মিরসরাইয়ে মাইক্রো-ট্রেন সংঘর্ষে ১১ জন নিহত

৪ ঘন্টা বন্ধ ছিলো ট্রেন চলাচল

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা দেখে ফেরার পথে ট্রেনের ধাক্কায় ১১ জন পর্যটকের আর বাড়ি ফেরা হলো না। শক্রবার (২৯ জুলাই) বেলা পৌনে ১টার নাগাদ খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খৈয়াছড়া গ্রামের ঝরনা এলাকার রেলক্রসিং এ মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমান বাজার এলাকা থেকে একটি মাইক্রোবাসযোগে খৈয়াছড়া ঝরনা দেখতে আসেন মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৫ জন। তারা সবাই হাটহাজারির একটি কোচিং সেন্টারের ছাত্র ও শিক্ষক। ঝরনা দেখা শেষে ওইদিন বেলা পৌনে ১টার দিকে ফেরার পথে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা মহানগর প্রভাতি তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই ১১ জন নিহত হন, আহত হয়েছেন আরো ৫জন।

নিহতরা হলেন, মাইক্রোবাসের চালক গোলাম মোস্তফা নিরু (২৬), এসএসসি পরীক্ষার্থী মো. হাসান (১৭), মোহসাব আহম্মেদ (১৬), মোস্তফা মাসুদ রাকিব (১৯), সাগর (১৮), আয়াতুল ইসলাম (১৯), ইকবাল হোসেন মারূপ (১৮), মাহিন (১৭), কোচিং সেন্টারের শিক্ষক জিয়াউল হক সজিব (২২), ওয়াহিদুল আলম জিসান (২৩) ও রিদোয়ান চৌধুরী (২২)। আহতরা হলেন, হৃদয়, শওকত, তাসমির, আয়াত ও ইমন।

আহতজনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে মিরসরাই সদর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতাল ও পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করে।

এদিকে ঘটনার পরপর মিরসরাই থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের উদ্ধার কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাস থেকে হতাহতদের উদ্ধার করে। দুর্ঘটনার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল লাইনের প্রায় ৪ ঘন্টা ধরে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিলো। বিকেল ৫টার দিকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম এসে ট্রেনের সাথে আটকে থাকা মাইক্রোবাস উদ্ধার করার পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এঘটনায় ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই দিন সন্ধ্যায় গেটম্যান সাদ্দামকে আটক করেছে জিআরপি পুলিশ।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (মিরসরাই সার্কেল) লাবিব আব্দুল্লাহ ঘটনাস্থলে গিয়ে সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে মাইক্রোবাসে বহনকারী ১১জন নিহত ও ৫জন আহত হয়েছে। আহত ৫জনকে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।


গেইটম্যানের অবহেলার কারণে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা

ট্রেন দুর্ঘটনার সময় রেলগেইট এলাকায় কোনো গেইটম্যান ছিল না বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। গেইটম্যান সাদ্দামের অবহেলায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করছেন তারা।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুল ওয়াজেদ মামুন বলেন, ‘ঘটনার সময় গেইটম্যান সাদ্দাম ছিল না। তার অবহেলার কারণে একসাথে ১১ জন মারা গেছে।’

গেটম্যান ছিলো না বলে আরো জানিয়েছেন ট্রেনের যাত্রী কলিম উদ্দিন। তিনি বলেন, আমি ট্রেনে ছিলাম। দূর্ঘটনাস্থলে কোন গেটম্যান ছিলো না। মাইক্রোবাস টেনে হিছড়ে এক কিলোমিটার দুরে নিয়ে ট্রেন দাঁড়ানোর পর ট্রেনের চালকও নেমে পালিয়ে যান।

এলাকার বাসিন্দা রায়হান একই কথা বলেন, আমি শুনেছি গেটম্যান সাদ্দাম তখন নামাজে ছিলো। সে তখন ঘটনাস্থলে ছিলো না। তার অবহেলার কারণে এইমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বড়তাকিয়া রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার শামছুদ্দোহা বলেন, ‘যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে ওইখানকার গেইটম্যানের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ নাই। এটি আমাদের আওতায় নেই।’


ব্যাগগুলো পড়ে আছে মানুষগুলো নেই

হাটহাজারি উপজেলার আমান বাজার থেকে মিরসরাইয়ের খৈয়াছরা ঝরনা দেখে ফেরার পথে মর্মান্তিক ট্রেন-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে ১১ জন নিহত ও ৩জন আহত হয়েছে। দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি থেকে নিথর দেহগুলো উদ্ধার গুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে বড়তাকিয়া রেল ষ্টেশনে। কিছুদুর পাশে ষ্টেশন মাস্টারের কক্ষের বারান্দায় পড়ে আছে তাদের সাথে থাকা ব্যাগগুলো। ব্যাগের মধ্যে রক্ত ও ময়লা লেগে আছে। তখন এক পুলিশ কর্মকর্তা বললো আহারে জীবন.. সকালে ব্যগগুলো সাথে নিয়ে আসছিলো তারা। এখন ব্যাগগুলো পড়ে আছে, মানুষ গুলো বেঁচে নেই।


