কাজী খলিলুর রহমান, ঝালকাঠি প্রতিনিধি : কাগজি লেবুর ঘ্রাণে মাতোয়ারা ঝালকাঠির সদর উপজেলা ও পাশ্ববর্তী স্বরূপকাঠি উপজেলার ২২ গ্রাম। চলতি মৌসুমে জমে উঠেছে ঝালকাঠির ভিমরুলীর ভাসমান লেবুর হাট।

প্রতিদিন এখানে লাখ লাখ লেবু কেনা-বেচা হচ্ছে। পাইকাররা নৌকা থেকে লেবু কিনে গাড়িতে করে বরিশাল আড়তে নিয়ে বিক্রি করছে। অনেকে মালবাহী ট্রলার বা ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। ফরমালিন ও কেমিক্যালমুক্ত রসালো কাগজি লেবুর স্বাদ সবার কাছেই প্রিয়।

ঝালকাঠির সদর উপজেলার ডুমুরিয়া, খেজুরা, কির্ত্তীপাশা, মিরাকাঠি, বাউকাঠি, শতদশকাঠি, ভিমরুলী, কাফুরকাঠি, আটঘর, গাভারামচন্দ্রপুর, পোষন্ডাসহ ২২ গ্রামের চাষিরা লেবু চাষ করে হাজার হাজার কৃষকের ভাগ্যবদল হয়েছে। এসেছে পরিবারে সচ্ছলতা। প্রতিনিয়ত বাড়ছে বাগানের সংখ্যা।

তবে এবার ফলন অন্যান্য বছরের চেয়ে কিছুটা কম হলেও বাঁধ সেধেছে করোনার লকডাউন। মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে লেবু চাষিরা দেশের বিভিন্ন জেলায় রফতানি করা যাবে কি না- তা নিয়ে সংশয়ে আছেন লেবু চাষিরা, পাইকাররা। যে কারণে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

ঝালকাঠি জেলা কৃষি বিভাগ জানায়, ঝালকাঠির সদর উপজেলার ডুমুরিয়া, খেজুরা, কির্ত্তীপাশা, মিরাকাঠি, বাউকাঠি, শতদশকাঠি, ভিমরুলী, কাফুরকাঠি, আটঘর, গাভারামচন্দ্রপুর, পোষন্ডাসহ ২২ গ্রামে লেবু চাষ হয়। এখানের মাটিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান বিদ্যমান। তাই এখানে লেবুর ভালো ফলন হয়। আবার চাষিরাও লেবু আবাদে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এ কারণে লেবুর আবাদ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চলতি মৌসুমে ঝালকাঠি জেলায় ২৫০ হেক্টর জমিতে লেবুর চাষ হয়। বছরে জেলায় ১ হাজার ৮৭৫ মেট্রিক টন লেবুর ফলন পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী কৃষি বিভাগ।লেবুর উৎপাদন খরচ কম এবং লাভ বেশি হওয়ায় চাষিরা লেবু চাষে সাচ্ছন্দবোধ করেন।

স্থানীয় লেবু চাষিরা জানান, একসময় ঝালকাঠির সদর ও পাশ্ববর্তী স্বরূপকাঠি দুই উপজেলার প্রায় পরিবারের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন লেবু, পেয়েরা, আমড়া। লেবু, পেয়েরা, আমড়া চাষ করে ভাগ্যের চাকা ঘুরানোর পাশাপাশি বেকার সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছেন অনেকে।

লেবুচাষি বশির জানান, ঝালকাঠির এ লেবুর কদর সবার কাছেই সমান। ফলন ধরার পর দু’ভাবে লেবু বিক্রি করে থাকি। প্রথমত স্থানীয় ভিমরুলী বাজারে পাইকারদের কাছে। এ ছাড়াও গাছে ফল আসার পর পাইকারদের কাছে বাগান বিক্রি করি এককালীন নগদ টাকায়। ভীমরুলী থেকে নৌকা বা ট্রলারে করে পাইকাররা কিনে তা সরবরাহ করেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

ঝালকাঠির লেবু খেতে সুস্বাদু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলায় এর কদর রয়েছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হচ্ছে এখানকার সুস্বাদু লেবু। কিন্তু এ বছর মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে লেবু বিদেশে রফতানি করা সম্ভব হবে কি তা নিয়ে সংশয় আছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।

লেবুচাষিরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত বছরের তুলনায় এবার ফলন কম হওয়ায় দাম বেশি। গত বছর ১ পোন (৮০টি) লেবু ছিল আড়াইশ’ টাকা। এবার তা ৪শ’ টাকা। গ্রামের কৃষকরা কাঁদি কেটে লেবু চাষ করছেন। একেকটি কাঁদি ১শ’ থেকে ১১০ হাত লম্বা এবং ৭-৮ হাত চওড়া হয়। প্রতিটি কাঁদিতে ২২টি গাছ লাগানো যায়।

