কুল শরীফ মসজিদ। কাজান, তাতারস্তান

আহমেদ বায়েজীদ : বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়া। দেশটির রয়েছে ৮৫টি প্রশাসনিক অঞ্চল। বহু জাতি, ভাষা আর ধর্মের লোকের বসবাস বিশাল এই দেশে। দেশটির কেন্দ্রস্থলেই অবস্থিতি একটি অঞ্চল তাতারস্তান। অফিশিয়াল নাম তাতারস্তান প্রজাতন্ত্র।

মস্কো থেকে প্রায় ৮০০ কি.মি. পূর্বে অবস্থিত এই জাতিগতভাবে মিশ্র প্রজাতন্ত্রটি। এর রাজধানী ‘কাজান’ রাশিয়ার ‘তৃতীয় রাজধানী’ এবং ‘ক্রীড়া রাজধানী’ নামে পরিচিত। তাতারস্তানের আয়তন ৬৭ হাজর ৮৪৭ বর্গ কি.মি.। যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কার চেয়ে সামান্য বড়।

‘তাতারস্তান’ শব্দটির অর্থ ‘তাতারদের দেশ বা ভূমি’। তাতাররা বৃহত্তর তুর্কি জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্গত একটি জাতি এবং তারা তাতার ভাষায় কথা বলে। তাতাররা প্রধানত ধর্মগতভাবে সুন্নি মুসলিম। তাদের মাঝে আছে অল্প কিছু খ্রিস্টান। তাতারদের ভূখন্ড হলেও অঞ্চলটিতে প্রচুর জাতিগত রুশদের বসবাস রয়েছে। তাতারস্তানের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৩৯ লক্ষ এবং এদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ জাতিগত তাতার, ৩৯ শতাংশ জাতিগত রুশ, বাকিরা অন্যান্য জাতিভুক্ত। আর ধর্মের দিক থেকে ৪৮.৮% ইসলাম, ৩৫.৫% অর্থোডক্স খ্রিস্টান এবং বাকিরা অন্যান্য ধর্মের অনুসারী।

ইতিহাসবিদদের মতে, ওই অঞ্চলের মানুষের মাঝে দশম শতাব্দীতে ইসলামের প্রসার ঘটে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যাওয়া ধর্ম প্রচারকদের মাধ্যমে তারা ইসলামে দীক্ষা পায়। ইভান দি টেরিবলের সময়ে এলাকাটি রুশ শাসনের অধীনে যায়। রুশরা কাজান দখল করে নেয়ার পর তাতারদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে।

কিন্তু এই প্রচেষ্টা তেমন সাফল্য অর্জন করেনি এবং তাতারদের একাংশ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও অধিকাংশ তাতার ইসলাম ধর্মকেই তাদের জাতিসত্তার অংশ হিসেবে বজায় রাখে। তবে এই সময় ওই অঞ্চলটিতে জাতিগত রুশদের বসতি স্থাপন শুরু হয় এবং অন্যদিকে তাতাররা রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পরবর্তীতে কমিউনিস্ট শাসনের সময়ও তারতারস্তানে অনেক মসজিদ ধ্বংস করা হয়।

রুশ শাসনামলের প্রথম দিকে খ্রিস্টধর্ম চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা এবং অর্থনৈতিক শোষণ প্রভৃতি কারণে তাতাররা বেশ কয়েকবার বিদ্রোহ করে। ১৭৭৩ সালে সম্রাজ্ঞী ক্যাথেরিন দা গ্রেটের সময়ে তাতার মুসলিমদের বেশ কিছু অধীকার দেয়া হয়। এমনকি তাদের রুশ সেনাবাহিনীতে নেয়া শুরু হয়। আর ধীরে ধীরে কাজান শহরটি অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে সমৃদ্ধি লাভ করতে থাকে।

