কাজী খলিলুর রহমান, ঝালকাঠি প্রতিনিধি : ঝালকাঠি সহ দক্ষিণাঞ্চলেরজেলা গুলোতে চলতি বছরে আমরার বাম্পার ফলন হয়েছে। এখানে উৎপাদিত আমরার সরবরাহ হচ্ছে রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশে। রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। ধানের চেয়ে বেশি লাভজনক হওয়ায় আমড়া চাষে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

এ বছর আমড়ার বাম্পার ফলনে বাড়তি আয়ের প্রত্যাশায় প্রত্যেক বাড়িতে খুশির আমেজ থাকলেও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চাষিদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।

কিন্তু হিমাগারের অভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না আমড়া। সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেয়ায় বাগানেই লাখ লাখ টাকার আমড়া পচে নষ্ট হচ্ছে।

শুরুতে নিজেদেরর পরিবারের চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে আমড়া চাষ করা হয় । অল্প খরচে বেশি উৎপাদন ও অধিক লাভজনক হওয়ায় আস্তে আস্তে আমড়া চাষের বিস্তৃতি বাড়তে থাকে। এর পর শুরু হয় বানিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ।

ঝালকাঠি সহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়ীতেই দীর্ঘদিন ধরে নিজ প্রয়োজনে দু’একটি করে আমড়া গাছ লাগানো হতো। লাভ জনক হওয়ায় কয়েক বছর ধরে কৃষি জমিতে কান্দি বা পাইকা কেটে, জমির আইলে,পুকুর পাড়ে,সরকারি রাস্থার ধারে নদী ও খালের পারে বাড়ীর আঙ্গিনায় বানিজ্যিক ভিত্তিতে আমড়া চাষ শুরু হয়েছে। এখানে উৎপাদিত আমরার চাহিদা এবং জনপ্রিয়তা রয়েছে সারাদেশেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশালের আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরে বরিশাল অঞ্চলে দুই হাজার ১২৪ হেক্টর জমিতে আমড়ার চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ১৪ টন আমড়ার ফলন মিলবে। সে হিসাবে বরিশাল বিভাগেই ৩০ হাজার টন আমড়া উৎপাদন হবে। এর বাজারদর কমপক্ষে অর্ধশত কোটি টাকা।
সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ফল আমড়া। টক-মিষ্টি স্বাদের ফলটি কমবেশি সবারই প্রিয়। দেশীয় এ ফল নির্দিষ্ট মৌসুমে পাওয়া যায় প্রায় দেশজুড়েই।

যত্ন করে আমড়ার সবুজ বাকল ছাড়িয়ে লবণ-মরিচ মিশিয়ে তাতে কাঠি গেঁথে বিক্রির দৃশ্য এ সময়টাতে প্রায় সর্বত্রই চোখে পড়বে। আবার খণ্ড খণ্ড করে তাতে কাসুন্দি মিশিয়ে বিক্রি করতেও দেখা যায় রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে। কোন এলাকার আমড়া? বিক্রেতা হয়তো নিজেও জানে না। তবে এটা জানে যে বরিশাল এলাকায় উৎপাদিত আমড়ার প্রতি ক্রেতা-ভোক্তার আগ্রহ বেশি। সে জন্য রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বিক্রেতা ডেকে ওঠে -“এ্যাই আমড়া আমড়া বরিশ্যাইল্যা আমড়া”। জবাব শুনে ভোক্তাও তা লুফে নেয় আগ্রহভরে।বাজারে আমড়া বিক্রি হয় কেজি দরে।

অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে ঝালকাঠি তথা উপক’লীয় জেলাগুলোর হাজার হাজার আমড়ার চাষীরা আমড়ার ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। প্রতি বছরই তাদের উৎপাদিত ফসল নামমাত্র মূল্যে কিনে নিচ্ছেন পাইকার নামক মধ্যসত্ত¡ভোগীরা, বিনা শ্রমে তারা অর্জন করছে বিপুল মুনাফা। চলতি মৌসুমে আমড়ার ফলন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে প্রতিমন আমড়া পাইকারি ৭০০থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর এক কুড়ি (২০টা) আমরা ৫০থেকে ৬০ টাকা বিক্রি হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে গড়ে ৫মন আমড়া পাওয়া যায় যা দিয়ে একর প্রতি কমপক্ষে ৪-৫ লাখ টাকা আয় হয়।

