বিয়ে করতে যাওয়ার আগে রাজকুমারী ‘মাকো’ তার পিতা মাতা ও বোনের সঙ্গে কথা বলছেন। ছবি: ইন্টারনেট 

খোলাবার্তা২৪ ডেস্ক : জাপানি রাজকুমারী মাকো ২০১৭ সালে যখন তার সাবেক সহপাঠী কেই কোমুরোর সঙ্গে তার প্রেমের কথা ঘোষণা করেন, তখন তিনি বলেন, তার প্রেমিক “সূর্যের মতো উজ্জ্বল হাসি দিয়ে” তার হৃদয় জয় করে নিয়েছেন।

পাঁচ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাদের দু’জনের সাক্ষাৎ হয় এবং তারা জানান যে এর পরের বছরে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবেন।

তার মানে হচ্ছে বিয়ের পর রাজকুমারী মাকো একজন সাধারণ নাগরিকে পরিণত হবেন। জাপানি আইন অনুসারে রাজপরিবারের কোন নারী সদস্য বাইরের সাধারণ কোন পুরুষকে বিয়ে করলে তাকে রাজকীয় মর্যাদা পরিত্যাগ করতে হয়।

জাপানের মতো একটি দেশে, যেখানে রাজপরিবারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা হয় এবং তাদের প্রত্যেক সদস্য প্রচলিত রীতি-নীতি মেনে চলবেন বলে আশা করা হয়, সেখানে এই দু’জনের প্রেমের ঘোষণা সারা দেশের মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল।

তাদের প্রেমের খবর জাপানি মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয় যার বেশিরভাগই ছিল ইতিবাচক।

কিন্তু হঠাৎ করেই এই মনোভাব বদলে যেতে শুরু করে।

দু’মাস পরে একটি খবর বের হয় যাতে কোমুরোর মা এবং মায়ের সাবেক প্রেমিকের সঙ্গে কথিত বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়। মায়ের সাবেক প্রেমিক অভিযোগ করেন যে মা ও ছেলে তার কাছ থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া অর্থ পরিশোধ করেনি। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেন যে কোমুরো ভবিষ্যতেও আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়তে পারেন কীনা।

এর মধ্যে মানুষের মনোভাব আরো তিক্ত হয়ে ওঠে।

তখন রাজপরিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া এক ব্যাখ্যায় বলা হয় যে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য এই যুগলের আরো কিছু সময়ের প্রয়োজন। পরে তাদের বিয়ে স্থগিতও করা হয়।

সাবেক এই রাজকুমারী, যিনি ‘মাকো কোমুরো’ নামে পরিচিত, তিনি জাপানের বর্তমান সম্রাটের ছোট ভাই যুবরাজ আকিশিনো ও তার স্ত্রী রাজকুমারী কিকোর প্রথম সন্তান।

মাকো কোমুরোর জন্ম ১৯৯১ সালের ২৩শে অক্টোবর। প্রাথমিকভাবে তিনি রাজপরিবারের প্রচলিত সব রীতিনীতি অনুসরণ করেই চলতেন। রাজপরিবারের সদস্যরা সাধারণত যে এলিট গাকুশিন স্কুলে লেখাপড়া করেন, তিনি সেই স্কুলেই পড়েছেন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য স্কুল ছেড়ে দিয়ে তিনি প্রচলিত প্রথা ভঙ্গ করেন। মিস মাকো রাজধানী টোকিওর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। সেখানে তিনি শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর পড়াশোনা করেন।

যুক্তরাজ্যে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি এক বছর লেখাপড়া করেছেন। আরো পরে তিনি লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। বিদেশে তার পড়ালেখার অভিজ্ঞতাকে তিনি পরে “চমৎকার” বলে উল্লেখ করেন।

মিস মাকোর ঘনিষ্ঠ লোকজন তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন যে তিনি একজন স্বাধীনচেতা এবং বন্ধুবৎসল নারী, যিনি রাজপরিবারের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তার নিজের কেরিয়ারও গড়ে তুলেছেন।

প্রেমের শুরু : কোমুরোর সঙ্গে রাজকুমারী মাকোর প্রথম সাক্ষাৎ হয় ২০১২ সালে, বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের এক সভায়।

কেই কোমুরো যেহেতু একটি অখ্যাত পরিবারের সন্তান, সে কারণে মুখরোচক ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলো তার পরিবারের নেতিবাচক খবর খুঁজে বের করার জন্য হন্যে হয়ে তার পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করতে থাকে।