১৯২০ সালের ২৭ মে ‘তাতার স্বায়ত্তশাসিত সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর খনিজ তেলের আবিষ্কার অঞ্চলটির অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অক্ষশক্তির আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের পশ্চিমাঞ্চল থেকে বহু শিল্পকারখানা তাতার প্রজাতন্ত্রে স্থানান্তর করা হয়। যার ফলে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তাতারস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও, মস্কোর নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনার পর তা বাতিল করে রাশিয়ার অন্তর্ভূক্ত হয় এবং ব্যাপক সায়ত্বশাসন লাভ করে।

রাশিয়ার অন্যান্য কেন্দ্রীয় অঞ্চলের মতো তাতারস্তানের নিজস্ব পতাকা, প্রতীক ও রাষ্ট্রীয় সঙ্গীত রয়েছে এবং নিজস্ব রাষ্ট্রপতি, সরকার ও আইনসভাও রয়েছে। শুধু তাই নয়, তাতারস্তানের নিজস্ব অর্থনৈতিক পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র তাতারস্তানে অর্থনৈতিক কার্যালয় স্থাপন করেছে।

তাতারস্তান অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত উন্নত। পেট্রোকেমিক্যাল, যন্ত্রাংশ নির্মাণ, ভারী যানবাহন নির্মাণ, পোশাক এবং খাদ্যদ্রব্য ও কাঠ বাজারজাতকরণ তাতারস্তানের শিল্পগুলোর মধ্যে প্রধান। রাশিয়ার বিখ্যাত ট্রাক-নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘কামাজ’ তাতারস্তানে অবস্থিত। আছে সামরিক ও বেসামরিক বিমান তৈরির কারখানা। রাশিয়ার বিমান বাহিনীতে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও দ্রুতগতির বোমারু বিমান টিইউ-১৬০ তৈরি করেছে কাজানের একটি প্রতিষ্ঠান। শুধু তাই নয়, বিচিত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি তাতারস্তানের পর্যটন শিল্পও বেশ সমৃদ্ধ। প্রতি বছর প্রজাতন্ত্রটিতে ৩ কোটি ২০ লক্ষ টন তেল উৎপাদিত হয় এবং সেখানে মোট ১০০ কোটি টন তেল মজুদ আছে বলে ধারণা করা হয়।

তাতারস্তান অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে অঞ্চলটির মানুষরা স্বাধীনচেতা। বিভিন্ন সময় স্বাধীনতার দাবিও উঠেছে; কিন্ত ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতায় আসার পর তাতারস্তানের সায়ত্বশাসন অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছেন। তাদের অনেক অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়েছে। তাতারদের মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের বাধ্যবাধকতা তুলে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্রমশ অঞ্চলটির সাংস্কৃতির ঐতিহ্যগুলো বিলীন করার নানান চেষ্টা করে মস্কো। তাতারদের নিজ ভাষা বাদ দিয়ে রুশ ভাষায় কথা বলতে উৎসাহী করা হয়। ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটিয়ে তাদের মাঝে ধর্মনিরপেক্ষতা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টাও করে রাশিয়ার সরকার। অঞ্চলটির রাজনৈতিক নেতৃত্বও যাতে সব সময় রুশপন্থীদের হাতে থাকে সেই চেস্টাও করে সরকার।

কাজানের বিখ্যাত একটি মসজিদের নাম কুলশরিফ মসজিদ। ১৫৫২ সালে রুশদের দ্বারা কাজান আক্রান্ত হলে প্রতিরোধ করেন ইমাম কুল ও তার ছাত্ররা। এক পর্যায়ে তাকেসহ অনেককে মসজিদের ভেতরে রেখেই পুড়িয়ে দেয়া হয় মসজিদটি। মাতৃভূমিকে রক্ষায় শহীদ হন ইমাম কুল। ২০০৫ সালে কয়েকটি মুসলিম দেশের আর্থিক সহযোগিতায় নতুন করে নির্মিত হয় আজকের এই আধুনিক ও চমৎকার মসজিদ। নামও দেয়া হয় তার নামে কুল শরীফ মসজিদ।