খোলাবার্তা২৪ ডেস্ক : জিম্বাবুয়েতে অনুষ্ঠিত তিন ম্যাচের ক্রিকেট সিরিজের শেষ ম্যাচে অধিনায়ক তামিম ইকবালের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে স্বাগতিক জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।

হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে আজ সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়েকে ৫ উইকেটে হারিয়েছে টাইগাররা।

সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে দু’টি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামে টাইগাররা।

টসের বিপরীতে আগে ব্যাটিং করে ৪৯.৩ ওভারে ২৯৮ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায় জিম্বাবুয়ে। তবে তামিমের ১১২ রানের রানের সুবাদে দুই ওভার বাকি থাকতেই ৫ উইকেটে ৩০২ রান তোলে বাংলাদেশ।

৯৭ বলের ইনিংসে আটটি বাউন্ডারি ও তিনটি ওভার বাউন্ডারি হাকান তামিম।

এর আগে লিটন দাসের সেঞ্চুরিতে (১০২) সিরিজের প্রথম ওয়ানডে ১৫৫ রানে এবং সাকিব আল হাসানের অপরাজিত ৯৬ রানের সুবাদে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তিন উইকেটে জিতেছিল বাংলাদেশ।

জয়ের জন্য ২৯৯ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে সাবলীল ব্যাটিং করে দলীয় অর্ধশত তুলে নেন দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও লিটন দাস।

চাতারার শর্ট বল পুল করে ফাইন লেগ দিয়ে ছক্কা হাঁকান তামিম। পরের বলটি অনড্রাইভে চার। ওভারের শেষ বলটি ডিপ কভার দিয়ে আরেকটি বাউন্ডারি। শেষ ৩ বলে ১৪ রানের আগে ওভারের প্রথম দুই বলে আসে ৫ রান। তাতে চাতারার করা অষ্টম ওভারে বাংলাদেশ পেয়ে যায় ১৯ রান। একই সঙ্গে ৮ ওভারে দলীয় ৫০ রান তুলে নেয় বাংলাদেশ।

সিকান্দার রাজার ১৭তম ওভারের তৃতীয় বল লং অনে পাঠিয়ে এক রান নেন তামিম। এই সিঙ্গেলে বাংলাদেশের দলীয় রান ১০০ স্পর্শ করে।

দুই ওপেনার তামিম ও লিটন ৮৮ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েন। এ সময়ে তামিম তুলে নেন ফিফটি। তবে লিটন ৩২ রানের বেশি করতে পারেননি। মাধভেরের বল সুইপ করতে গিয়ে ফাইন লেগে ক্যাচ দেন। তামিম ৫২তম ওয়ানডে ফিফটি পেয়েছেন ৪৬ বলে। এ জন্য ৪টি চার ও ২টি ছক্কা হাঁকিয়েছেন। তামিমের নতুন সঙ্গী দ্বিতীয় ম্যাচের নায়ক সাকিব।

স্পিনার মাধভেরের বল এগিয়ে এসে কভার দিয়ে ছক্কা হাঁকালেন তামিম। ৪৭ থেকে তামিম ও সাকিবের জুটির রান ৫৩। তাদের জুটির ১৬তম ফিফটি এটি। তাদের জুটির তিনটি সেঞ্চুরির ইনিংসও রয়েছে।

পথের কাঁটা সাকিব আল হাসানকে ফিরিয়ে আনন্দে মাতে জিম্বাবুয়ে। পেসার লুক জংওয়ের অফস্টাম্পের বাইরের লেন্থ বল কাট করতে গিয়েছিলেন সাকিব। টাইমিং মেলাতে পারেননি। বল যায় চাকাবার হাতে। জিম্বাবুয়ের খেলোয়াড়দের জোরালো আবেদেন আম্পায়ার সাড়া দেন। সাকিব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন! মনে হচ্ছিল আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে একদমই খুশি নন তিনি। তামিমের সঙ্গে ৬৮ বলে ৫৯ রানের জুটি গড়ে সাকিব ফিরলেন সাজঘরে। জুটিতে তার অবদান ৩০ রান।

চাতারার লেন্থ বল লং অন দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠালেন তামিম। ৯৬ থেকে তার রান পৌঁছে গেল ১০০তে। ১২ ইনিংস পর তামিম ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি পেলেন। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটি তার ১৪তম সেঞ্চুরি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যা চতুর্থ। ৮৭ বলে সেঞ্চুরিতে পৌঁছেছেন তামিম। ওয়ানডেতে এটি তার দ্রুতততম সেঞ্চুরি আর দেশের বাইরে তার সপ্তম এবং অধিনায়ক হিসেবে ১৫ ইনিংসে প্রথম। এর আগে ২০১০ সালে ৯৪ বলে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন তিনি।

দ্বিতীয় বিরতির পর জোড়া সাফল্য পায় জিম্বাবুয়ে। তামিম ও মাহমুদউল্লাহ ফিরলেন টিরিপানোর এক ওভারে। ডানহাতি পেসারের অফস্টাম্পের বাইরের বল খোঁচা মারতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন তামিম। পুরো ইনিংসে দুর্দান্ত ব্যাটিং করা তামিম মনোযোগ হারিয়ে আলগা শট খেললেন।

তামিম আউট হবার পরের বলেই সাজঘরের পথ ধরেন মাহমুদউল্লাহ। ডানহাতি ব্যাটসম্যান টিরিপানোর ভেতরে ঢোকানো বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। ক্যারিয়ারের ২০০তম ওয়ানডে খেলতে নেমে গোল্ডেন ডাককে সঙ্গী করেন মাহমুদউল্লাহ।

মোহাম্মদ মিঠুন ও নুরুল হাসান সোহানের জুটিতে পরপর দুই বলে তামিম ও মাহমুদউল্লাহকে হারানোর ধাক্কা ভালোই সামাল দিয়েছে বাংলাদেশ। হয়ে গেছে ইনিংসের চতুর্থ অর্ধশত জুটি।

সাড়ে চার বছর পর ওয়ানডে খেলতে নামা সোহানের দারুণ ব্যাটিংয়েই মূলত এগোচ্ছিল বাংলাদেশ। এক ইনিংসে চারটি পঞ্চাশ ছোঁয়া জুটি এই নিয়ে চারবার পেল বাংলাদেশ। আগের তিনবার ছিল ২০১৩ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ফতুল্লায়, ২০১৮ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে মিরপুরে ও ২০১৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ডাবলিনে।

শুরু থেকে একটুও স্বস্তিতে খেলতে পারছিলেন না মোহাম্মদ মিঠুন। তবু লড়াই করে টিকে ছিলেন। কিন্তু হুট করেই আত্মঘাতী শট খেলে বসলেন। সমীকরণ যখন খুব সহজ, ৩১ বলে প্রয়োজন ৩১ রান, মাধেভেরের বলে বেরিয়ে এসে উড়িয়ে মারলেন মিঠুন। টাইমিং করতে পারেননি। লং অফে ক্যাচ নেন চাতারা। ৫৭ বলে ৩০ রান করে শেষ হলো মিঠুনের অস্বস্তিময় ইনিংস। সোহানের নতুন সঙ্গী আফিফ হোসেন।

নুরুল হাসান সোহান ও আফিফ হোসেনের জুটি অনায়াসেই লক্ষ্যে পৌঁছে গেল বাংলাদেশ। লুক জংওয়ের বলে টানা দুই বলে ছক্কা ও চারে জয় ধরা দিল ১২ বল বাকি রেখেই। ৩৯ বলে ৪৫ রানে অপরাজিত সোহান, ১৭ বলে অপরাজিত ২৬ আফিফ।
৫ উইকেটে জয়ে ওয়ানডে সিরিজ ৩-০তে জিতে নিল বাংলাদেশ। আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ সুপার লিগে প্রত্যাশিত ৩০ পয়েন্টও ধরা দিল।

এর আগে রেগিস চাকাবা, সিকান্দার রাজা ও রায়ান বার্লের হাফ সেঞ্চুরিতে ২৯৮ রানের বড় সংগ্রহ পায় স্বাগতিক জিম্বাবুয়ে।

মঙ্গলবার হারারে ক্রিকেট গ্রাউন্ডে টস জিতে আগে বোলিংয়ের সিদ্ধন্ত নেন টাইগার অধিনায়ক তামিম ইকবাল। পরপর দুই ম্যাচে টস হারের পর অবশেষে কয়েন ভাগ্য নিজের পক্ষে আনতে পেরেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

বাংলাদেশের আমন্ত্রণে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা দারুণ করে জিম্বাবুয়ে। দুই ওপেনার রেগিস চাকাবা ও তাদিওয়ানাশে মারুমানি সাবধানী ব্যাটিংয়ে দলের রান বড় করেছেন । নিয়মিত বিরতিতে এসেছে বাউন্ডারি। তাতে স্কোরবোর্ড সমৃদ্ধ হচ্ছে।

নবম ওভারে সাকিবের হাতে বল তুলে দেন তামিম। এর আগে তাসকিন ও সাইফ উদ্দিনকে দিয়ে বোলিং শুরু করেছিলেন। এরপর মেস্তাাফিজ ও মাহমুদউল্লাহকেও নিয়ে এসেছেন। কিন্তু কেউ ব্রেক থ্রু দিতে পারেননি। সাকিব প্রথম ওভারেই সেই কাজটা করলেন। তার বল সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন ৮ রান করা মারুমানি।

এরপর নিজের ২০০তম ওয়ানডেতে দলকে সবচেয়ে কাঙ্খিত উইকেটটি এনে দেন মাহমুদউল্লাহ। ফেরান জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক ব্রেন্ডন টেইলরকে।

পাওয়ার প্লের মধ্যে একটি ওভার করার পর মাহমুদউল্লাহ দ্বিতীয় বার বল হাতে নেন ১৮তম ওভারে। ফিরেই পান সাফল্য। উইকেটে অবশ্য বোলারের কৃতিত্বের চেয়ে টেইলরের আয়েশি শটের ব্যর্থতাই বেশি। অফ স্টাম্পে থাকা একটি সাধারণ ডেলিভারিতে লফটেড ড্রাইভ খেলতে গিয়ে তিনি সহজ ক্যাচ তুলে দেন, মিড অফে বল হাতে জমান তামিম ইকবাল।
৩৯ বলে ২৮ রানে ফিরলেন টেইলর। রেজিস চাকাভার সঙ্গে তার দ্বিতীয় উইকেট জুটি থামে ৪২ রানে।

ব্রেন্ডন টেইলরকে শিকার করে আড়াই বছর পর ওয়ানডে উইকেটে স্বাদ পেলেন মাহমুদউল্লাহ।

সবশেষ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে কেন উইলিয়ামসনের উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। এরপর চোট আর নানা কারণ মিলিয়ে তার বোলিংই করা হয়েছে কম। মাঝের এই লম্বা সময়ে কেবল ৮ ইনিংসে বোলিং করেছেন তিনি, সেটিও কেবল এক-দুই ওভার। অবশেষে প্রায় ভুলে যাওয়া স্বাদ পেলেন আবার।

তৃতীয় উইকেট জুটিতে এক ‘ভয়ঙ্কর’ জুটিই গড়েছিলেন জিম্বাবুইয়ান দুই টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান রেগিস চাকাভা এবং ডিওন মায়ার্স। নিজের তৃতীয় স্পেলে বল করতে এসে সেই জুটি ভাঙেন রিয়াদ। ডিওন মায়ার্স করেন ৩৪ রান। পরের ওভারেই ওয়েসলে ম্যাধেভেরেকে ৩ রানে ফেরান মুস্তাফিজ।

প্রথম স্পেলে ৪ ওভারে ১৮ রান দিয়ে মুস্তাফিজ ছিলেন উইকেটশূন্য। দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে এসে দ্বিতীয় ওভারে পেলেন উইকেটের স্বাদ। তার স্লোয়ার বলে আগে ব্যাট চালিয়ে সাকিবের হাতে সহজ ক্যাচ দেন ওয়েসলি মাধভেরে। ১০ বলের ব্যবধানে বাংলাদেশ পেল জোড়া সাফল্য। মাহমুদউল্লাহ চাকাবা ও মায়ার্সের ৭১ রানের জুটি ভাঙার পর মুস্তাফিজ ফেরান মাধভেরেকে।

ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রান তুলে সেঞ্চুরির পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন রেগিস চাকাবা। কিন্তু মনোযোগ ধরে রাখতে পারলেন না। তাসকিনের গতিতে পরাস্ত হয়ে উইকেট হারান। তার ফুলার লেন্থ বল লেগ সাইডে ফ্লিক করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাড়তি গতিতে টাইমিং মেলাতে পারেননি। পায়ের কাজও ছিল নড়বড়ে। বাজে এক শটে শেষ হয় প্রতিশ্রুতিশীল ইনিংস। তাসকিন পেলেন ম্যাচের প্রথম উইকেট। ৯১ বলে ৭ চার ও ১ ছক্কায় ৮৪ রান করে চাকাবা ফেরেন সাজঘরে।

এরপরই রায়ান বার্লকে জীবন দিলেন সাকিব আল হাসান। ডিপ ফাইন লেগে জিম্বাবুয়ান ব্যাটসম্যানের ক্যাচ ছেড়ে দিলেন। তাতে হলো চার এবং দ্বিতীয় হাফ সেঞ্চুরিও পেয়ে গেলেন বার্ল, ৩৮ বল খেলে। ৪৮তম ওভারে সিকান্দারকে মোসাদ্দেক হোসেনের ক্যাচ বানান মুস্তকাফিজুর রহমান। ৫৪ বলে ৭ চার ও ১ ছয়ে ৫৭ রান করেন ৩৫ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান। ষষ্ঠ উইকেটে ৮০ বলে ১১২ রানের জুটি গড়েন সিকান্দার ও বার্ল।

এরপর ৪৯তম ওভারে ৩ উইকেট নিলেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। প্রথম বলে রায়ার্ন বার্ল তাকে ছক্কা হাঁকান। পরের বলে তাকে লিটন দাসের ক্যাচ বানান। ৫৯ রানে ফেরেন বার্ল। পরের বলে ডোনাল্ড তিরিপানোকে করেন বোল্ড। তেন্দাই চাতারা হ্যাটট্রিক হতে দেননি। তবে দুই বল পরই বোল্ড হন ১ রানে।

শেষ ওভারে ব্লেসিং মুজারাবানিকে শূন্য রানে বোল্ড করেন মুস্তাফিজুর রহমান। এতে তিন বল বাকি থাকতে গুটিয়ে যায় জিম্বাবুয়ানরা।