রাজকুমারীর সঙ্গে প্রেমের খবর প্রচার হওয়ার মধ্যেই কোমুরো ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ালেখার জন্য নিউ ইয়র্কে চলে যান। তবে তাদের মধ্যে ইন্টারনেটে যোগাযোগ ছিল বলে খবরে জানা যায়।

কোমুরো গত সেপ্টেম্বর মাসে জাপানে ফিরে আসেন। তার এই প্রত্যাবর্তন নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। এ সময় তিনি সাধারণ পোশাক পরেছিলেন এবং তার মাথার পেছনে চুলের ঝুঁটি বাঁধা ছিল। তখন অনেকেই বলেন কোমুরো যে রাজকুমারীকে বিয়ে করার জন্য উপযুক্ত নন এটি তার আরো একটি প্রমাণ।

শেষ পর্যন্ত এই অক্টোবর মাসেই তারা বিয়ে করলেন। রাজপরিবারের সদস্যদের বিয়ের অনুষ্ঠানে যেসব রীতি পালন করা হয় মিস মাকো সেসব পরিহার করেছেন। এ ছাড়াও কোনো নারী সদস্য রাজকীয় মর্যাদা ত্যাগ করলে তাকে যে ১৩ লাখ ডলার দেওয়া হয় সেটি নিতেও তিনি অস্বীকৃতি জানান।

এভাবেও মিস মাকো জাপানি রাজপরিবারের আরো একটি প্রথা ভঙ্গ করেন। জাপানি রাজপরিবারে তিনিই প্রথম নারী যিনি রাজকীয় মর্যাদা ছেড়ে দিলেন।

কোমুরোকে নিয়ে বিতর্ক : কেই কোমুরোর মায়ের সাবেক প্রেমিক আর্থিক বিষয়ে যে অভিযোগ তুলেছেন সেই প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে। তবে কোমুরো বলেছেন, রিপোর্টে যে ৩৫ হাজার ডলারের কথা বলা হয়েছে সেটা কোনো ঋণ ছিল না, ছিল উপহার।

তারপরেও তিনি এই অর্থ কিস্তিতে পরিশোধ করবেন বলে জানিয়েছেন।

বিয়ের দিনও অন্তত একটি প্রতিবাদের ঘটনা ঘটেছে। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল: “আমাদের পরিবারকে রক্ষা করুন” এবং “রাজপরিবার জাপানের আত্মা”।

মিডিয়াতে বাড়াবাড়ি রকমের প্রচার এবং সোশাল মিডিয়াতে একের পর এক আক্রমণের প্রভাব পড়েছে মিস মাকোর মানসিক অবস্থার ওপর। রাজপরিবারের সংস্থা ইম্পেরিয়াল হাউজহোল্ড এজেন্সির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তিনি এখন মানসিক চাপ-জনিত কিছু সমস্যায় ভুগছেন।

জাঁকজমকহীন বিয়ের অনুষ্ঠানের পর স্বামীকে পাশে নিয়ে করা সংবাদ সম্মেলনে মিস মাকো বলেছেন, কোমুরোকে কেন্দ্র করে যেসব “ভুল” খবর পরিবেশন করা হচ্ছে তাতে তিনি “ভীত, দুঃখিত এবং এর ফলে তিনি অশান্তিতে ভুগছেন।”

তিনি বলেন, কেই-র স্থান কেউ নিতে পারবে না। আমাদের জন্য বিয়ে একটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।

বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে কোমুরো তার মাথার পেছনে চুলির ঝুঁটি কেটে ফেলেছেন। স্ত্রীকে রক্ষা ও সাহায্য সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

কোমুরো বলেছেন, আমি মাকোকে ভালবাসি। আমি যাকে ভালবাসি তার সঙ্গে আমি আমার সারা জীবন কাটাতে চাই।

জাপান ছেড়ে চলে যাচ্ছেন : ধারণা করা হচ্ছে এই দম্পতি এখন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাবেন। কোমুরো সেখানে একজন আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন।

মিস মাকোর এই ঘটনাকে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারি ও মেগান ম্যার্কলের বিয়ের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। তাদেরকে বলা হচ্ছে “জাপানের হ্যারি ও মেগান।”

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, আগামী কয়েকদিন মিস মাকো জাপানে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেবেন। এর মধ্যে তার জীবনের প্রথম কোন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার বিষয়টিও রয়েছে। – বিবিসি অবলম্বনে