রফিক মোল্লা, চৌহালী : সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ৪টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম চলছে ছাপড়ার নিচে। এ বছর বর্ষার শুরুতে যমুনার ভাঙনে বিদ্যালয়গুলো বিলীন হয়েছে। এতে প্রায় ৭শ কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ শিক্ষকদের চরম দুর্ভোগে পড়ে অস্থায়ী খোলা জায়গায় ক্লাস করতে হচ্ছে।

টয়লেটসহ নেই বিশুদ্ধ খাবার পানির নলকূপের ব্যবস্থা। শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ না পেয়ে দিন দিন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে।

রোববার ১০ অক্টোবর সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উমারপুর ইউনিয়নের যমুনা নদীর মাঝে জেগে ওঠা বাউসা চরে বেশ কয়েকটি বসতি গড়ে উঠেছে। পতিত জমিতে চার-পাঁচটি খুটি পুতে কয়েকটি টিনের দুটি চালা দিয়ে ছাপড়া নির্মাণ করা করা হয়েছে। সেখানেই বাউসা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম চালছে।

একই চিত্র দেখা যায় ওই চরের দক্ষিণে ইউসুব শাহী সলংগী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ বিলঝলহর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উমারপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এসব স্কুলে নেই শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ।

চলছে নামমাত্র ক্লাস। কারণ কয়েকটি ব্রেঞ্চ পেতে কয়েকজন কোমলমতি শিক্ষার্থী বই নিয়ে বসে আছে। চার দিকে খোলা হওয়ায় বাঁশের সাথে বাঁধা পুরনো দুটি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে দৃষ্টি নেই কারও। উপরে টিনের ছাপড়ার ফাঁকা দিয়ে রোধ ও বৃষ্টি পড়ে। এতে অসুস্থ হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা।

জানা যায়, বর্ষার শুরুতে বিদ্যালয় ৪ টির ভিটা মাটি নদী গর্ভে চলে যাবার পর স্থানীয়দের সহায়তায় চেয়ার-টেবিল, বই-পত্র সহ আসবাব নিরাপদ স্থানে গুছিয়ে রাখা হয়। করোনা পরবতীর্তে বিদ্যালয় চালুর ঘোষনা আশায় কোনমতে চরের জমিতে খুটি পুতে পুরাতন ঘরের টিন দিয়েই ছায়লা তৈরী করে পাঠদান চালু করা হয়। চারপাশে খোলা থাকায় গবাদি পশুর অবাদ বিচরণ দেখা যায়।

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মান করা হয়নি টয়লেট ও বসানো হয়নি খাবার পানির জন্য নলকুপ। পড়াশোনার সুষ্ঠ পরিবেশ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এসব কারণে পাঠদান মারাক্তক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয় এলাকাবাসি অভিযোগ করেছেন।

এদিকে বাউসা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী রেবা খাতুন ও হৃদয় হোসেন জানায়, খোলা মাঠে ছাপড়ার নিচে ক্লাস করতে সমস্যা হয়। ছাপড়ার চারপাশে খোলা থাকায় একটু বৃষ্টি হলেই বই খাতা ভিজে যায়। এছাড়া টয়লেট ও টিউবওয়েল না থাকায় দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে আমাদের।

এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের কয়েকজন অভিভাবক জানান, খোলা আকাশের নিচে তীব্র রোধ আর প্রচন্ড গরমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিদারুণ কষ্ট হয়। এতে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক ভাবে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। শিক্ষার সুষ্ঠ পবিরশে দ্রুত নিশ্চিত না হলে চরাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষায় মারাক্তক বেহাল দশা সৃষ্টি হবে।

এ বিষয়ে বাউসা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম ও সহকারী শিক্ষক আব্দুল আলীম জানান, ১৯৬৮ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ১১ বার নদী ভাঙনের কবলে পড়েছি। এবছরই পরপর দুই বার নদীতে চলে গেছে স্কুলের ভিটা মাটি। যে কারনে বাধ্য হয়ে খোলা ছাপড়ায় ক্লাস নিতে হচ্ছে। একটু বৃষ্টি কিংবা রোদ উঠলে ছাত্রছাত্রী বাড়ি চলে যায়। এমনকি স্কুলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রাখার যায়গা নেই।

করোনা পরবর্তী সময় চরম দুর্ভোগে পরে পাঠদান কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা সহ দ্রুত অবকাঠামো নির্মান না করা হলে এ দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

এদিকে ইউসুব শাহী সলংগী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহফুজুর রহমান জানান, যমুনা নদীতে বিদ্যালয় বিলীনের কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছি। খোলা আকাশের নিচে নিদারুন কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। অস্থায়ীভাবে কয়েকটি টিনের ছাপড়া তুলে চেয়ার-টেবিল, ব্রেঞ্চ ও আলমিরা দুটি সংরক্ষণ করেছি। রোদ বৃষ্টিতে ভিজে কোন রকম পাঠদান চালু রেখেছি।

তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে চায় না। সুষ্ঠ পরিবেশ না থাকায় তারা পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে। দ্রুত ক্লাস রুম সহ বিদ্যালয় নির্মানের দাবি জানাই।

এ বিষয়ে চৌহালী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর ফিরোজ জানান, নদী ভাঙনে বিলীন ৪টি স্কুলেই ছাপড়ার নিচে পাঠদান চালু করা হয়েছে। নতুন ঘর চেয়ে ইডুকেশন ইন ইমার্জেন্সীতে আবেদন করেছি। আশা করছি দ্রুত নিরাপদ স্থানে বিদ্যালয় ভবন সহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মান করা হবে। তখন এসব সমস্যা আর থাকবে না বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া চরাঞ্চলে শিক্ষার গুনগত মান উন্নতিতে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।