পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট একটি বসতঘরে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এসময় অগ্নিকান্ডে লামিয়া আক্তার ১১ মাস বয়সী শিশু ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে মারা যায়। তার মা দুপুরে তাকে বসত ঘুরে ঘুম পাড়িয়ে পুকুরে গোসল করতে যায়। এসময় শর্টসার্কিটের আগুনে পুড়ে মারা যায় ঘুমন্ত লামিয়া।

ইছাখালী ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মীর হোসেন বলেন, আমার ওয়ার্ডের গোলবক্স মুহুরী বাড়িতে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়ে আজিজুল হকের পুরো ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। শুধু তাই নয় তার নাতনী ১১ মাস বয়সী শিশু লামিয়াও আগুনে পুড়ে মারা যায়। এছাড়া নতুন ঘর তৈরির জন্য রাখা নগদ ৬ লক্ষ টাকা, স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র যাবতীয় জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।