এ রকম ১ বিঘার কাঁদিতে লেবু চাষ করতে খরচ হয় ৫০ হাজার টাকা। ফল ধরার পরে প্রতি বছর লেবু বিক্রি করে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পাওয়া যায়। সে হিসেবে লেবু বিক্রি করে প্রতি বছর কৃষকরা আয় করছে দেড় থেকে ৩ কোটি টাকা।

লেবু চাষি তৈয়বুর রহমান বলেন, তিনি ৪ বিঘা জমিতে কাগজি লেবুর চাষ করেছেন। তার উৎপাদন খরচ ছিলো ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু বছরে তিনি বিক্রি করেছেন ৪ লাখ টাকার লেবু। লেবুই এখানে বেশ জনপ্রিয়। ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ সুগন্ধ ও রসে ভরা এই লেবুর চাহিদাও বেশি। এসব এলাকায় শুধু লেবু চাষ করেই অনেকে ভাগ্যের চাকা ঘুড়িয়েছেন।

লেবুর পাইকার ব্যবসায়ী রহমান জানান, পটুয়াখালী থেকে মালবাহী ট্রলার এলে সেই ট্রলারে পটুয়াখালী মোকামে পাঠানো হয়। ওখানের কাচামাল বিক্রেতাদের আগেই চুক্তি করা থাকে। কেনা দামের ওপর লাভ রেখে বিক্রি করা হয়।

সরেজমিন ভীমরুলীর ভাসমান হাটে গিয়ে দেখা যায়, লেবু চাষিরা ভমিরুলীর খালে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় লেবু নিয়ে পাইকারদের আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিছু কিছু পাইকারও দেখা গেলো খাল পাড়ে। তারা নৌকা ডেকে কিনারে এনে লেবুর দর দাম করছেন। লেবু চাষিরা লেবু বিক্রি করছেন পোন হিসেবে।

দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা আসছে এখানর লেবু কিনতে। আসছে পর্যটকও। তবে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে পাইকার ও পর্যটকের সংখ্যা এখন কম। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই হাট জমে থাকে লেবু চাষি, পাইকার ও দর্শনার্থীদের কোলাহলে।

এখানে শুধু লেবুর হাটই বসে না। বসে পেয়ারার হাটও। আর কদিন বাদেই পেয়ারাও আসবে এই হাটে। ভীমরূলী খাল মূলত: পেয়ারার ভাসমান হাটের জন্য বিখ্যাত। প্রতিদিন শত শত মন পেয়ারা বিক্রি হয় এই হাটে। তবে সে দৃশ্য দেখতে আরো ১৫/২০ দিন অপেক্ষা করতে হবে।

পাইকাররা জানান, করোনার কারণে কাগজি লেবুর চাহিদা প্রতিবছরের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। তাই কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য দিয়েই লেবু কিনে নেয়া হচ্ছে। ভালোমানের একেকটি লেবুর ক্রয় মূল্যই হচ্ছে ৫টাকা। যা খুচরা বাজারে ৭/৮টাকা দরে বিক্রি করা হয়। প্রতিবছরই লেবুর চাহিদা থাকে কিন্তু এ বছর একটু চাহিদা বেশি।

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। এক্ষেত্রে একটি লেবু টুকরা করে কেটে এক কাপ গরম পানিতে ফুটিয়ে নিতে হবে, লেবুর এই পানীয়টি শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকায়। এ পানীয় ঠিক ওষুধের মতো কাজ করে। প্রতিদিন এ পানীয় পান করার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। লেবুর এই পানীয়টি করোনা প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রতিষেধক হিসেবেও কাজ করবে।

এ ছাড়াও এটি শরীরের অন্যান্য ভাইরাস এবং ফ্লুর বিরুদ্ধেও লড়াই করতে সহায়তা করে। লেবুর রসে রয়েছে কার্বলিক এসিড, যা উচ্চ রক্তচাপ কমায়। এমনকি বাতের ব্যথা ও রক্ত জমাট বাধার সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। করোনা প্রতিরোধে ভিটামিন সি বেশি করে খেতে হবে। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। লেবুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও কার্বোলিক এসিড থাকায় অনেক ঔষধী গুণে ভরপুর রয়েছে।

তবে ভাসমান হাটে আসা কয়েকজন লেবুচাষি জানালেন, সার সংকট, সরকারী ঋণ ও কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় পরামর্শ না পাওয়ার কথা। এসব চাষিরা জানান, সারের অভাবে অনেক সময় তাদের লেবু গাছের পাতা সাদা হয়ে যায়। এ কারণ ফলনও কিছুটা ব্যহত হয়। এ ব্যাপারে তারা কৃষি বিভাগের সহয়তা চেয়েছেন।

এ ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে কৃষি বিভাগ। ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: ফজলুল হক বলেন, লেবু মানুষের শরীরে লেবু ভিটামিন সি এর ঘাটতি পূরণ করে। লেবু চাষের পরিধি বাড়াতে লেবুচাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং সার ও ঋণের সংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।