আমড়া চাষের জন্য এ অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু বেশ উপযোগী। তাই আমড়ার ফলনও এ অঞ্চলে বেশি হয়ে থাকে। কৃষকরা আমড়া চাষ করে অতি সহজে হতে পারেন স্বাবলম্বী। এছাড়া মৌসুমি ফল আমড়া হতে পারে এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস।

কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে মোট উৎপাদিত আমড়ার এক-তৃতীয়াংশের আবাদ হয় বরিশাল অঞ্চলে। আর এ অঞ্চলের উৎপাদিত সিংহভাগ আমড়ার আবাদ হয় বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনাসহ প্রতিটি জেলার আনাচে-কানাচে।

ঝালকাঠি কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগ সুত্র জানিয়েছে, চলতি বছর জেলায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে আমড়া চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৮ থেকে ১০ টন আমড়া উৎপাদন হয়েছে।

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর জেলায় ৪৬৮’হেক্টর জমিতে আমড়ার চাষ হয়েছে।

এ অঞ্চলে আমড়ার অন্যতম মোকাম ঝালকাঠির বাউকাঠি ও ভীমরুলির ভাসমান বাজার। এ ছাড়া পিরোজপুরের আটগড়, কুড়িয়ানা, বরিশালের বানরীপাড়াসহ ছোট-বড় প্রায় ২০টি বাজারে আমড়ার বেচাকেনা হয়। এসব বাজার থেকে নৌ-পথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আমড়ার চালান করা হয়। এসব বাগানে প্রতি বছরই কোটি কোটি টাকার আমড়ার উৎপাদিত হয়।এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা আমড়ার, পেয়ারা ও সবজি নির্ভর।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা গ্রামের বেশিরভাগ এলাকায় আমড়া কেনা-বেচার ব্যাপারী রয়েছেন। তারা আগাম টাকা দিয়ে বাগান কিনে নিয়েছেন।

আমড়া ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, আড়ত থেকে ঢাকা,চাঁদপুর,মুন্সীগঞ্জে এক বস্তা আমড়া পৌঁছাতে খরচ হয় ২১০ থেকে ২২০ টাকা। প্রতি বস্তায় থাকে ১ হাজার ৫০০ আমড়া। বর্তমানে এক বস্তা আমড়ার দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা- যা ঢাকায় বিক্রি হয় ২ হাজার টাকার উপরে।

বর্তমানে এত বেশি আমড়ার ফলন হচ্ছে, যা দেশ-বিদেশে চালানের পরও পর্যাপ্ত মজুদ থাকছে। অথচ হিমাগারের অভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। যে কারণে আড়তদারদের চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম মূল্যে আমড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা।

উপজেলার আমড়া ব্যবসায়ীরা জানান, এ মোকাম থেকে বছরের চার মাস অর্থাৎ আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক কোটি টাকার আমড়া চালান দেয়া হয়। ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ, যশোর, সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, নোয়াখালী ছাড়াও এখন দেশের বাইরে ভারত, দুবাই, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ডসহ রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও।

বিদেশের বহু স্থানে ঐতিহ্যবাহী আমড়ার বেশ চাহিদা রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। ফলে চাষিরা দিন দিন এই এলাকায় বানিজ্যিক ভিত্তিতে আমড়া চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এলাকার এমন কোনো বাড়ি পাওয়া যাবে না যেখানে দু-চারটি আমড়াগাছ না আছে।

আমড়াগাছের চারা রোপণের তিন-চার বছরের মধ্যে ফলন ধরে, তা কোনো আপদ বালাই ছাড়াই এক নাগাড়ে ১৫-২০ বছর পর্যন্ত ফলন দেয়। এর পর আস্তে আস্তে গাছ শুকিয়ে যায়। ফলে জমিরও কোনো ক্ষতি হয় না।

পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে আমড়া দিয়ে জেলি ,চাটনী জ্যাম তৈরী করা যায় ।

তাছাড়া আমরা ভিটামিন সি অভাব দুর করে। আমড়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন এ, বি, সি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। খাদ্যোপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম আমড়ায় রয়েছে ১.১ গ্রাম প্রোটিন, ১৫ গ্রাম শ্বেতসার, ০.১ গ্রাম স্নেহ, ০.২৮ মি.গ্রাম ভিটামিন এ, ০.০৪ মি.গ্রাম ভিটামিন বি, ৯২ মি.গ্রাম ভিটামিন সি, ৫৫ মি.গ্রাম ক্যালসিয়াম, ৩.৯ মি.গ্রাম লৌহ এবং ৮০০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন। এ ছাড়া প্রতিটি আমড়ায় ৬৬ কি.গ্রাম খাদ্যশক্তি রয়েছে।

