এম. মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি : দ্রব্যমূল্যের এই উর্দ্ধগতিতে নিজেরা ঠিকমতো খাইবার পাই আর না পাই, বোবা গারু-বাছুর গুলানরে তো আর ক্ষুধায় কষ্ট দিতে পারি না। তাই শত কষ্ট অইলেও ওগেরে জন্যি পদ্মা-যমুনা পাড়ি দিয়া দুর্গম চরে যাই ঘাস আনতে।

গো-খাদ্য সংকটে নিজের পোষা ২টি গরু ও ৫টি ছাগলের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে কাঁচা ঘাস সংগ্রহের কথা বলছিলেন ৬০বছর বয়সী বৃদ্ধ ছলেমান মন্ডল। তার বাড়ি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের পদ্মা নদীর তীরবর্তী বেপারী পাড়ায়।

জানা গেছে, গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী এলাকার শত শত সাধারণ মানুষ প্রায় সারা বছরই গো-খাদ্য সংকটে থাকেন। এদের প্রায় সবাই নদী ভাঙনের শিকার ভূমিহীন অসহায় কৃষক। নিজেদের জমি না থাকায় তারা পশুপালনে কাঁচা ঘাসের তীব্র সংকটে থাকেন। কিন্তু এ সময়টায় বিস্তীর্ণ দুর্গম চরাঞ্চলে প্রচুর ঘাস জন্মে। সেই ঘাস সংগ্রহে প্রতিদিন দল বেঁধে নারী-পুরুষেরা ট্রলারযোগে সেই চরে যান। এতে তাদের উত্তাল পদ্মা-যমুনা নদী পাড়ি দিতে হয়।

সরেজমিন সোমবার বিকালে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে কথা হয় কৃষক ছলেমান মন্ডল (৬০) সঙ্গে। তিনি বলেন, তার ৩টি গাভী, ১টি ষাঁড় ও ৪টি ছাগল আছে। তার সহায়-সম্পদ বলতে এগুলোই। নিজের কোনো জমিজমা নাই। সব নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। গরু-ছাগলগুলোর প্রচুর খাবার লাগে। খড়, কুড়া, ভুষি এগুলোর অনেক দাম। শুষ্ক মৌসুমে খুব কষ্টে কিনে খাওয়াই। কিন্তু এখন থেকে পুরো বর্ষা মৌসুম চর থেকে ঘাস কেটে এনে খাওয়াব।ধ

তার মতো নুরজাহান বেগম (৪৫), রুস্তম কাজী (৪৮), আব্দুল বেপারীসহ (৬০) অন্তত ২৫-৩০ নারী-পুরুষ ট্রলার থেকে তাদের নিজ নিজ ঘাস নামাচ্ছিলেন।

তারা বলেন, সকালে পানি-পান্তা খেয়ে যাই। সঙ্গে করে কিছু নিয়ে যাই দুপুরে খাওয়ার জন্য। সারাদিন চরে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ঘাস কাটি। বিকালে ঘাটে এসে নামি। এতে খুব কষ্ট হলেও বোবা প্রাণীগুলোর আহার জোগাতে এছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।

ট্রলারচালক মাদার মাঝি জানান, তার মতো আরও বেশ কয়েকটি ট্রলারে প্রতিদিন বহু নারী-পুরুষ দুর্গম চর বিশ্বনাথপুর, ভাবৈল, বনভাবৈল, চর পালন্দ, আখ পালন্দসহ বিভিন্ন চরে গিয়ে ঘাস নিয়ে আসেন। তিনি জনপ্রতি ৪০ টাকা করে ভাড়া নেন। চরে প্রচুর পরিমাণে কড়চা, বন, দুবলা, বাকশী জাতীয় ঘাস পাওয়া যায়। যে কারণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ প্রতিনিয়ত চরগুলোতে ছুটে যায়।

মাদার মাঝি জানান, যাওয়ার সময় তেমন ঝুঁকি না থাকলেও ফেরার সময় অতিরিক্ত লোড থাকলে কিছুটা ঝুঁকি থাকে। ভরা বর্ষার সময় তীব্র স্রোত ও বড় বড় ঢেউয়ের কারণে এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কিন্তু কোনো প্রতিকূলতাই অসহায় এ মানুষগুলোর জীবন সংগ্রামে বাধা হতে পারে না।