একসাথে এতো লাশ আর দেখিনি

বিকট আওয়াজ শুনে বাড়ি থেকে দৌড়ে রেল লাইনে এসে দেখি ট্রেন একটি মাইক্রোকে নিয়ে যাচ্ছে। কিছু দুর গিয়ে ট্রেনটি থামে। এরপর অনেকগুলো মানুষ মাইক্রো বাসের ভেতরে আটকে রয়েছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে একে একে ১১ টি লাশ উদ্ধার করে। একসাথে এতো লাশ আগে চোখের সামনে দেখিনি। মনে হচ্ছে সবগুলো জীবন্ত। এসময় ৩জনকে জীবিত উদ্ধার করে দ্রæত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতো লাশ দেখে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। এভাবে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন পূর্ব খৈয়াছরা এলাকার মোজাহের হোসেন। তিনি আরো বলেন, দুর্ঘটনার স্থান থেকে মাইক্রোবাসকে টেনে হিচড়ে এক কিলোমিটার দুরে নিয়ে এসেছে। কেন যে তারা ঝরনায় মরতে আসলো?

ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন

১১ জন পর্যটক নিহতের ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে প্রধান করা হয়েছে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) মো. আনছার আলীকে।

কমিটির সদস্যরা হলেন বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী-১ আবদুল হামিদ, বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (লোকো) জাহিদ হাসান, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট রেজানুর রহমান এবং বিভাগীয় মেডিকেল অফিসার (ডিএমও) মো. আনোয়ার হোসেন।

এই কমিটিকে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্তসহ দ্রুত রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। অপরদিকে রেলের জি এম জাহাঙ্গীর হোসেনসহ রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় তদন্ত কমিটির আহবায়ক চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) মো. আনছার আলী বলেন, ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, দোষী কারা সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। তবে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় বেঁধে না দিলেও যত দ্রæত সম্ভব রিপোর্ট দাখিল করা হবে। ইতোমধ্যে তদন্ত কাজ শুরু করেছি। চেষ্টা করছি তিন-চার দিনের মধ্যেই দাখিল করা হবে। এর আগে শুনেছি, ট্রেনটি বড়তাকিয়া ক্রস করার সময় লাইনে উঠে যায় মাইক্রোবাসটি। এ সময় ইঞ্জিনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসটি এক কিলোমিটার দুরে চলে যায়।

গেটম্যান সাদ্দাম আটক

শুক্রবার বিকেল ৬টার দিকে খৈয়াছরা লেভেল ক্রসিংয়ে দায়িত্বে অবহেলার কারণে গেটম্যান সাদ্দাম হোসেনকে আটক করেছেন রেলওয়ে পুলিশ। চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজিম এ নিশ্চিত করেছেন।

শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে খৈয়াছড়া এলাকায় একটি রেলক্রসিংয়ে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে ১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৫জন। তাদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

তবে প্রত্যক্ষদর্শী মফিজুল হকসহ কয়েকজন দাবি করেন, দুর্ঘটনার সময় গেটম্যান সাদ্দাম সেখানে ছিলেন না। তিনি জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন।

আনন্দ নিমিষে বিষাদে পরিণত

কোচিং সেন্টারের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় উপলক্ষে ঝরনায় গা ভিজেয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন ছাত্র-শিক্ষকরা। খৈয়াছরা ঝরনার গাড়ির স্ট্যান্ড থেকে আন্দন করে গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। মাত্র ৫ মিনিট পরে আনন্দ বিষাদে রূপ নিয়েছে। চলন্ত ট্রেনের সাথে সংঘর্ষে দুমড়ে মুছড়ে যায় তাদের বহনকারী মাইক্রো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আর অ্যান্ড জে কোচিং সেন্টারের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ১৪ জন শুক্রবার সকাল ৮টায় হাটহাজারীর আমান বাজার থেকে মাইক্রোবাসযোগে খৈয়াছরা ঝরনায় ঘুরতে যান।

আর অ্যান্ড জে কোচিং সেন্টারের এক জাহেদ কাউসার শিক্ষার্থী জানান, আমান বাজার এলাকার যুগিরহাটে আমাদের কোচিং সেন্টারটি অবস্থিত। কোচিং সেন্টারের ১৪ শিক্ষক-শিক্ষার্থী খৈয়াছড়া ঝরনাসহ মিরসরাইয়ের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র দেখতে ৫০০ টাকা করে চাঁদা তুলেছিলেন। এর মধ্যে চার জন শিক্ষক ছিলেন। তারা হলেন জিসান, রিদুয়ান, সজিব ও রাকিব। বাকিরা শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছয় জন এসএসসি পরীক্ষার্থী বাকি ৩ জন একাদশ শ্রেণির ছাত্র। একজন মাইক্রোবাসের চালক অপরজনের পরিচয় আমার জানা নেই।

জাহেদ আরও জানান, পিকনিকে আমারও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ আমার ফুটবল ম্যাচ থাকায় যাওয়া হয়নি।