এসব পুষ্টি উপাদান সুস্বাস্থ্যের জন্য খুবই প্রয়োজন। ফলে আমড়া এক দিকে ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করছে এবং অন্য দিকে বাম্পার ফলনে আর্থিক লাভবান হওয়া যায়। চাষিদের দাবি সরকারি পর্যায়ে একটি হিমাগার স্থাপন করে আমড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।

বরিশাল অঞ্চলে উৎপাদিত ফলফলাদিও মধ্যে বিলাতি আমড়া গুনে-মানে ও সুখ্যাতিতে যা ঐ অঞ্চল ছাপিয়ে সারাদেশের মানুষের নজর কেড়েছে জাতীয়ভাবে এ ফলটা রিলাতি আমড়ার নামে পরিচিত হলেও তাকে আমরা বিলেতি আমড়া বা বরিশাইল্যা আমড়া বলে থাকি।

এ আমড়া ফলটি বিলেত থেকে আমদানি করা হয়েছে বলে পন্ডিতরা পুথিঁ ঘেটে পেয়েছেন। সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণ সম্পন্ন বিখ্যাত এ অঞ্চলের আমড়ার সারাদেশে পরিচিত। ভিটামিন সি এর রাজধানী বলতে মূলত বৃহত্তর বরিশালের আমড়ার কে বুঝায়।

এর বৈজ্ঞানিক নাম ঝঢ়ড়হফরধং সধমহরভবৎধ (স্পন্ডিয়াস ম্যাগনিফেরা)। আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমড়ার ভরা মৌসুম। আমড়ার শ্বাস সাদা ও পাকলে ফলটি হলুদ রং ধারণ করে। এ জন্য আমড়াকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘গোল্ডেন অ্যাপল’।

কৃষিবিদ সাখাওয়াত হোসেন শরিফ বলেন, এ অঞ্চলের আমড়ার একটা বিশেষত্ব রয়েছে। অন্য অঞ্চলের আমড়ার চেয়ে বরিশালের আমড়া আকাওে বড় ও মিষ্টি হয়ে থাকে। আমড়া কাচা ও রান্না কওে খাওয়া যায়। এছাড়া চাটনি,মোরব্বা ও উন্নতমানের জেলি তৈরী করা যায়। পাকা আমড়ার স্বাদ অন্যরকম বলে এটি সকল বয়সের মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: ফজলুল হক বলেন, এ অঞ্চলের মাটি এবং আবহাওয়া আমড়া চাষের জন্য উপযোগী। আমড়ার চারা লাগানোর জন্য উৎসাহিত করা এবং ফলন বৃদ্ধি ও রোগবালাই দমনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চাষিদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকে।

এই আমড়ার পুষ্টিমান ও অর্থনৈতিকদিক বিবেচনা কওে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিষ্টিটিউটের উদ্ভাবিত বারো মাসি উচ্চফলনশীল বারি-১,বারি-২ আমড়া চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। যা পরিবেশ ভারসাম্যরক্ষাকারী ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং এ অঞ্চলে কৃষি ভিত্তিক জ্যাম-জেলি কারখানা স্থাপন করা সম্ভব হলে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।” ফলন ভালো হলেও আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। জেলার উপজেলা গুলোতে আমড়া কেনা-বেচার জন্য রয়েছে একদল ব্যাপারী।

তারা চৈত্র-বৈশাখ মাসে গৃহস্থদের অগ্রিম টাকা দিয়েআমড়ার গাছ কিনে থাকেন। শ্রাবণ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত তারা পর্যায়ক্রমে গাছ থেকে আমড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করেন।

পুরোপুরি নিজস্ব মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে এ এলাকার কৃষকরা আমড়ার চাষ করে দেশের উন্নয়নে অগ্রনী ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি আমড়ার চাষে কৃষকদের আগ্রহ সৃষ্টি করা গেলে এ অঞ্চলের কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।্

সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পতিত জমিতে বেশি বেশি আমড়া গাছ লাগালে অরো বেশি পুষ্টি সহায়ক এবং গ্রমীন অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে ।